ফুলের নিমন্ত্রণ

সামছুল আলম শিমুল

সাহিত্য

ছোট্ট একটা নদীর পাশে বিশাল একটা বন। বনে নানা রকমের গাছ। গাছে গাছে নানা রঙের ফুল। কোনো ফুলের পাপড়ি গোল

2026-10-03T09:25:42+00:00
2026-10-03T09:25:42+00:00
 
  শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
ফুলের নিমন্ত্রণ
সামছুল আলম শিমুল
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ছোট্ট একটা নদীর পাশে বিশাল একটা বন। বনে নানা রকমের গাছ। গাছে গাছে নানা রঙের ফুল। কোনো ফুলের পাপড়ি গোল গোল, কোনোটার তিন কোনা, আবার কোনো ফুলের পাপড়ি আঙুলের মতো লিকলিকে। রঙে, গন্ধে কত বৈচিত্র্য।

অগুনতি ফুলের এই বনে সবচেয়ে আনন্দে থাকার কথা ছিল প্রজাপতিদের। কিন্তু এই বনের প্রজাপতিরা ভীষণ দুঃখী। তারা ঠিকমতো খেতে পায় না। তার ওপর সবাই তাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে।

এই তো সেদিন কয়েকটা প্রজাপতিকে দেখে বানর খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে বলল— নামেই শুধু প্রজাপতি, পাখায় নাই রঙের জ্যোতি!

আসলেই এই বনের প্রজাপতিগুলো এত রোগা, পাতলা আর গায়ের রং এতটাই ফিকে যে তাদের দেখলে প্রজাপতি বলে মনেই হয় না। মনে হয়, রংচটা কাপড়ের টুকরো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রজাপতিদের এই দুরবস্থার আসল কারণ মৌমাছি। ফুলের ওপর প্রজাপতি বসলেই মৌমাছিরা রেগে গিয়ে টুক করে হুল ফুটিয়ে দেয়। 

মৌমাছিদের এককথা— আগে তারা ফুলের মধু খাবে, তারপর ভবিষ্যতের জন্য জমা করবে। এরপর যেটুকু থাকবে, সেটা প্রজাপতিরা খাবে। ওই অল্প মধু খেয়ে প্রজাপতিদের পেট আর ভরে না। প্রজাপতিরা অভিযোগ নিয়ে বনের রাজা সিংহের কাছে গেল। সব শুনে সিংহ বলল— আমি বিষয়টা দেখব।


কিন্তু ‘দেখব’ আর দেখা হয়ে উঠল না। বনে কানাঘুষা আছে, সিংহও নাকি মৌমাছিদের ভয় পায়। একবার নাকি এক দল মৌমাছির আক্রমণে তাকে সাত দিন জ্বরে ভুগতে হয়েছিল।

প্রজাপতিরা ফুলের কাছেও গেল। মৌমাছিদের একটু বোঝাও না। তোমরা বললে ওরা হয়তো মানবে।

ফুল মুচকি হেসে বলল, তোমাদের পক্ষ নিয়ে কথা বললে ওরা যদি আমাদের ওপর রাগ করে? প্রজাপতিদের কোনো চেষ্টাই সফল হলো না। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এই বন থেকেই প্রজাপতিগুলো বিলীন হয়ে যাবে। তাই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এক জরুরি সভার আয়োজন করা হলো।

এক চঞ্চল প্রজাপতি বলল, মৌমাছিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। হয় এই বনে ওরা থাকবে, নয়তো আমরা।

এক অভিজ্ঞ প্রজাপতি বলল, যুদ্ধ হয় সমানে সমানে। আমরা শক্তি-সামর্থ্যে ওদের সমান নই।

সবাই তার কথায় সায় দিল। ভীরু এক প্রজাপতি বলল, আমরা এই বন ছেড়ে অন্য বনে চলে যাচ্ছি না কেন?

সবচেয়ে বয়স্ক প্রজাপতিটা আবেগমাখা গলায় বলল, সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, না! না! একটার পর একটা প্রস্তাব আসে, আবার বাতিল হয়ে যায়।

অবশেষে একটা ছোট্ট প্রজাপতি বলে উঠল— আমরা যদি আমাদের খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলি? মধুর ওপর নির্ভর না করে ছোট ছোট পোকা আর গাছের মিষ্টি পাতা খাওয়া শুরু করি। প্রথম কয়েক দিন খারাপ লাগবে, কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে।

অভিজ্ঞ প্রজাপতিটা বলল— বুদ্ধিটা খারাপ নয়। টিকে থাকার জন্য পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও তো বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি।

সব প্রজাপতি ডানা নেড়ে সায় দিল। সেদিন থেকেই শুরু হলো তাদের নতুন জীবন। প্রজাপতিরা ছোট ছোট পোকা আর কিছু মিষ্টি পাতা খেতে লাগল। প্রথমে তাদের একদমই ভালো লাগত না। কারও বমি হতো, কারও পেটে সমস্যা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেল।


কয়েক মাস পর দেখা গেল, প্রজাপতিগুলো আগের চেয়ে বেশ সতেজ ও মোটাতাজা হয়ে উঠেছে।

পাতা আর পোকা খাওয়ার জন্য বনের পশু এবং মৌমাছিরা তাদের নিয়ে নানাভাবে ঠাট্টা করত। কেউ বলত— এরা আবার কেমন প্রজাপতি! ফুল ছেড়ে পোকা আর পাতা খায়! কিন্তু প্রজাপতিরা এসব গায়ে মাখত না।

তারপর একদিন বনে এলো এক ভয়ংকর ঝড়। ঝড়ের দাপটে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ল। ফুলের গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একের পর এক মৌচাকও ভেঙে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল।

ঝড় থামার পর মৌমাছিরা মহাবিপদে পড়ল। ফুল নেই। মৌচাক নেই। মধু নেই।

কয়েক দিন এদিক-ওদিক ঘুরেও খাবারের ব্যবস্থা হলো না। শেষ পর্যন্ত মৌমাছিরা দলবেঁধে বন ছেড়ে দূরে কোথাও চলে গেল। প্রজাপতিরা কিন্তু থেকে গেল। তারা পোকামাকড় আর গাছের পাতা খেয়েই টিকে রইল।

কিছু দিন পর আবার বনে ফুল ফুটল। নদীর ধারে, গাছের ডালে, ঝোপের আড়ালে— চারদিকে রঙের মেলা বসে গেল। ফুলে ফুলে উড়তে লাগল প্রজাপতিরা। কয়েক দিন পর দূরদেশ থেকে কিছু মৌমাছিও ফিরে এলো।

ফিরে এসে তারা দেখল, যেসব প্রজাপতিকে তারা এত দিন তাড়িয়েছে, হুল ফুটিয়েছে, সেই প্রজাপতিরাই নিজের বুদ্ধিতে টিকে আছে। বরং আগের চেয়ে অনেক বেশি সতেজ। অন্যদিকে তারা নিজেরাই মধু আর মৌচাক হারিয়ে এত দিন অন্যের বনে ঘুরে বেড়িয়েছে। মৌমাছিদের মনটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।

ফুলের কাছে এসেও তারা কেমন সংকোচ বোধ করছিল। এত দিন যাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের সামনে গিয়ে ফুলে বসতে কেমন লজ্জাই লাগছিল। ছোট্ট প্রজাপতিটা বিষয়টা বুঝতে পারল। সে প্রবীণ প্রজাপতিটার দিকে তাকাল। প্রবীণ প্রজাপতিটা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ছোট্ট প্রজাপতিটা তখন মৌমাছিদের ডেকে বলল,—কী হলো? ওভাবে দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো, ফুলে বসো।

মৌমাছিগুলো প্রথমে ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে একটা মৌমাছি ফুলের ওপর গিয়ে বসল। কেউ তাকে তাড়াল না।

আরেকটা মৌমাছি এগিয়ে এলো। তারপর আরেকটা। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, ফুলে ফুলে আবার প্রজাপতি আর মৌমাছিরা পাশাপাশি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

একদিন সেই ছোট্ট প্রজাপতিটা একটা বড় লাল ফুলে বসে নিশ্চিন্ত মনে মধু খাচ্ছিল। একটু দূরে প্রবীণ প্রজাপতিটা বসে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার মুখে লেগে ছিল প্রশান্তির হাসি। ছোট্ট প্রজাপতিটা একবার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

তারপর আবার ডানা মেলে উড়ে গেল ফুল থেকে ফুলে। মাঝপথে একটা কচি পাতায় নেমে টুক করে একটা ছোট্ট কামড়ও বসাল— নিছক পুরোনো অভ্যাসে। তারপর হেসেই আবার উড়াল দিল পরের ফুলের দিকে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও/এমকে
  বিষয়:   ফুল  নিমন্ত্রণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: