সব শক্তি দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে রহিম আলী খান। কুপির আলোয় আবার বহু বছরের পুরোনো ম্যাপটা দেখে, সেই অনুযায়ী এখানেই হওয়ার কথা। ম্যাপটা রহিম আলীর দাদার কাছ থেকে পাওয়া। এবারও বিফল হলো সে। রাত শেষ। একটা শব্দ, তড়াক করে উঠে গর্তের ভেতর লাফিয়ে পড়ে রহিম, তার চোখ অন্ধকারেও চিকচিক করে, ম্যাচ জ্বালায় সে, পিতলের বহু পুরোনো একটা কলসির মুখ খুলে আনন্দে চিৎকার দেয় সে, ‘পায়ে গিছি’। একটা মেডেল।
সম্রাট আকবরের রাজদরবার ফতেপুর সিক্রি, আজ চিত্ত্বর দুর্গ জয়ের আনন্দে আপ্লুত জনগণ, চারদিকে মানুষ আর মানুষ। সম্রাট রাজদরবারে, সভাসদ জি হুজুর জি হুজুর করায় ব্যস্ত, ঠিক আজকের মতোই। সম্রাট সেনাপতি আমিরকে ডাকলেন, সিপাহি উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, ‘সেনাপতি আমির খান হাজির...’। এবারের যুদ্ধে সেনাপতি আমির খান অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। যদিও চিত্ত্বর দুর্গের যুদ্ধ ছিল খুব কম শ্রমের বিজয়।
সম্রাট কাছে ডাকলেন সেনাপতি আমিরকে, তারপর সগৌরবে মূল্যবান হীরক খচিত ভারী সোনার মহামূল্যবান একটি মেডেল পরিয়ে দিলেন গলায়। হতবিহ্বল আমির খান। মহামূল্যবান মেডেলে গোটা গোটা হরফে লেখা তার নাম।
রহিম আলী খান তাকিয়ে থাকে তার পূর্বপুরুষ আমির খানের শৌর্য বীর্যের প্রতীকের দিকে। রহিমের দরিদ্র সংসারে তিন ছেলে বেকার, এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, তার সংসারও অচল। গ্রামের সবচেয়ে মেরুদণ্ডহীন মানুষ এই রহিম, সেদিন চেয়ারম্যান ইয়াহিয়া তাকে ডেকে বকা দিয়েছেন জমিটা দিয়ে দেওয়ার জন্য। রহিম রাজি না হওয়াতে তাকে একটা কষে থাপ্পড় মারে আর তাতেই রহিম হুজুর হুজুর করে রাজি হয়ে যায়।
রহিমের তিন ছেলে-বউ-বাচ্চা নিয়ে বেশ আছে বাপের ঘাড়ে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি আছে যথেষ্ট কিন্তু কেউ চাষ করে না, উচ্চবংশের গৌরবে পা পড়ে না মাটিতে। পূর্বপুরুষের উচ্চমার্গীয় পরিচয়ে নিম্নমানের কাজ করতে বড় বাধে তাদের। পুরোনো দালান লোনা ধরা মরচে পড়া, ভাঙা দেয়াল, খাদ্যবিহীন ঘর। ছেলেরা ঘোরে আর পরিচয় দেয় আমির খানের। রহিম মহামূল্যবান মেডেলটা লুকিয়ে রাখে। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়।
অনেক বছর পর রহিম শহরে, পরিবর্তিত সবকিছু, এত পরিবর্তন হয় কেন, মনে মনে প্রশ্ন করে। ভাতিজা সোহাগের সঙ্গে সে হাঁটতে থাকে। সোহাগ বিজ্ঞের মতো বলল, ‘কাকা আমার মনে হয় মেডেলটার দাম লাখ টাকা হবে খুব ভালো দুইটা পার্টির সঙ্গে কথা বলেছি, ওরা এসব দামি জিনিস কেনে।’ রহিমের হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা। বিড়বিড় করে সে ‘এ্যাতো টাকা। এইটার দাম এত কেন হবে!’ তার মাথায় ঘোরে তিনটা ছেলে বেকার, ওদের ভালো ব্যবসার ব্যবস্থা করতে পারলে রহিম মরেও শান্তি পায়। মেয়ের সংসার চলে না, দুচোখে আঁধার দেখে সে।
সোহাগ আর রহিম অফিসে ঢোকে। রহিমের মাথায় ধরে না এত সুন্দর অফিস এরা নাকি দামি জিনিস কেনাবেচা করে। উর্দুতে কথা বলা বিদেশি এক লোক মেডেলটা পরীক্ষা করে দেখে নকল বিবেচনায় সোনার দাম হিসেবে দশ হাজার টাকা দাম প্রস্তাব করলেন।
রহিম রাজি হতে গিয়েও হলেন না। সোহাগের সঙ্গে চললেন নলিনী বাবুর অফিসে। নলিনী বাবু জহুরি, তিনি চশমার কাচ মুছে রহিমের দিকে তাকালেন। নড়েচড়ে বসলেন, হিন্দি একসেন্টে বললেন, ‘আপনি বলতে চাইছেন আপনিই এটার মালিক?’
রহিম রেগে-মেগে উত্তর দিল, ‘এই যে প্রমাণ। আমার দাদা ছিলেন তাহেরউদ্দিন খান তার দাদা।’
এবার নলিনী বাবু আশ্বস্ত হলেন, আইনগত ঝামেলা এড়ানো যাবে, ‘ওকে, আপনাকে এক লাখ টাকা দেব।’ রহিম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল নলিনী বাবুর দিকে, এও কি সম্ভব! রহিমের চোখে অভাব, না খাওয়া ক্লিষ্ট মুখ। কাজ না করা ছেলের দল। রহিম রাজি হলো না, ‘সোহাগ চল’।
রহিম সোহাগের সঙ্গে বাসার কাছাকাছি আসতেই বুঝতে পারল দুই দল তাকে অনুসরণ করছে। নির্জন রাস্তায় দুই পক্ষ ঘিরে ধরল রহিম আর সোহাগকে। দুই দলই শক্তিশালী অস্ত্রসহ মারমুখী অবস্থানে। ঘনিয়ে আসছে আঁধার, দুদিকে দুই দল এক দল উর্দুতে বলল, ‘মেডেলটা আমাদের দে।’ খেঁকিয়ে উঠল হিন্দি ভাষায়, ‘না আমাদেরকে দে না হলে জান নিয়ে ফিরতে পারবি না।’ পূর্বপুরুষের শৌর্যবীর্যের প্রতীক এই মেডেল, সেই রক্ত আজ বইছে রহিমের শরীরে, পুরোনো শক্তি, পুরোনো সাহস রক্তের উন্মাদনা ফিরে পায় সে। নিতান্ত ভোলাভালা, শান্তিপ্রিয়, শক্তিহীন রহিম হয়ে ওঠে পনেরো শতকের আমির খান। হুংকার দিয়ে ওঠে সে, আমির পারলে আমি পারব না কেন!
মুহূর্তে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। অসীম শক্তির রহিমের কাছে ধরাশায়ী হয় দস্যু দল। সগৌরবে উঠে দাঁড়ায় সে। যত্নে রাখা মেডেল তুলে ধরে বিজয়ের পতাকা, ‘আমার পরিচয় আমি বিক্রি করব না, আমি দিয়ে দেব না শক্তির কাছে।’
বাড়ি ফেরে সে। তিন সন্তান সামনে, হুংকার দেয় আপাদমস্তক আপসকামী রহিম, কেঁপে ওঠে সন্তানরা। তারা তাদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, এই কি তাদের সেই বাবা। ‘পরিশ্রম করো, অন্যায় কোনো কিছু বরদাশত করা হবে না।’
এলাকার বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি করে দুই পয়সা উপার্জন করা বড় ছেলে রতন কান চুলকাতে চুলকাতে চলল জমির দিকে। মেজো ছেলে যে বাসায় শুয়ে-বসে থাকতে খুব পছন্দ করত, সে বের হলো, চলল বহু দিন বন্ধ থাকা দোকানের দিকে। ছোট ছেলে স্বপন যার মধ্যে অনেক কিছু করার মতো প্রতিভা থাকলেও সে বেশিরভাগ সময় কাটাত আড্ডা আর নেশায়। সেই ঘাড় ত্যাড়া স্বপন অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিল তাকে বাবা কিছু বলেন কি না। শেষে বাবাকে আবার গর্জন করার প্রস্তুতি নিতেই সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে নতুন একটা কাজ করার কথা ভাবছিল অনেক দিন ধরে, সেই ভাবনায় আজ একটা ধাক্কা পড়ল, কখনো কখনো এমন তাড়ারও প্রয়োজন হয়।
চেয়ারম্যান রহিমের সামনে এসে দাঁড়ায়, রহিম, কেমুন আছ? জমির ব্যাপারডা ফাইনাল করতি আইছিলাম।
সম্রাট আকবরের রাজপ্রাসাদ। সগৌরবে দাঁড়ানো আমির খান, বুকে ঝুলছে ঝকঝকে মেডেল। রহিম ফিরে যায় পূর্বপুরুষের ছায়ায়, যুদ্ধ চলছে, তুমুল যুদ্ধ। ঘোড়ার পিঠে চড়ে রহিম শত্রু বধ করছে একের পর এক, চক চক করে রহিমের চোখ, উদ্বেলিত রক্তে সে হয়ে ওঠে অন্য একজন। কোমর থেকে সব শক্তি দিয়ে এক টানে বের করে তলোয়ার। তারপর গর্জন করে ওঠে, ‘চেয়ারম্যান, জমি আমার পরিচয়, আমার ঠিকানা, আমার সাহস, আমার স্বাধীনতা, জমি আমি দেব না।’
বিজয়ের গল্প স্বপ্ন আনে, অতঃপর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অধ্যবসায়, পরিশ্রম আর যুদ্ধ। বহু বছর পরের কথা, কেউ কেউ বলে পঞ্চাশ বছর আমার মনে হয় আরও বেশি, সঠিক সময়টা আপেক্ষিক। তুমুল বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে পৃথিবী সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। আঁধারের ক্লান্তিকর চাদর ছিন্ন করে টগবগে ঘোড়া ছুটিয়ে বহুদূর থেকে ছুটে আসছে একজন, শরীরে বর্ম মাথায় শিরস্ত্রাণ কোমরে সুতীক্ষ্ণ তলোয়ার, হৃদয় ভর্তি পূর্বপুরুষদের রক্ত, সাহস, আগুন, জয় করার অদম্য স্পৃহা। ছুটে আসছে, ছুটে আসছে, কালো আঁধারের অসহ্য অন্ধকার পেছনে ফেলে ছুটে আসছে কেউ একজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি