সময়ের আলো গ্রাফিকউঠানের একপ্রান্তে নীরবে দাঁড়ানো কমলালেবুর গাছটির পাশে নীরবেই দাঁড়িয়ে থাকেন আহমেদ ফয়সল। মাঝেমধ্যে এভাবে তিনি গাছটির পাশে এসে দাঁড়ান। স্মৃতি রোমন্থন করেন। অবশ্য ইতিমধ্যে গাছটির কয়েকটি ছোটখাটো ডাল ভেঙে পড়েছে কোনো মৌসুমি ঝড়ে অথবা ঘূর্ণি হাওয়ায়। আহমেদ ফয়সলের বয়স ষাট। তাকে তার দাদি বলতেন, তোর জন্মের বছর তোর দাদা এই গাছটি শখ করে লাগিয়ে ছিলেন। বলতেন, আমার দাদাভাই বড় হলে এই গাছের ফল খাবে। আমি সেটি দেখে তৃপ্তি পাব। মনে সুখ পাব। অবশ্য বাড়ির চারপাশে পেয়ারা, ডালিম, বরই গাছও ছিল। সেগুলো দাদার বাবা-চাচারা লাগিয়ে ছিলেন। এখন সেগুলোর অস্তিত্ব বিপন্নপ্রায়।
তবে দাদার এই শখটি বা ইচ্ছেটি পূরণ হয়েছে শতভাগ। আহমেদ ফয়সল যখন কৈশোরে তখন গাছটিতে ফল আসে এবং পাকা কমলালেবু খাইয়ে তবেই দাদা তৃপ্ত হয়েছিলেন এবং এর কয়েক বছর পর দাদাও চিরকালের জন্য লোকান্তরিত হলেন অনন্তের পথে। তখন তার বয়স হয়েছিল নব্বই ছুঁইছুঁই এবং গাছটির বয়স হয়েছিল তখন পনেরো কিংবা ষোলো। আর এখন আহমেদ ফয়সলের বয়স আর গাছের বয়স প্রায় সমান। অবশ্য গাছটিতে এখনও মাঝেমধ্যে ফল ধরে। তখন তারা পরম যত্নে গাছটিকে যত্ন করেন। ভালোবাসেন। যেমন তিন মাস পরপর আহমেদ ফয়সল যেদিন পেনশনের টাকা পান তখন দুই-চার দিন তার আদর-আপ্যায়ন থাকে। এরপর আবার সেই আগের মতো, ছেলের বউয়ের খোঁচা দিয়ে কথা বলা, গালমন্দ করা এগুলো তাকে শুনতে হয়। না শুনে উপায় নেই। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বলেই হয়তো। তিনি ধৈর্য ধরেন। নামাজ পড়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। স্ত্রী গত হয়েছেন বছরপাঁচেক হলো। যে বছর একমাত্র ছেলেকে বিয়ে দিলেন, তার তিন মাসের মাথায় ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যান। সেই থেকে তিনি একা।
স্ত্রী মরিয়ম বেগম বেঁচে থাকতে কমলালেবু গাছটির যত্ন নিতেন। উঠানের একপাশে ফুলের বাগানও করতেন। এখন আর ফুলের বাগান কেউ করে না। স্ত্রীকে হারিয়ে তিনিও যেন বেঁচে থাকার আনন্দ হারিয়ে ফেলেছেন। আর এখন তো সংসারে শুধুই অশান্তি আর অশান্তি। তিনি এই অশান্তির কোনো কারণ খুঁজে পান না। ছেলের বউ প্রায়ই বলতে থাকে গ্রাম তার ভালো লাগে না। গ্রামে নাকি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এ নিয়ে কয়েক দিন পরপর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে। তার ছেলে আহমেদ মারুফ একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা। তার কর্মস্থল বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। শহরের উপকণ্ঠে। ভালো বেতন পায়। সংসারে অভাব নেই। তারপরও কেন এমন হয় ঠিক তিনি বুঝতে পারেন না। ভাবেন, তার বাড়ি তো শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র ১২ কিলোমিটারের ব্যবধান। এর মধ্যে এখন রাস্তাঘাট আগের তুলনায় অনেক ভালো। বাড়ির পাশ দিয়ে রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা সিএনজি, বাস, অটোরিকশা চলছে। গাড়িতে উঠলে আধাঘণ্টায় শহরে গিয়ে পৌঁছানো যায়। তারপরও তিনি ছেলের সংসারের শান্তির জন্য প্রায়ই বলেন, বাবা তুমি যদি পার বউমাকে নিয়ে শহরে থাক। আমার কোনো আপত্তি নেই।
ছেলে মারুফের উত্তর, বাবা, তোমাকে একা রেখে কীভাবে যাব। এটা তো সম্ভব নয়। আমরা চলে গেলে তোমার খাওয়া-দাওয়ার অনেক অসুবিধা হবে। ছেলের এসব কথার উত্তরে তিনি বলতেন, আমি ঠিকই ম্যানেজ করে নেব। সারাজীবন গ্রামে কাটিয়েছি। গ্রামের মানুষ খারাপ না। রান্না করে দেওয়ার মানুষের অভাব হবে না। তারপরও বাবা, তোমাকে এভাবে একা রেখে শহরে যেতে পারি না।
বাবার প্রতি মারুফের ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। কিন্তু ছেলের সংসারের অশান্তি দেখে তারও ভালো লাগে না। ছেলের এমন ভাবনার প্রত্যুত্তরে বলেন, শহরে গেলে তোরও ভালো লাগবে। আর সৌরভও ভালো একটা স্কুলে পড়তে পারবে। আমার কথা চিন্তা করিস না। এখন মোবাইল-ইন্টারনেটের যুগ। যখন-তখন ফোন দিয়ে আমার খবর নিবি। ভিডিও কলে আমাকে দেখবি, আমিও তোদের দেখব। হয়তো একদিন বউমার চিন্তাধারার পরিবর্তন হবে। গ্রামে ফিরে আসার তাড়া তৈরি হবে। আর এই বাড়িটা তো তোর। মাঝেমধ্যে সবাইকে নিয়ে আসবি। দুই-তিন দিন থাকবি। অসুবিধা তো নেই।
আচ্ছা, দেখা যাক বলে মারুফও আর কথা বাড়ায় না। স্ত্রীর অত্যাচার নীরবে সহ্য করে। তবে মাঝেমধ্যে তাদের পারিবারিক ঝগড়ার রেশ এই গাছটির ওপর এসে পড়ে। কোনো মৌসুমি ঝড় অথবা হাওয়া ছাড়াই। যেমন আহমেদ ফয়সলের ওপর দিয়ে এ রকম মাঝেমধ্যে বয়ে যায়।
সেদিন তার একমাত্র ছেলের সন্তান নাতি সৌরভ বলে উঠল, দাদা, তুমি এ গাছটিকে এত বেশি মায়া করো কেন?
সে তো আমার বয়সি। আর এই গাছটি আমার জন্মের বছর আমার দাদা লাগিয়ে বলেছিলেন, এই গাছটি বড় হয়ে যখন ফল ধরবে, তখন ফয়সল খেতে পারবে। এর জন্যই গাছটির জন্য মায়া হয়। দাদা-দাদি দুজনই গাছটির যত্ন নিতেন। আমি যখন এই গাছটির পাশে এসে দাঁড়াই, তখন দাদা ও দাদির স্মৃতি মনে পড়ে। তারা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই। তা হলে তোমার দাদা-দাদি এখন কোথায়?
সৌরভের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, দাদাভাই, তারা তো আল্লাহর বাড়ি চলে গেছেন। এই বলে সৌরভের চিন্তা বা মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললেন, আচ্ছা দাদাভাই, তোমার বয়স তো পাঁচ হয়ে গেল। আমাকে বলো তো তুমি কোন ফল খেতে ভালোবাসো?
আম ও কাঁঠাল খুব পছন্দ, সৌরভ দ্রুত বলে উঠল।
আচ্ছা ঠিক আছে, পেনশনের টাকা পেয়েই এবার তোমার জন্য দুটো আম ও কাঁঠাল গাছের চারা এনে দেব। তারপর দুজনে মিলে যত্ন নেব।
আচ্ছা দাদা ভাই।
তারপর সৌরভ দৌড়ে গিয়ে কমলালেবু গাছটির একটি ডালে ঝুলে পড়ল। আর মনের সুখে দুলতে লাগল। সৌরভের এমন খেলা তার দাদা মনে মনে উপভোগ করেন। বাচ্চারা এই বয়সে দৌড়ঝাঁপ ও খেলাধুলা করলে শরীর মজবুত হয়, বাচ্চারা দ্রুত লম্বা হয়। তিনি শুনেছেন ব্রেনও সক্রিয় থাকে। এমন সময় সৌরভের মা এসে বলল, পড়ে যাবি তারপর হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে যাবি নাকি। এই কথা বলতে বলতে আরও কিছু খারাপ কথাও বলে গেল। গাছটি নাকি অপয়া। ফল আসে না। এমন গাছটি রেখে কী লাভ? সৌরভকে টেনে বাড়ির ভেতরে নিয়ে চলে যায়।
সৌরভের দাদা আহমেদ ফয়সল সবই বুঝেন। কিছু না বলে চুপ করে থাকেন। সৌরভের মধ্যে তিনি তার ছোটবেলার ছায়া খুঁজে বেড়ান। তার এই অবসর জীবনের খানিকটা সময় সৌরভকে নিয়েই কাটে। বাকি সময় মসজিদে আর কুরআন তেলাওয়াত করে পার করেন। তবে এশার নামাজটা বাড়িতেই পড়েন। সন্ধ্যার পর তিনি বাড়ি থেকে সাধারণত বের হন না। চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে, এটি তিনি ভালো করে বুঝতে পারেন। মনে মনে ভাবেন, এই সময়টা স্ত্রী কাছে থাকলে কত যে উপকার হতো।
সামনে কুরবানির ঈদ। হাতে গুনলে আর মাত্র সাত দিন। ঘর থেকে বের হয়ে গ্রামের পথে হাঁটলে চারপাশে একটা আনন্দ আনন্দভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু আহমেদ ফয়সল সাহেবের ভেতরে সেই আনন্দ কিংবা খুশি খুশিভাব নেই। পাড়া-প্রতিবেশীদের বুঝতেই দেন না, তার বাড়ির অন্দরমহলের কুরুক্ষেত্র। তারপরও সৌরভ যখন কাছে আসে দাদা দাদা বলে কোনো কিছু আবদার করে তখন কী যে তার আনন্দ লাগে, এই আনন্দটুকু নিয়েই যেন তার বেঁচে থাকা। কিন্তু সেটিও বোধকরি আর হবে না।
আজ শুক্রবার। ছেলের ব্যাংক বন্ধ। বারান্দায় বসে তিনি ছেলে মারুফ ও বউমা আনিসাকে ডাকলেন। তারা বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে তিনি সোফা দেখিয়ে বললেন, দুজন বসো। কিছু কথা বলার আছে; গতকাল রাতেও মনে হয় তোমরা কিছু নিয়ে ঝগড়া করেছ। মাঝেমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতেই পারে। কিন্তু ঘনঘন ঝগড়া মোটেই সংসারের জন্য ভালো না। আচ্ছা যাক, বেয়াইনের সঙ্গে গতকাল দুপুরে কথা হয়েছে। এবারের কুরবানির ঈদে তার শহরের বাসায় আমাদের ঈদের দাওয়াত দিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি দিয়ে থাকেন, আমিও বেয়াইকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ঈদের দাওয়াত দিয়ে থাকি। এবারও দিয়েছি কিন্তু তিনি খুব জোর করেই বললেন, তিনি চান এবার তার মেয়েটাকে নিয়ে ঈদ করতে। আমি চাই তোমরা যাও, তিনিও মুরুব্বি। তার সঙ্গে এবারের ঈদের খুশিটা ভাগাভাগি করো এবং সেই সঙ্গে মাসখানেক থেকে আসো।
মারুফ বলল, বাবা তুমি একা একা ঈদ করবে?
একা কোথায়, পাশের বাড়ির নজরুল ও মতিন তো আমার সঙ্গে আছে। ওদের নিয়ে গরু কিনব, কুরবানি দেব। ঈদের নামাজ পড়ব। তারপর কুরবানির মাংস বণ্টন করব। আশপাশে দাওয়াত খেয়েই তো আমার কয়েক দিন চলে যাবে।
শ্বশুরের কথা শুনে আনিসার মনটা ভালো হয়ে গেল। তা হলে কবে যেতে পারি বাবা?
ঈদের আগে, যেকোনো দিন তোমরা যেতে পারো।
অতঃপর মারুফ ও আনিসা দুজনই বারান্দা থেকে বাড়ির অভ্যন্তরে চলে যায়। সৌরভ বাড়ির ভেতরে তখনও ঘুমিয়ে ছিল।
আহমেদ ফয়সল বারান্দায় বসে থেকে তার প্রিয় কমলালেবু গাছটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, গতকাল রাতের তীব্র বাতাসে আরও একটি ডাল ভেঙে পড়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন গাছটির হায়াত কমে আসছে। এটি শুধু একটি ফলের বৃক্ষ
নয়, বৃক্ষটির জন্য তার বড়ই মায়া, এ যে মায়াবৃক্ষ। এই ভেবে তিনি একবার নিজের দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন, মায়াবৃক্ষেরে সঙ্গে তার সমগ্র জীবন জড়িয়ে আছে। এমন সময় অনুভব করলেন, তার বুকের ভেতরে জীবননদীর তরঙ্গ খেলা করছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে