কোথায় শিউলিতলা সেই কবেকার ভোরবেলা

গাউসুর রহমান

সাহিত্য

বর্ষার সেই ঘনঘোর মেঘের ঘনঘটা যখন শ্রান্ত হয়ে বিদায় নেয়, তখন বাংলার আকাশ-বাতাসে এক অলৌকিক রূপান্তরের পদধ্বনি শোনা যায়। প্রকৃতি

2026-09-25T12:22:23+00:00
2026-09-25T12:22:23+00:00
 
  শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
কোথায় শিউলিতলা সেই কবেকার ভোরবেলা
গাউসুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বর্ষার সেই ঘনঘোর মেঘের ঘনঘটা যখন শ্রান্ত হয়ে বিদায় নেয়, তখন বাংলার আকাশ-বাতাসে এক অলৌকিক রূপান্তরের পদধ্বনি শোনা যায়। প্রকৃতি যেন তার সব মলিনতা ধুয়ে-মুছে এক নতুন শুচিতায় স্নান করে ওঠে। ভাদ্রের শেষ আর আশ্বিনের শুরুতে যে ঋতুটি অতি সন্তর্পণে বাংলার পলিমাটিতে পা রাখে, তা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো ঋতু নয়; বরং তা বাঙালির এক গভীর আত্মিক আর্তি, এক শাশ্বত দীর্ঘশ্বাস এবং চিরকালীন আনন্দের নাম শরৎ। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, যখন জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় ঋতুচক্রের ভারসাম্য প্রায় বিপন্ন, তখন শরতের এই নীলিমা আর শিউলি ঝরা সকালের গুরুত্ব এক নতুন মাত্রায় ধরা দেয়। এটি আজ কেবল প্রকৃতির শোভা নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক নীরব ইশতেহার।

বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আগমন ঘটে অত্যন্ত ধীরলয়ে, যেন এক লাজুক কনের মতো। বর্ষার উন্মাদনা যখন স্তিমিত হয়, তখন মাঠের প্রান্তে প্রান্তে ধানের কচি চারাগুলো বাতাসে দোল খেতে শুরু করে। আকাশের সেই মেঘমেদুর অন্ধকার কেটে গিয়ে সেখানে ফুটে ওঠে স্বচ্ছ এক নীল আভা, যাকে কবিরা বারবার তুলনা করেছেন বিরহী হৃদয়ের স্বচ্ছতার সঙ্গে। এই আকাশ কেবল নীল নয়, বরং এতে লুকিয়ে থাকে এক ধরনের অসীমতা। শরতের এই আকাশ যেন কোনো এক সুদূর অতীতে নিয়ে যায়, যেখানে মেঘের দলগুলো শ্বেতশুভ্র তুলোর মতো ভেসে বেড়ায়। কে না জানে যে, এই মেঘের ভেলায় চড়েই মানুষের মন পাড়ি দেয় দিগন্তের ওপারে?

শরতের এই আবাহন কেবল চোখে দেখা যায় না, তা অনুভব করা যায় বাতাসের আর্দ্রতায়। বর্ষার সেই ভারী বাতাস যখন হালকা হয়ে আসে, তখন শিউলি ফুলের সেই মৃদু অথচ তীব্র সুবাস জানান দেয় যে, উৎসবের দিন ঘনিয়ে এলো। এই গন্ধটি বাঙালির স্মৃতিতে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া তৈরি করে। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসের ওপর যখন সাদা পাপড়ি আর কমলা বৃন্তের শিউলিগুলো লুটিয়ে থাকে, তখন মনে হয় পৃথিবী যেন তার আপন হৃদয়ের অর্ঘ্য সাজিয়ে রেখেছে। এই দৃশ্যপট কি কেবল সৌন্দর্য? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম ত্যাগের দর্শন? শিউলি ফুল তো ফোটে রাত্রে, আর ভোরের আলো ফোটার আগেই সে নিজেকে উৎসর্গ করে মাটির বুকে। এই যে ঝরে পড়ার মহিমা, এটিই তো শরতের আসল রূপ যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে বিসর্জনই বেশি সুন্দর।

বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে শরৎ এক অনন্য ঐশ্বর্য নিয়ে বিরাজমান। প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি, আর আধুনিক যুগের রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ সবখানেই শরৎ যেন এক প্রাণচঞ্চল সত্তা। আদি কবিদের কাছে শরৎ ছিল শস্যের প্রাচুর্য আর মর্ত্যরে দেবীর আরাধনার মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্বে শরৎ পেয়েছে এক দার্শনিক গভীরতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে শরৎ মানেই এক অতীন্দ্রিয় মুক্তির আস্বাদ। তার গানে ও কবিতায় শরৎ কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং তা অন্তরাত্মার এক পরম যাত্রার সংকেত। তিনি যখন বলেন, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি’, তখন তা কেবল বৃষ্টির বিদায় নয়, বরং মানুষের মনের সব সংশয় ও বিষাদ মুক্তির এক মহোৎসব। রবীন্দ্র-দর্শনে শরৎ হলো সেই সন্ধিক্ষণ, যেখানে সীমার মাঝে অসীমের মিলন ঘটে। তার ‘শারদোৎসব’ নাটকের কথা ভাবলে দেখা যায়, সেখানে প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গ মানুষের সঙ্গে কথা বলছে।

অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের শরতে রয়েছে এক উদ্দাম যৌবন এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের প্রাণের স্পন্দন। নজরুলের লেখনীতে শরৎ যেন এক চঞ্চল কিশোরী, যার চুলে শিউলি ফুলের মালা আর পরনে শুভ্র মেঘের শাড়ি। তার কবিতায় শরতের মেঘগুলো আলসেমিতে ভরা নয়, বরং সেগুলো এক অপার্থিব আনন্দের দূত। নজরুলের কাছে প্রকৃতি ও মানুষ আলাদা নয়; তাই পল্লী-বালার শিউলি কুড়োনোর দৃশ্যের মাঝে তিনি খুঁজে পান বাংলার চিরন্তন লাবণ্য। তার এই দৃষ্টি অনেক বেশি পার্থিব, অনেক বেশি রক্ত-মাংসের অনুভূতির সঙ্গে মিশে থাকা।

কিন্তু শরতের এক অন্যরকম, কিছুটা ধূসর এবং বিষণ্ন রূপ আমরা দেখতে পাই জীবনানন্দ দাশের কাব্যে। জীবনানন্দের কাছে শরৎ মানেই রোদের সেই ‘নরম ধানের গন্ধ’, যেখানে বিকালের রোদ যেন ক্লান্ত চিল হয়ে ডানা মেলে দেয়। তার কবিতায় শরতের শিশির কেবল স্বচ্ছ জলবিন্দু নয়, বরং তা সময়ের একেকটি কণা। জীবনানন্দ যখন ধানসিঁড়ি নদীর তীরে ফিরে আসার কথা বলেন, তখন সেই প্রত্যাবর্তনের ব্যাকুলতা শরতের মøান বিকালের রোদে এক অদ্ভুত পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে। তার কাছে এই ঋতুটি একাকিত্বের, অথচ সেই একাকিত্বের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর অস্তিত্ববাদী সত্য।

শরতের প্রধান দুটি রং নীল আর সাদা। শিল্পতত্ত্বের বিচারে নীল হলো অসীমতার প্রতীক, যা মানুষকে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। আর সাদা হলো  শুদ্ধতা ও ত্যাগের প্রতীক। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে বাংলার প্রকৃতিতে যে এক অদ্ভুত ধ্রুপদি ভাব তৈরি হয়, তা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া ভার। নদীর ধারে দিগন্ত বিস্তৃত কাশবন যখন হাওয়ায় দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন কোনো এক আদিম সমুদ্রের ফেনা স্থির হয়ে আছে তীরের গায়ে। এই সাদা রংটির মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো ঔদ্ধত্য নেই। এটি কেবলই এক শান্ত সমর্পণ।

কাশফুলের এই দোলা বাঙালির মনস্তত্ত্বে এক গভীর প্রভাব ফেলে। কাশফুল কোনো দামি বাগানের ফুল নয়, এটি পথের ধারের, নদীর তীরের অবহেলিত এক দান। কিন্তু এই অবহেলার মাঝেই তার সার্থকতা। সে ঝড়ের সামনে মাথা নোয়ায় না, আবার কাঠফাটা রোদেও মøান হয় না। এই যে নমনীয়তা আর সহনশীলতা, এটাই তো বাংলার মাটির আসল শিক্ষা।

আজকের এই ২০২৬ সালের দ্রুতগামী পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে শরতের রূপটি আর আগের মতো অটুট নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের করালগ্রাসে ঋতুচক্র আজ এলোমেলো। যেখানে ভাদ্রের গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার কথা, সেখানে হয়তো অকাল বৃষ্টিতে মাঠের ফসল ডুবে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নদীর ধারের সেই মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কাশবন আজ বিলুপ্তির পথে।

শিউলিতলার সেই স্নিগ্ধ ঘাস আজ ইটের স্তূপে ঢাকা। আধুনিক মানুষ আজ শরতের নীল আকাশ দেখে না, দেখে মোবাইলের স্ক্রিনে ফিল্টার করা শরতের ছবি। এই যে কৃত্রিমতা, এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। আজকের যান্ত্রিক সভ্যতা আমাদের দিয়েছে অনেক, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে সেই আদিম ও অকৃত্রিম সংযোগ। 

এখন ফেসবুকের দেয়ালে শরতের শুভেচ্ছা জানানো হয় ঠিকই, কিন্তু কজন মানুষ সেই ঘাসফুলের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে শিশিরের ছোঁয়া অনুভব করে? এই যে ‘সিমুলাক্রা’ বা কৃত্রিম প্রতিচ্ছবির জগৎ, এটি মানুষের আত্মাকে ক্রমশ রিক্ত করে দিচ্ছে। তবু ধোঁয়াটে শহরের ভিড়ে হঠাৎ যখন মেঘের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে নীল আকাশ উঁকি দেয়, তখন মানুষের হৃদয় কেন জানি আজও অজানা এক আনন্দে নেচে ওঠে। এটিই প্রমাণ করে যে, মানুষ যতই যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হোক না কেন, তার শেকড় আজও মিশে আছে এই মাটির গভীরে।


দার্শনিক হিগেলের মতে, মানুষের আত্মা যখন প্রকৃতির সুন্দরের মধ্য দিয়ে নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করে, তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়। শরতের স্বচ্ছ আকাশ আমাদের সেই স্বাধীনতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের মন যখন প্রতিদিনের ক্ষুদ্র স্বার্থ, ঈর্ষা আর গ্লানিতে কলুষিত হয়, তখন এই বিশাল আকাশ আমাদের শেখায় উদার হতে। শরতের মেঘগুলো যেমন কোনো পিছুটান ছাড়া ভেসে বেড়ায়, আমাদের জীবনকেও তেমনি হালকা করার প্রেরণা দেয় এই ঋতু।

শরতের এই যে ক্ষণস্থায়িত্ব কয়েক দিনের আনন্দ আর তারপর আবার রিক্ততা এটি আমাদের এক গভীর জীবনদর্শন শেখায়। বৌদ্ধ দর্শনে যেমন বলা হয়েছে, ‘সবই অনিত্য’, শরতের আগমন ও প্রস্থান যেন সে সত্যেরই প্রতিফলন। কিন্তু এই অনিত্যতার মাঝেও যেটুকু সময় আমরা পাই, সেটুকুকে পূর্ণভাবে যাপন করাই হলো সার্থকতা। শিউলি ফুল যেমন তার অল্প সময়ের জীবনে সুবাস ছড়িয়ে দেয়, আমাদের জীবনও যেন তেমনি অন্যের উপকারে ও সুন্দরের সাধনায় নিবেদিত হয় এটাই শরতের নীরব প্রার্থনা।

বাংলার চিত্রকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নন্দলাল বসুর তুলিতে শরতের যে মায়াবী রূপ ফুটে উঠেছে, তা আমাদের ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। অবনীন্দ্রনাথের সেই ধোঁয়াটে রঙের শরতের আকাশ কিংবা নন্দলালের রেখায় শরতের জনজীবন এসবই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি কোনো জড় বস্তু নয়, তা এক জীবন্ত সত্তা। এই উত্তরাধিকার আমাদের রক্ষা করতে হবে। শরতের এই শুভ্রতা আমাদের ভেতরের কলুষতাকে ধুয়ে দিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

বাংলার শরৎ কেবল একটি কালখণ্ড নয়, এটি একটি যাপন পদ্ধতি, একটি ধ্যান এবং একটি চিরন্তন কবিতা। আদিম চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের এই উত্তর-আধুনিক যুগ পর্যন্ত শরতের যে জয়যাত্রা, তা বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী। আমাদের আজকের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই ঋতুকে বাঁচিয়ে রাখা। শরৎ আমাদের শেখায় যে, প্রলয়ের পরেই আসে প্রশান্তি, বৃষ্টির পরেই আসে আলো। জীবনের এই চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা যেন বারবার সেই শরতের শুভ্রতায় ফিরে আসতে পারি। কবির ভাষায় তাই ধ্বনিত হয় সেই চিরন্তন আকুতি ‘আজি কি তোমার প্রসন্ন মুখচ্ছবি/ হেরি এ শরতের প্রভাতে।’ এই প্রসন্নতাই হোক বিশ্বমানবতার পরম প্রাপ্তি। শরতের এই নীলিমায় আমাদের আত্মা খুঁজে পাক তার চিরস্থায়ী ঠিকানা, আর শিউলির ঘ্রাণে মিশে থাকুক আমাদের অন্তহীন ভালোবাসার আখ্যান। বাংলার এই ধূলিকণায়, এই পলিমাটিতে শরৎ বেঁচে থাকুক এক অবিনশ্বর সত্য হিসেবে, যা অনাদিকাল ধরে আমাদের মুক্তি ও আনন্দের পথ দেখাবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   শিউলিতলা  সাহিত্য  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: