লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নতুন বই ‘আলোর ইশকুল’। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট, ঘটনা পরম্পরা ও ইতিহাস নিয়ে এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র বই প্রকাশিত হলো। উৎসর্গপত্রে লেখক বলছেন :
কেন্দ্রের ভবনের লাল ইটের দেয়ালগুলোকে আমরা কোনও দিন প্লাস্টার করব না। এই কেন্দ্র যে একদিন আমাদের রক্ত দিয়ে তৈরি হয়েছিল- ওই ইটগুলো তার সাক্ষী হয়ে থাক।
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে নয়, বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে রক্তিম হৃদয়ের স্মৃতিবাহী লাল ইটের দেয়ালগুলোকে। প্রচ্ছদেও আছে সেই লাল ইটের ইমেজ। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত একদল মানুষের বেদনার্ত হৃদয়ের রক্ত মিশে আছে এই ভবনের প্রতিটি ইটে। এ যে নিছক আবেগের কথা নয়, বইটি পড়ে শেষ করার পর পাঠক তা সম্যক অনুধাবন করবেন। অনুভব করবেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইতিহাস কোনো বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের গল্প নয়, বরং মননশীল জাতি বিনির্মাণের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। একক ব্যক্তির স্বপ্নবিলাস নয়, এ হলো ‘জীবনের বহুবিচিত্র কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উচ্চতর শক্তি ও মনুষ্যত্বে বিকশিত হবার একটি সপ্রাণ পৃথিবী।’
২
বাংলা সাহিত্যের একজন অধ্যাপক কোন প্রেরণায় বই পড়ার বিষয়টি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিলেন। তাঁর সঙ্গে সেই আলোর মিছিলে আরও কারা সামিল ছিলেন। কোনো দলীয় মতবাদের দাসত্ব না করে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মূলত দেশীয় অর্থায়নে কীভাবে গড়ে উঠল এমন একটি অভূতপূর্ব প্রতিষ্ঠান— এসব ইতিহাস মানুষ জানতে চায়। কিন্তু ‘হায় বাঙালির ঐতিহাসিক স্মৃতি কই’!
সুখের কথা, দেরিতে হলেও সুবিস্তৃত একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লিখিত ইতিহাস পাওয়া গেল স্বয়ং এর স্বপ্নদ্রষ্টা ‘রেনেসাঁস পুরুষ’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছ থেকেই। ‘আলোর ইশকুল’ বইয়ের কালপরিধি ১৯৬৮ থেকে ২০২৫। বইটি লেখা হয়েছে পাঠকের সঙ্গে কথোপকথনের ভঙ্গিতে। দুটি পর্বে বিভক্ত এ বইয়ের প্রথম অংশ বিন্যস্ত হয়েছে বিচিত্র ছোটো ছোটো উপশিরোনামে। এর মধ্যে আছে অস্ফুট যাত্রা, ভিক্ষুকের পায়ে লক্ষ্মী, ফিরে ফিরে অর্থ কষ্ট, উজ্জ্বল নীল মুক্তি, ভক্তের ধাওয়া, জেনারেল এরশাদ ও কেন্দ্রের ভবন ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে আছে ছয়টি পরিচ্ছেদ : ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, প্রকাশনা, ভ্রাম্যমাণ বইমেলা, পাঠ্যসূচি, ঋণশোধের গল্প এবং সমাপ্তি।
৩
১৯৬৮ সালের নভেম্বরে নিতান্ত খেয়ালের বশে গ্রিন রোডে নিজের বাসায় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বসান এক আড্ডা। আলোচ্য বিষয় : ‘নৈরাজ্যবাদ।’ সদস্য সংখ্যা ১০। চলল তপ্ত মুখর আলোচনা। কিন্তু বেশি দিন চলেনি সে আসর। ওটাই ছিল যাত্রার সূচনাবিন্দু। কেন্দ্রের বাস্তবিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর। সেদিনও সদস্য সংখ্যা ১০। প্রথম দিনের বই ছিল ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’। আসরটি বসেছিল এখনকার ‘নায়েম’-এর ছোট্ট মিলনায়তনে। আশরাফুজ্জামান খানের দেওয়া পঁয়ত্রিশ টাকা সম্বল করে শুরু হয় পথচলা। নায়েম ভবন থেকে যেতে হলো ইন্দিরা রোডের ভাড়া বাড়িতে। ইন্দিরা রোড থেকে বাংলামোটর।
এরপর ক্রমান্বয়ে সাদৃশ্য ৯তলা ভবন। পাঠচক্র। মানবসভ্যতার অন্তত আড়াইশো শ্রেষ্ঠ বই গভীরভাবে পড়ার সুবর্ণ সুযোগ। ২ লক্ষ বই সম্বলিত আধুনিক লাইব্রেরি। মানবজ্ঞানের চল্লিশটি শাখার ওপর দেশের মেধাবী বক্তাদের আড়াইশো মূল্যবান বক্তৃতা শোনা। ফিল্ম, প্রামাণ্যচিত্র, মঞ্চনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণ, পূর্ণিমা সন্ধ্যা। আরও কত আয়োজন।
সহজ ও মনোরম শোনালেও বাস্তবে কী নির্মম আর কঠিন ছিল সেই অভিযাত্রা, এ বইয়ের পাতায় পাতায় আছে তারই বিবরণ। অর্থকষ্ট, অভাবিত আনুকূল্য, উষ্ণ বন্ধুত্ব, আমলাতন্ত্রের জটিল মারপ্যাঁচ, ঋণের দায়। সব ছাড়িয়ে আলোকায়নের দুর্দম স্বপ্ন। সম্পন্ন মানুষ দিয়ে সমৃদ্ধ জাতি গড়ার স্বপ্ন। এডমন্ড বার্কের মতো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও মনে করেন, ‘ছোট মন আর বড় জাতি একসঙ্গে হয় না’।
৪
বইয়ের শেষ দিকে এক জায়গায় লেখকের আত্মজিজ্ঞাসা : ‘এই-যে এত ছেলেমেয়ে বইয়ের সংস্পর্শে এল, এদের মধ্যে শতকরা ৯৬ ভাগ যদি ব্যর্থও হয়, সফল হয় মাত্র চারভাগ, তাহলেও তো তাদের সংখ্যা ৮ লক্ষ হবার কথা। এত মানুষের এত শুভবুদ্ধি ও আলোককণিকা জাতির জীবনে কি কিছুই যোগ করবে না!’
শিক্ষকতায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রবেশ করেন ১৯৬২ সালে। ১৯৬৫ সালে শুরু করেন টেলিভিশন উপস্থাপনা। সে বছরই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে শুরু করে ষাটের দশকের নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলনের মুখপত্র ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা। একজন মানুষ একসঙ্গে এত কাজ করেন কীভাবে! কেন্দ্রের কাজে পূর্ণ মনোনিবেশের স্বার্থে ১৯৯২ সালে শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর নেন। কিন্তু অবসর নিলেও বিশ্রাম কোথায়। তিনি মনে করেন, বিশ্রাম মানে কাজ না করা নয়, বিশ্রাম মানে কাজ বদল করা। আজীবন তিনি এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
৫
বিরুদ্ধতার ইতিহাসও কম নয়। শেষ পর্যন্ত তবু আলোর তৃষ্ণাই জয়যুক্ত হয়েছে। কীভাবে সম্ভব হলো? ‘ঋণশোধের গল্প’ পরিচ্ছেদে লেখক অকুণ্ঠ ভাষায় কৃতিত্ব দিয়েছেন নিজের টেলিভিশন-পরিচিতিকে :
‘যে যা সহযোগিতাই করুক, আমার টেলিভিশন-পরিচিতি ছিল সবার ওপরে। এর ফলে ঝাড়ুদার থেকে প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর দরোজা থেকে আমার সামনে সমানভাবে খুলে গিয়েছিল; দেশের ওপরমহল থেকে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, এমনকি সাধারণ মানুষদেরও আমার ভাই, বন্ধু, আত্মীয় বা সুহৃদে পরিণত করেছিল।’
বইটি পড়তে কেমন? প্রথমত হয়েছে এটি সুলিখিত আত্মজীবনী। কখনো এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভ্রমণকাহিনির আদল। অনেকাংশেই এটি কালের দলিল। একই সঙ্গে তিনি হাজার মানুষের কথা বলেছেন। ‘দুঃখ-দহনের গল্প’ই বলেননি, প্রাপ্তি-তৃপ্তির কথাও বলেছেন। ১৯৮৭ সালে কেন্দ্র থেকে প্রথম প্রকাশিত বই ‘পালামৌ’। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২। এ যাবৎ প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই ১৬টি বিষয়ে দুশো নয় খণ্ডের ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’। পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। বিশাল ব্যাপার! মাত্র ১০ জন সদস্য নিয়ে ১৯৭৮ সালে যে পাঠচক্র শুরু হয়েছিল, সারাদেশে এর সদস্য সংখ্যা এখন ২৫ লক্ষ। সব মিলিয়ে বিপুল কর্মযজ্ঞ। দিন দিন সে যজ্ঞ বিপুলতর হচ্ছে।
‘আলোর ইশকুল’ সুখপাঠ্য বই। স্বাদু গদ্যে পরিমিত হিউমার মিশিয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা হলেও কেন্দ্র গড়তে গিয়ে স্বপ্নদ্রষ্টার নিজস্ব রক্তক্ষরণ তাতে চাপা পড়েনি। তাই যে-অর্থে জ্যাক লন্ডনের তুষারকবলিত গল্পগুলো এক টানে পড়া কষ্টকর, সেই অর্থে ‘আলোর ইশকুল’ বইটিও একটানে পড়া কঠিন। পড়তে হয় রয়ে সয়ে, বিরাম নিয়ে।
৬
বইটি যদিও একাডেমিক কাঠামোয় লেখা হয়নি, তবু মনে হয় কেন্দ্র গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি পরিশিষ্টে কালানুক্রমিকভাবে থাকলে ভালো হতো। তাতে এক নজরে মূল ঘটনা প্রবাহ বুঝে নেয়া সহজ হতো। সংশ্লিষ্টরা স্বভাবতই বুঝবেন ‘দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম’ কী, ‘সেকায়েপ’ কী, ‘আলোর ইশকুল’ বিষয়টাই বা কী, কোনটা কোন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প। কিন্তু যারা সংশ্লিষ্ট নয় তাদের কাছে এসব ব্যাপার কিছুটা দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে। পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশের আগে এ বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। আলোর ইশকুল তথা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ার কাজে অসংখ্য হৃদয়বান ও সংস্কৃতিবান মানুষের সহযোগিতা লেখক পেয়েছেন। সাহায্য এসেছে শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র থেকে। আনন্দের সঙ্গে তিনি সবার ঋণ স্বীকার করেছেন। ঋণ স্বীকার করেছেন নিজের পারিবারিক সদ্যদের কাছেও। গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক কারো নাম কোনোভাবে বাদ পড়ল কিনা, ভাবা যেতে পারে।
সব্যসাচী হাজরার আঁকা প্রচ্ছদ যথারীতি সুন্দর। তবে লাল ইটের এই ভবনটি যে সজীব মানুষের মতো হাতছানি দিয়ে ডাকে, কাছে গেলে কথা বলতে চায়; প্রচ্ছদে সেই কুহকী আবেদনটি আরও একটু নান্দনিকভাবে ফুটে উঠতে পারত বলে মনে হয়।
বহু প্রত্যাশিত বই ‘আলোর ইশকুল’ পাঠকের সমাদর পাবে— এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি নির্দ্বিধায়। অনেক ভিত্তিহীন অভিযোগ ও সংশয়ের জবাবও মিলবে এই বইয়ে। যারা বড় মাপের সংগঠন গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এটা পাথেয় হতে পারে।
আলোর ইশকুল (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার দুঃখ-দহনের গল্প)
লেখক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
প্রকাশক : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৬২
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৬, দ্বিতীয় মুদ্রণ : জুলাই ২০২৬
মূল্য : ৫০০ টাকা
সময়ের আলো/জেডি