সময়ের আলো গ্রাফিকহেমন্ত এমন এক ঋতু, যাকে ঠিক ধরা যায় না। শারদ শেষে আগত অতিথি হেমন্ত, কী আছে তার? ওই নীলাকাশ আর প্রান্তরে মিহি কুয়াশার উঁকি? সেই অর্থে হেমন্ত যতখানি ঋতু, তার চেয়ে বেশি অন্য এক ঋতুর পূর্বাভাস! অর্থাৎ শীতের আগমনি গান গাওয়ার দায়িত্ব হেমন্তের, বাংলায়। হেমন্ত যদিও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নয়, ঋতুমাত্র; তবু হেমন্ত গান শোনায়? নাকি জীবনানদ দাশ হয়ে হেমন্ত জন্মায় বরিশালে, একদিন ট্রামের চাকার নিচে পড়ে মারা যায় কলকাতায়?
এত বছর পর আজ, আজও আমি হেমন্ত-আখ্যান লিখব? কেমন করে? বদলে গেছে না, সবকিছু? আগের মতো কী আছে আর? ধানসিঁড়ি নদীটিও কি দখল হয়ে যায়নি অনেকটা? সেই হেমন্তও আর আগের মতো নেই। হয়তো হেমন্ত মারা পড়ে গেছে। ধান কাটার পর শুকনো নাড়ার আগুন বলতে আজ আমরা কিছু বুঝি? আজ বড়জোর একটি কবিতার বই আমাদের পড়ার টেবিলে শুয়ে আছে! অথবা বইয়ের তাকে অন্যান্য বইয়ের ভাঁজে আত্মগোপন করে আছেন বিনয় মজুমদার অথবা অঘ্রানের অনুভূতিমালা! কী সেই অনুভূতি?
সেই মায়াবী, লোকায়ত বাংলাভূমির অনেকটাই তো বদলে গেছে। হয়তো এ বদলই এক অনিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর বহু দেশেই ঋতু আছে দুটি বা চারটি। এ দেশে ছয়টা। বলাই যায়, অত্রাঞ্চলেই অধিক ঋতু অর্থাৎ বৈচিত্র্য বেশি। যার প্রকাশ ঘটেছে গানে, কবিতায়, ছবিতে বা মানুষের মনেই। গ্রীষ্ম যেমন দারুণ মুখর, বর্ষাও যেমন সঘনে দৃশ্যায়িত, হেমন্ত তেমন নয়।
এক মিহি আঁচড়ে প্রবাহিত বা প্রকাশিত এই ঋতু। অনেকটা সেই মেয়ের মতো, যে কি না সাজুগুজু করতেই চায় না, তবু তার আকর্ষণকে এড়িয়ে থাকতে পারি না আমরা। আমরা হাঁটতে থাকি, যেই পথ দিয়ে হেমন্ত হেঁটে গেছে কার্তিকপুরের দিকে, কার্তিকপুর কোথায় গো? কার্তিকপুরে কি নদী আছে? সেই নদীর নাম কী? সেই নদীতে কি ছইওলা নৌকো যায়? ছইনৌকোয় নতুন বউ যায়? নাইওরে যায়? তখন কি আমাদের মনে পড়ে, কে যাইস রে, ভাটির গাঙ বাইয়া/ আমার ধন ভাইরে কইয়ো...।
কথা হচ্ছিল হেমন্ত নিয়ে, হেমন্তের প্রচার-প্রসার, উৎপত্তি-ব্যুৎপত্তি নিয়ে! কই, উৎপত্তি-বুৎপত্তি নিয়ে কথা হলো কোথায়? কথা হয়নি, কথা হতে পারত। কী কথা হয়নি, কী কথা হতে পারত! কার সঙ্গে কথার কথা বলছি আমি?
নিজের সঙ্গেই কথা হতে পারত! নিজের কাছেই তো কত কথা জমিয়ে রেখেছি আমরা। কোনোদিন কাউকে বলাই হবে না, লেখাও হবে না সেই কথা! কথারা জমে উঠুক, কথার পাহাড় হয়ে যাক। পাহাড় যদিও নির্বাক থাকতে পছন্দ করে, পাহাড়ের দিক থেকে কুয়াশা উঁকি দেয়। কুয়াশায় হেমন্ত লুকিয়ে আছে। থাকুক। যার যেখানে থাকতে ইচ্ছে, থেকে যাক। নদীর ইচ্ছে বেঁকে যাওয়ার, বেঁকে যাক।
যে কথা বলছিলাম, হেমন্তকে ঘিরেই তো জাল বুনতে চাচ্ছিলাম, জাল বোনা হলো? ছন্দে ছন্দে তাল বোনা হলো? কাল গোনা হলো? কাল বলতে এ মুহূর্তে হেমন্ত কালকেই হয়তো মেমোরিতে রাখতে চাচ্ছি।
যে কথা বলছিলাম, সবকিছুই তো বদলে গেছে, বদলে যাচ্ছে ভীষণ। চিঠিপত্র না লেখা এ যুগে এআইকে জিজ্ঞাসা করতে চাইব, হেমন্ত সম্পর্কে যা জান, বিস্তারিত লিখে জানাও। পারলে হেমন্তের নামে কোনো স্ক্যান্ডাল থাকে সেগুলো দেখাও। অথবা হেমন্ত, তুমি ভাই আমাকে নিয়ে চলো অরণ্যের দিকে, হেমন্তের অরণ্যে, আমি দেখতে চাই সেই অরণ্যে কোনো পোস্টম্যান আছে কি না! শক্তি জানিয়েছিলেন, হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক...।
আদতে সেই অরণ্যও নেই আজ, পোস্টম্যানও নেই। মানুষ এখন চিঠি লেখে না। ই-মেইলে লেখে, হোয়াটসআপে লেখে বা পড়ে। পড়ুক। ভোরে বা সন্ধ্যায় এই হেমন্তে একটু-আধটু যেটুকু কুয়াশা যা পড়ে পড়ুক, তাতে যার ইচ্ছে পা ভিজিয়ে হাঁটুক, নইলে বসে থাকুক আবছায়া আঁধারে, যেন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। হেমন্তে সন্ন্যাস আছে, এ তো আমরা জানিই।
সময়ের আলো /প্রিন্ট/টিকে