রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পো পরপস্পকে মনে রেখেছেন আজীবন। গ্রাফিক : সময়ের আলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন-
‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী
তুমি থাকো সিন্ধুপারে ওগো বিদেশিনী।’
এই বিদেশিনী ছিল রবীন্দ্রনাথের কল্পনা। কিন্তু কোনো এক ইন্দ্রজালের টানে ৩০ বছর পর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে নাটকীয়ভাবে কবির দেখা হয়ে যায় সেই কল্পনার বিদেশিনীর সঙ্গে! আজ থেকে ১০২ বছর আগে এই দিনেই কবি আর্জেন্টিনার মাটিতে পা রেখেছিলেন।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর কাব্যগ্রন্থটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হলো। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল কবিগুরুর নাম। এর পরের বছর বুয়েনস আইরেসে বসে গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হন আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নারীবাদী লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। বিবাহ-বিচ্ছেদের যন্ত্রণার ভেতর গীতাঞ্জলি তার জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। গীতাঞ্জলি পড়ে শুধু লেখা নয়, লেখকেরও প্রেমে পড়েন ওকাম্পো! অপেক্ষা করতে থাকেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হওয়ার।
১৯২৪ সাল। পেরু সরকারের আমন্ত্রণে পেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবর্ষ উদযাপনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তার বয়স ৬৩ বছর। ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে পেরু পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় অনেকটা পথ। দীর্ঘ এ সমুদ্রযাত্রায় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। নিরুপায় হয়ে নামেন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে। সেখানে সান ইসিদ্রো নামে ছোট্ট শহরতলির এক হোটেলে উঠেন কবি। এ খবর হাওয়ার বেগে ছড়িয়ে পড়ে আর্জেন্টিনায়। বার্তা পৌঁছায় ওকাম্পোর কাছেও। এ খবর শুনে তিনি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন, তার দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার অবসান হলো। এত কাছে এসেছেন গীতাঞ্জলির সেই গীতিকার, একদম নিজের দেশে, যেন নিজের বাড়ির উঠানে, তাকে একনজর না দেখলেই নয়।
কালবিলম্ব না করে ছুটে যান ওকাম্পো। কবির অসুস্থতায় তিনি উদ্বিগ্ন হন। কবিকে সুস্থ করার জন্য হোটেল থেকে রিও ডি প্লাতা নদীর ধারে ‘মিরালরিও’ নামে তাদের বাগানবাড়িতে নিয়ে আসেন। বাগানবাড়িটি ভিক্টোরিয়ার পারিবারিক বসতবাটি ‘ওকাম্পো ভিলা’র খুব কাছেই ছিল। কবিগুরুর সেবাযত্নের কোনো ঘাটতি রাখেননি ওকাম্পো। তার আতিথ্য ও সেবাযত্নে যেন তিনি মনে মনে গেয়ে উঠেছিলেন-
‘ভুবন ভ্রমিয়া শেষে আমি এসেছি নূতন দেশে
আমি অতিথি তোমারি দ্বারে ওগো বিদেশিনী।’
রবীন্দ্রনাথ প্রায় দুমাস কাটান আর্জেন্টিনায় এবং প্রায় ৩০টি কবিতা রচনা করেন সেখানে বসে। এ সময় কবিগুরুর সঙ্গে ওকাম্পোর আলাপ শুধু সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি কিংবা দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দুজনের মধ্যে রচিত হয়েছিল গভীর বন্ধুত্বও। তাদের মধ্যে এমন এক ব্যখ্যাতীত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যাকে অনেকেই ‘প্লেটোনিক লাভ’ বা ‘স্বর্গীয় ভালোবাসা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অর্থাৎ, যে ভালোবাসা জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে।
আর্জেন্টিনাতে বসে কবি ওকাম্পোকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন-
“হে বিদেশি ফুল,
যবে তোমারে শুধাই ‘বলো দেখি মোরে ভুলিবে কি’,
হাসিয়া দুলাও মাথা;
জানি জানি মোরে ক্ষণে ক্ষণে
পড়িবে যে মনে।
দুই দিন পরে চলে যাব দেশান্তরে,
তখন দূরের টানে স্বপ্নে আমি হব তব চেনা-
মোরে ভুলিবে না”
সত্যিই তারা পরপস্পকে মনে রেখেছেন আজীবন। ৩৪ বছর বয়সী ওকাম্পোকে তিনি ‘বিজয়া’ বলে ডাকতেন। এ বিজয়াকে তিনি তার ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত চিঠিও আদানপ্রদান হয়েছিল।
আর্জেন্টিনা সফর চলাকালীনই চিত্রশিল্পের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ পায় কবির। তার আগেও অবশ্য লেখালেখির সময়ে স্বভাবসিদ্ধ কাটাকুটি দিয়ে সাজিয়েছেন পাতা। তবে, ওকাম্পোই যেন তার চিত্রশিল্পীর সত্তাটাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। ১৯৩০ সালের মে মাসে প্যারিসের ‘গ্যালেরিয়া পিগলি’তে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন ধরণের চিত্রকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলেন ভিক্টোরিয়া। রবীন্দ্রনাথের জীবনে তার চিত্রশিল্প নিয়ে সেটাই ছিল কোনো নামকরা চিত্রশালায় প্রথম প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর সমস্ত আয়োজন ও ব্যয়ভার বহন করেছিলেন ভিক্টোরিয়া। প্যারিসের সেই আয়োজনেই দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো দেখা হয় তাদের....
সময়ের আলো/মহু