পেঙ্গুইনের ভালোবাসা

আব্দুস সাত্তার সুমন

সাহিত্য

অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল মহাদেশ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানে বরফে ঢাকা থাকে চারদিক। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর হিমেল বাতাসের মধ্যে বেঁচে

2026-10-31T14:51:41+00:00
2026-10-31T14:53:02+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
পেঙ্গুইনের ভালোবাসা
আব্দুস সাত্তার সুমন
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫১ পিএম  আপডেট: ৩১.১০.২০২৬ ২:৫৩ পিএম
সময়ের আলো গ্রাফিক
অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল মহাদেশ। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানে বরফে ঢাকা থাকে চারদিক। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর হিমেল বাতাসের মধ্যে বেঁচে থাকা বেশ কঠিন। বিশেষ করে শীতকালে বাতাসের ঝাপটা এতটাই তীব্র যে মনে হয়, শরীরে যেন বরফের সুচ বিঁধছে। চারদিকে শুধু সাদা বরফের রাজ্য। দূরে কালো সমুদ্রের পানি। এমনই এক পরিবেশে হাজার হাজার সম্রাট পেঙ্গুইন জড়ো হয়েছে একটি জায়গায়।

এই পেঙ্গুইনদের ভিড়ে রয়েছে একটি ছোট্ট পরিবার। মা ও বাবা পেঙ্গুইন কয়েক দিন ধরেই পাশাপাশি রয়েছে। কিছু দিন আগে মা পেঙ্গুইনটি একটি ডিম পেড়েছে। এবার সেই ডিম আগলে রাখার দায়িত্ব বাবার।

মা পেঙ্গুইনটি খুব সাবধানে ডিমটি বাবার পায়ের ওপর তুলে দিল। বাবা পেঙ্গুইনও যত্ন করে ডিমটি দুই পায়ের মাঝখানে রাখল। তারপর পেটের নিচের বিশেষ চামড়ার ভাঁজ দিয়ে ঢেকে দিল। মুহূর্তেই ডিমটি অদৃশ্য হয়ে গেল উষ্ণ আশ্রয়ের ভেতর।

এবার মাকে যেতে হবে খাবারের খোঁজে। ডিম তৈরির সময় তার শরীরের অনেক শক্তি খরচ হয়েছে। তাই সুস্থ থাকতে এবং আবার শক্তি ফিরে পেতে তাকে সমুদ্রে গিয়ে মাছ ও ছোট ছোট সামুদ্রিক প্রাণী খেতে হবে।

যাওয়ার আগে মা পেঙ্গুইন একবার সঙ্গীর দিকে তাকাল। যেন নীরবে বলে গেল, ‘আমাদের ছোট্ট অতিথির খেয়াল রেখো।’ তারপর অন্য পেঙ্গুইনদের সঙ্গে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল সে।

বাবা পেঙ্গুইন রয়ে গেল বরফের দেশে। এখন তার পৃথিবী বলতে পায়ের ওপর রাখা ছোট্ট ডিমটি। সেটিকে উষ্ণ ও নিরাপদে রাখাই তার একমাত্র কাজ।

কিন্তু কাজটি মোটেও সহজ নয়।

দিন যত যায়, ঠান্ডা তত বাড়তে থাকে। হিমেল বাতাসের সঙ্গে ওড়ে আসে বরফের কণা। কখনো কখনো ঝড়ের মতো বাতাস বইতে শুরু করে। এমন সময় বাবা পেঙ্গুইন মাথা নিচু করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের শরীর ঠান্ডায় কাঁপলেও ডিমটিকে সে এক মুহূর্তের জন্যও বরফের সংস্পর্শে আসতে দেয় না।

কারণ ডিমটি যদি পায়ের ওপর থেকে পড়ে যায়, তা হলে মুহূর্তেই জমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই হাঁটাচলা করার সময়ও তাকে খুব সতর্ক থাকতে হয়।

এদিকে খাবার খাওয়ার জন্য সমুদ্রেও যেতে পারে না সে। ডিম ফোটার আগপর্যন্ত তাকে নিজের শরীরে জমিয়ে রাখা শক্তি দিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। ভাবতে পারো, কতটা ধৈর্য আর সাহস থাকলে এমন কঠিন সময় পার করা যায়!

তবে বাবা পেঙ্গুইন একা নয়। তার আশপাশে আরও হাজার হাজার বাবা পেঙ্গুইন একইভাবে ডিম আগলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তারা একে অপরের গা ঘেঁষে জড়ো হয়। এতে সবার শরীরের তাপ ধরে রাখা সহজ হয়। আবার কিছুক্ষণ পরপর তারা নিজেদের অবস্থান বদলায়। যারা বাইরের দিকে থাকে, তারা ভেতরে চলে আসে। আর ভেতরের পেঙ্গুইনগুলো যায় বাইরের দিকে। এভাবে সবাই মিলে ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করে।

দিন যায়, রাত যায়। বরফের দেশে সময় যেন থমকে থাকে। কিন্তু বাবা পেঙ্গুইনের অপেক্ষা ফুরায় না।

অন্যদিকে মা পেঙ্গুইন তখন সমুদ্রে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। কখনো পানির গভীরে ডুব দিচ্ছে, কখনো মাছের পেছনে ছুটছে। তারও ফিরতে হবে। কারণ বরফের দেশে তার জন্য অপেক্ষা করছে ছোট্ট একটি প্রাণ।

এভাবে প্রায় দুই মাস কেটে গেল।

এক সকালে বাবা পেঙ্গুইন হঠাৎ টের পেল, পায়ের ওপর রাখা ডিমটি নড়ছে! খোলসের গায়ে ছোট্ট একটি ফাটল দেখা দিয়েছে। সে আরও সাবধানে ডিমটিকে আগলে রাখল। কিছুক্ষণ পর খোলস ভেঙে বেরিয়ে এলো তুলতুলে একটি ছানা।
ছানাটির শরীর ধূসর নরম পালকে ঢাকা। পৃথিবীর আলো-বাতাসে চোখ মেলেই সে মৃদু শব্দে ডাকতে শুরু করল। চারদিকে প্রচণ্ড ঠান্ডা। তাই বাবার উষ্ণ পায়ের ওপর মুখ গুঁজে আবার নিশ্চিন্তে বসে পড়ল সে।

বাবা পেঙ্গুইনের আনন্দের যেন সীমা নেই। এত দিন ধরে যে ডিমটিকে সে বুকের উষ্ণতা দিয়ে আগলে রেখেছিল, আজ সেখান থেকেই বেরিয়ে এসেছে তার ছোট্ট সন্তান!

কিন্তু আনন্দের পাশাপাশি নতুন চিন্তাও দেখা দিল। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে বাবার শরীরে তখন খাবার প্রায় শেষ। এবার তাকে সমুদ্রে গিয়ে খাবার খেতে হবে। অন্যদিকে মা পেঙ্গুইনেরও ফিরে আসার সময় হয়েছে।
কিন্তু হাজার হাজার পেঙ্গুইনের এই বিশাল দলে নিজের সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়া কি সহজ কথা?

অবশেষে একদিন সমুদ্র থেকে ফিরে এলো মা পেঙ্গুইন। বরফের ওপর দাঁড়িয়ে সে ডাকতে লাগল। তার ডাক শুনে বাবা পেঙ্গুইনও সাড়া দিল। হাজার হাজার পেঙ্গুইনের ভিড়েও পরিচিত ডাক চিনতে তাদের অসুবিধা হলো না। এভাবেই তারা একে অপরকে খুঁজে পেল।

মা পেঙ্গুইন কাছে এসে নিজের ছানাটিকে আদর করে পায়ের ওপর তুলে নিল। এবার তার পালা সন্তানকে উষ্ণতা ও নিরাপত্তা দেওয়ার।

বাবা পেঙ্গুইন তখন সমুদ্রের দিকে রওনা হলো। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার পর তার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। তাকে খাবার খেয়ে আবার শক্তি ফিরে পেতে হবে। কারণ সামনে আরও অনেক দায়িত্ব। ছোট্ট ছানাটিকে বড় করে তুলতে মা-বাবা দুজনেরই সুস্থ থাকা প্রয়োজন।

ছানাটি তখন মায়ের পায়ের ওপর নিশ্চিন্তে বসে আছে। নতুন পৃথিবীকে চিনতে তার ভীষণ কৌতূহল। কখনো মাথা উঁচু করে চারদিকে তাকায়, কখনো ছোট্ট মুখে মৃদু ডাক দেয়। মা পেঙ্গুইন তাকে আরও কাছে টেনে নেয়।

অ্যান্টার্কটিকার এই বরফের রাজ্যে এভাবেই গড়ে ওঠে সম্রাট পেঙ্গুইনদের পরিবার। এখানে গাছপালা নেই, বাসা বানানোর মতো উপকরণ নেই, শীত থেকে বাঁচার কোনো ঘরও নেই। তবু তারা ভালোবাসা আর দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলে।

কখনো মা খাবারের খোঁজে সমুদ্রে যায়, কখনো বাবা যায়। একজন বাইরে থাকলে অন্যজন আগলে রাখে তাদের সন্তানকে। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এই লড়াইয়ে কেউ কাউকে একা ফেলে যায় না।

ভাবতে পারো, মানুষের মতো কথা বলতে না পারলেও এই পেঙ্গুইনদের মধ্যে কত গভীর ভালোবাসা!

বরফে ঢাকা পৃথিবীর সেই দূর দেশে একটি ছোট্ট পেঙ্গুইনের জন্ম হয় এভাবেই— বাবা-মায়ের অসীম ধৈর্য, ত্যাগ, অপেক্ষা আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   পেঙ্গুইনের ভালোবাসা  আব্দুস সাত্তার সুমন  সাহিত্য  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: