শালবনের বুড়ো বটগাছের তলায় আজ বনের পশুপাখিরা সবাই জড়ো হয়েছে। তবে কোনো দুঃখের কারণে নয়, বরং এক আজব মজার আড্ডায় মেতে উঠতে। আড্ডার মাঝেই বনের সবচেয়ে অলস প্রাণী কাঠবিড়ালি হুট করে এক ঘোষণা দিয়ে বসল। সে বুক ফুলিয়ে বলল, এই বনে আমার চেয়ে চটপটে, বুদ্ধিমান আর সাহসী আর কেউই নেই।
পাশে বসা শিয়াল চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠল, বলিস কী রে, পুঁচকে কাঠবিড়ালি। তুই সাহসী? কাল সকালেই তো দেখলাম একটা মরা সাপের লেজ দেখে ভয়ে তিন লাফে গাছের মগডালে উঠে গিয়ে কাঁপছিলি।
কাঠবিড়ালি মোটেও দমবার পাত্র নয়। সে লেজ ফুলিয়ে বলল, ওটা ভয় ছিল না শিয়াল পণ্ডিত! ওটা ছিল আমার আধুনিক কৌশল। ওপর থেকে সাপের গতিবিধি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম।
এমন সময় ডাল থেকে মাথা নিচু করে ঝুলে থাকা বাদুড় বলে উঠল, আরে রাখো তোমার দুরবিন মার্কা পর্যবেক্ষণ। বনের আসল সাহসী তো আমি। তোরা কেউ আমার মতো সারারাত উল্টো হয়ে ঝুলে দুনিয়াটা উল্টো দেখতে পারবি? বুক কাঁপলে কি আর এভাবে থাকা যায়! তর্ক যখন চরমে, তখন ঝোপের আড়াল থেকে গম্ভীর গলায় ডাক এলো হালুম!
বনের রাজা সিংহ গুটিগুটি পায়ে আড্ডায় এসে বসলেন। রাজার মাথায় এক মস্ত বড় স্বর্ণের মুকুট। তিনি হাই তুলে বললেন, কী হে প্রজার দল? কীসের এত ক্যাঁচক্যাঁচানি? ঘুমে যে পুরো ব্যাঘাত ঘটালি।
শিয়াল একগাল হেসে সালাম ঠুকে বলল, মহারাজ! কাঠবিড়ালি আর বাদুড় নিজেদের বনের সেরা বীর আর বুদ্ধিমান দাবি করছে। আপনিই এর একটা ফয়সালা করে দিন।
সিংহ একটু ভাবলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা, তা হলে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাক। এই যে সামনে নদীর ওপারে কলাবাগান আছে, যে পাকা কলার ছড়া সবার আগে আস্ত অবস্থায় আমার দরবারে এনে দিতে পারবে, সে-ই হবে এই বনের আসল বীর আর বুদ্ধিমান। ঘোষণা হওয়ামাত্রই বাদুড় ডানা ঝাপটে চিৎকার করল, এ তো আমার বাঁ হাতের খেলা।
বলেই সে আকাশের দিকে ডানা মেলল। কিন্তু ও আল্লাহ! নদীর মাঝখানে যেতেই হঠাৎ একঝলক দমকা বাতাসে তার ডানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেল। সে সোজা গিয়ে ধপাস করে পড়ল নদীর পাড়ের কাদার মধ্যে। কাদামাখা মুখ নিয়ে সে ওখানেই কুঁইকুঁই করতে লাগল। এদিকে কাঠবিড়ালি ভাবল, নদী পার হওয়া তো কোনো ব্যাপার না, আমি সাঁতরে ঠিকই ওপারে যেতে পারব।
কিন্তু নদীতে নামতেই স্রোতের টানে তার নাক-মুখ দিয়ে জল ঢুকতে লাগল। সে কোনোমতে একটা ভাসমান কাঠের টুকরো কামড়ে ধরে খাবি খেতে লাগল।
বটতলায় দাঁড়িয়ে শিয়াল হাসতে হাসতে বলল, দেখলেন মহারাজ? এদের বীরত্বের বেলুন এক মিনিটে ঠুস! সিংহ গম্ভীর হয়ে বললেন, শিয়াল, পণ্ডিতি বন্ধ করে ওদের বাঁচানোর উপায় খোঁজ।
ঠিক তখনই ওদিক থেকে ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে এলো বুনো হাতি। নদী দেখে সে মোটেও ঘাবড়াল না। হাতি তার মস্ত বড় শরীরটা নিয়ে ঝুপ করে নদীতে নেমে পড়ল। গভীর জলে হাতির পুরো শরীর ডুবে গেল, শুধু তার শুঁড়টা জলের ওপর অক্সিজেনের নলের মতো জেগে রইল। হাতি চমৎকার সাঁতার কেটে নদীর ওপারে পৌঁছাল।
হাতি তার বিশাল শুঁড় দিয়ে প্রথমে খাবি-খাওয়া কাঠবিড়ালিকে পানি থেকে তুলে পিঠের ওপর বসাল। তারপর নদীর পাড়ে গিয়ে কাদামাখা বাদুড়কেও শুঁড়ে জড়িয়ে নিল। এরপর পাকা কলার একটা ছড়া শুঁড়ে তুলে নিয়ে আবার সাঁতরে নদীর এপারে সিংহ রাজের দরবারে ফিরে এলো।
সিংহরাজ কলার ছড়াটা দেখে মুচকি হেসে বললেন, তা হলে এখন তোমরাই বলো, কে এই প্রতিযোগিতার আসল বিজয়ী। কাঠবিড়ালি আর বাদুড় মাথা নিচু করে বলল, মহারাজ, একা একা আমরা কেউই পারতাম না। আজ হাতি ভাই না থাকলে আমাদের জানটাই যেত। আসল বীর হাতি ভাই।
হাতি তখন বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল, না মহারাজ, আমি একা কিছুই করতে পারতাম না। নদীর ওপারে যখন কুচকুচে অন্ধকার ছিল, তখন বাদুড় ভাই ওপর থেকে ডানার ঝাপটা দিয়ে নিখুঁতভাবে আমাকে কলাগাছের দিকনির্দেশনা দেখিয়েছে। আর কলার ছড়িটি যখন আমি শুঁড় দিয়ে ভাঙতে গেলাম, তখন একঝাঁক বিষাক্ত লাল পিঁপড়ে আমাকে কামড়াতে আসছিল। কাঠবিড়ালি ভাই তার চটপটে দাঁত দিয়ে সেই কলার ডালটা পরিষ্কার না করলে আমি ওটা আনতেই পারতাম না। এই জয়ে ওদের অবদানও সমান।
হাতির মুখে অন্য বন্ধুদের এই প্রশংসার কথা শুনে বনের রাজা সিংহ নিজের মাথার মুকুটটা হাতির সামনে নামিয়ে রেখে বললেন, আজকের এই আড্ডার এটাই আসল শিক্ষা। বড় হওয়া মানে কেবল নিজের ক্ষমতা দেখানো নয়, বরং অন্যের শক্তি, যোগ্যতা আর অবদানকে মন থেকে সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়াটাই হলো বড় মনের পরিচয়।
সব পশুপাখি রাজার কথা বুঝতে পারল এবং সেদিন থেকে বনের মধ্যে আর কেউ কারও অবদানকে খাটো করে দেখত না। সবাই সবাইকে সম্মান দিয়ে মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে বাস করতে লাগল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও/এমকে