সময়ের আলো গ্রাফিকবাছিরন বেওয়া। শ্যামলা বর্ণের। বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে হবে। বাছিরন প্রতিদিন ভোরে কোদাল নিয়ে বের হয়। সঙ্গে আঁচলে গুঁজিয়ে নেয় তার পাঁচ-ছয় মাসের সন্তান পারুলকে। পারুল বাবাকে দেখেনি। এর আগেই তার বাবা মাঠে কাজ করতে করতে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। বাছিরনের এই জীবনে পারুল ছাড়া আর কেউ নেই। নেই কোনো শোবার ঘর, বাসস্থান। যেখানে রাত সেখানেই কাত। গ্রামে গ্রামে কৃষকদের চেনা-জানা বাছিরন বেওয়া। তাই রাত হলেই কেউ না কেউ তাকে উঠানের এক কোনে থাকতে দেন। দুমুঠো খাবার দিলে তা নিজের মুখে তোলে এবং পারুলের মুখে যৎসামান্য তুলে দেয়। পরের দিন সকাল হলে আবার পারুলকে পাঁজরের কাছে সুতি মোটা কাপড় দিয়ে প্যাঁচিয়ে কাঁধে কোদাল নিয়ে বের হয়।
প্রতিটা গ্রামেই জমি থেকে আলু উঠানোর জোর মৌসুম এখন। প্রতিটি কৃষক বিঘা বিঘা জমি আলু রোপণ করে। একসঙ্গে যেমন রোপণ করে আবার একসঙ্গে আলু ওঠায়। ফলে এলাকায় কামলা কিষান আর দিনমজুরের ভিড় জমিয়ে ওঠে এলাকায়। জমিতে কিষানের আলু উঠানো হয়ে গেলে সেখানে তৎক্ষণাৎ নেমে পড়ে আলু কুড়ানির দল। তারা দলবেঁধে কোদাল দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে আলু কুড়োয়। এভাবে কেউ কেউ চার-পাঁচ কেজি আলু কুড়োতে পারে। বাছিরনও এই মৌসুমে মণখানেক আলু কুড়োতে পারে। এই মণখানেক আলু বাছিরন বিশ্বস্ত এক কৃষককে বেচতে দেয়।
‘টুকু, তুই এ্যনা হামার মণখানেক আলু বেচে দিবু?’
‘পাগলি তুই এতুডি আলু কুড়াচু। তাইলে আজি বেচে দেমোনি, দেস।’
বিকালে বাছিরন বস্তাখানেক আলু টুকুকে দেয়। টুকু স্কেলে তুলে দেখল পঞ্চাশ কেজি। বাছিরনকে বলল, ‘এক মণের সামান্য কম আছে বাছি।’
‘হামার যে আর নাই। ওইটুকু হামি দিয়ে বেচে দেমোনি বাছি...।’ বাছিরন অতি সরল-সহজ গ্রামের মহিলা। সহজে সবাইকে বিশ্বাস করে। এ ছাড়া যে তাদের মতো মানুষদের উপায়ও নেই। টুকুর দশ কেজি আলু মেরে নেওয়ার কৌশল দেখার মতো চোখ বাছিরনের নেই। টুকু বাছিরনকে তার কুঁড়েঘরে থাকার কথাও বলে চলে যায়। পরের দিন বাছিরন আবার কোদাল নিয়ে ছোটে মাঠে। টুকুর সঙ্গে দেখা হলে বলে, ‘কয় টেকা বেচ্চু টুকু?’
‘বেচ্চি তো, টেকাই দেয়নি মওজন’
‘গায়ে হামার জ্বর বচ্চচে রে। ওষুধ খাওয়া লাগবি।
বাছিরন পারুলকে কোঁচায় ধরে দলের সঙ্গে আবার আলু কুড়োতে চলে যায়। চারদিকে শন শন বাতাস। মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো শীত। বাছিরনের পরনে ময়লাযুক্ত মোটা সুতি কাপড় আর বুক ঢেকে আছে ছেঁড়াছুঁতো ব্লাউজ দিয়ে। তাতে এই মাঘের শীত কতটাইবা যায়। তার ওপরে গায়ে জ্বর। ফলে বাছিরন ক্রমে শীতে কাঁপছে। দলের কিছুজনের গায়ে মোটা চাদর, মোটা জামা থাকলেও অনেকের শরীরে তা নেই। বাছিরন এই মাঘের শীতের সঙ্গে আর পেরে উঠল না।
কাঁপতে কাঁপতে টুকুর বাড়িতে এলো। টুকু আলুর টেকাটা দে ভাই। টুকু বলে, বাছি তোর গায়ে তো খুব জ্বর। হামি ওষুধ দিচ্ছি এনে। বলে টুকু একটু দূরে স্ট্যান্ডে গিয়ে তিনটি নাপা, তিনটি সর্দি-কাশির ট্যাবলেট এনে দিল। বাছিরন খুশি হয়ে টুকুকে বলে, ‘ভাই বাঁচালু তুই, আল্লা তোর ভালো করবি।’ টুকু এবার আলু বিক্রির এক মণের তিনশ টাকা হাতে দিয়ে বলল, আলুর চাশশ টেকা দিছিল বুচ্চু বাছি, তার মধ্যে থেকা ওষুধ আননো একশ টেকা আর এই নে তিনশ টেকা।’ বাছিরন হিসেবের কী বোঝে। বাছিরন কাপড়ের আঁচলে টাকাগুলো গুঁজিয়ে পারুলকে পাশে শুইয়ে নিজেও মাথায় হাত ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। জ্বরে শরীর খাঁ খাঁ করছে। তখন বেলা ৩টা বাজার কাছে। বাছিরন সামান্য আরামবোধ করলে আবার কোদাল কাঁধে নিয়ে পারুলকে কোঁচায় কাপড় দিয়ে প্যাঁচিয়ে মাঠে আলু কুড়োতে যায়। মাঠ থেকে তখন অনেকেই কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে।
তখন খলিল বলল, ‘বাছি তুই এই কোন সময়ে আলু কুড়াতে যাস?’ বাছিরন কোনো কথা বলে না। হট হট করে আল ধরে চলছে। কোলের সন্তান পারুল খিদেয় ছটফট করছে। বুকের দুধ তেমন পায় না। মুখে খাবার নেই, পুষ্টি নেই। দুধ আসে কোত্থেকে। সন্তানের কান্না সহ্য করতে না পেরে বাছিরন কাঁধে কোদাল নিয়ে আবার ফিরে আসে গ্রামের দিকে। আসার পথে কোদালের ঘাড়িটা ভেঙে যায়। বাছিরনের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। দুই-তিন বছর হলো কোদালটা মেরামত করে নিয়েছে। তখনও একবার কোদালের ঘাড়ি ভেঙে গিয়েছিল। মেরামত করতেও আবার সেই লোককে টাকা দিতে হয়। শক্ত বাঁশের গোড়ালি সংগ্রহ তারপর খুব মজবুত করে কোদালের সঙ্গে জুড়িয়ে দিতে হয়। এ নিয়ে বাছিরন চিন্তিত হয়ে পড়ে। আবার টাকা লাগবে কোদাল মেরামত করতে। বাছিরন গ্রামের স্ট্যান্ডে এসে সন্তানের জন্য একটা পাউরুটি, নিজের জন্য আরেকটি পাউরুটি কেনে দোকান থেকে। পারুল আস্তে আস্তে চোখ মুছে শান্ত হয়।
মাঘের সন্ধ্যা। কনকনে শীত। বাছিরন কোথায় রাত কাটাবে। পেটের ক্ষুধা তাকে তেমন কাত করতে পারে না। এ রকম অনেক দিন, অনেক রাত বাছিরন না খেয়ে পড়ে কাটিয়েছে। তাই তার সহ্য ক্ষমতাও পোক্ত হয়ে গেছে। সামনে এসে খলিল বলে, ‘বাছি থাকার ব্যবস্থা হচে তোর?’
‘নারে খলিল, কোদালটার ঘাড়ি ভাঙে গ্যাছে, তুই ঠিক করে দিবু এনা? টেকাই দেমোনি।’
খলিল বলে, ‘সময় পাইনারো, কালকে ভিঁউ ওমো।’ বাছিরনের মন আরও খারাপ হয়। বলে, ‘খলিল তুই কয় টেকা লিবু ক তো? কোদাল ঠিক না হলে খামো কি এ্যা?’
‘দেখি কাল বৈকালে ক’রে দেমোনি। বাছিরন বলে, ‘তাইলে তোর ওটি আজ থাকমোনি। কাল তুই কোদাল ঠিক ক’রে দিবু।’ বাছিরন ভাঙা কোদাল নিয়ে পারুলকে কোলে ধরে খলিলের বাড়িতে ওঠে।
খলিল গ্রামের একজন জোচ্চোর মানুষ হিসেবে পরিচিত। মুখে মুখে মাকাল ফলের মতো সুন্দর হলেও ভেতরটা কালো কুৎসিত। রাত বারোটার পর খলিল বাছিরনের কাছে যায়। বাছিরনের কায়-ক্লেশের শরীর। বিছানায় মাথা ঠেকালেই আর জ্যান্ত থাকে না। ঘুমে বিভোর। বাছিরন খলিলের উপস্থিতি টের পায়। চমকে উঠে বসে পড়ে। খলিল হতচকিয়ে ওঠে। বলে, ‘বাছি চুপ থাক, কথা কোস না। এই নে পাঞ্চাশ টাকা।’ বাছিরন বলে, কী করমু এই টেকা। ‘ধাত, পাগলি, বুঝিস না’ বাছিরন হুঁশ জ্ঞানে কম। মাথা মোটা রকমের। সহজেই একটা কথা মাথায় ঢোকে না। তবে খলিলের আচরণ অল্প অল্প করে বুঝতে পারে। বলে, ‘কালকে তুই কোদাল ঠিক করে দিবু না’ খলিল আস্তে বলে, ‘হ পাগলি। কোদাল ঠিক কইরা দেমো, এই ধ, এই টেকাও নে।’ বাছিরন সম্পর্কে এলাকায় কোনো রিপোর্ট নেই। রাত বিরাতে এথারে-ওথারে ঘোরে, রাত কাটায়। সবাই এক নামে চেনে। বাছি পাগলি। বাছিরন হাত জোর করে বলে, ‘খলিল, তোর টেকা তুই নে। হামার কোদাল ঠিক করা লাগবি নে। এই পারুল ওঠ বাবা ওঠ। চ...।’ খলিল বাছিরনের হাত ধরতে যায়। বাছিরন হাত থেকে সটকে সন্তানকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বাইরে বের হয়। সঙ্গে কোদালটাও ভুল করে রেখে আসল না।
রাত তখন ২টা পার। হিম কুয়াশার রাত। চারপাশে সাদা সাদা কুয়াশা। বাছিরন ঠুক ঠুক করে রাস্তা ধরে হাঁটছে। ঠান্ডায় কাঁপছে। ছয় মাসের সন্তান পারুল তার প্রাণের গভীরে বসত করে থাকে সবসময়। শত কষ্ট ক্লেশে পারুলের চঞ্চল মুখের দিকে তাকালে স্বামী হারানোর কষ্ট ভুলে থাকে।
কিছুদূর পেরোতেই পাকুড় গাছের মোড়ে এসে দুজন যুবক বাছিরনের পথ আটকায়। বাছিরনের কাছ থেকে আলু বিক্রির সব টাকা আর আলু নিয়ে সটকে যায়। বাছিরন নির্বিকার হয়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে। ‘হায় আল্লা, এহন হামি পারুলকে কী খাওয়ামু। কী দিয়া কোদাল ঠিক করমু।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে