শহীদ কাদরীকে বলা হয় ‘নাগরিক কবি’। আধুনিক বাংলা কবিতায় তার অবস্থানও সাধারণত আধুনিকতাবোধ, নগরজীবনের ক্লান্তি, প্রেম, স্বদেশ ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু তার কবিতাকে আরেকটি জায়গা থেকেও পড়া যায়, যে জায়গাটি আমাদের এই সময়ের জন্য আরও জরুরি। সেটি হলো যুদ্ধের বিরুদ্ধে একজন প্রেমিকের অবস্থান।
আজ শহীদ কাদরীর জন্মদিন। ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মেছিলেন বাংলা কবিতার এই স্বতন্ত্র কণ্ঠ। জীবন তাকে কলকাতা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ইউরোপ এবং শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। কিন্তু তার কবিতার ভেতর যে শহর, যে দেশ, যে প্রেম এবং যে মানুষের জন্য আকুলতা, তা কখনো কোনো ভূগোলের মধ্যে আটকে থাকেনি। তাই মৃত্যুর দশ বছর পরও তার কবিতা আমাদের সমকালকে স্পর্শ করে।
বিশেষ করে ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’। এই কবিতার কবি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন না। তিনি যুদ্ধের ভাষাটিকেই বদলে দেন। যেখানে রাষ্ট্রের ভাষায় থাকে সেনাবাহিনী, রণতরি, যুদ্ধবিমান, সীমান্ত, ব্যারিকেড ও অস্ত্র, সেখানে শহীদ কাদরী বসিয়ে দেন গোলাপ, ভায়োলিন, চকোলেট, টফি, লজেন্স, চুম্বন ও ভালোবাসা।
কবিতার শুরুতেই তার সেই অমর উচ্চারণ, ‘ভয় নেই / আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী / গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে / মার্চপাস্ট করে চলে যাবে / এবং স্যালুট করবে / কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।’
এই ‘ভয় নেই’ কেবল প্রেমিকাকে দেওয়া নিছক আশ্বাস নয়। এটি যেন যুদ্ধের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একজন কবির নিজস্ব প্রতিরোধ। কারণ যুদ্ধের প্রথম কাজই হলো মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। ঘর থাকবে কি না, সন্তান নিরাপদ থাকবে কি না, প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবে কি না, আগামীকাল আদৌ আসবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
শহীদ কাদরীর প্রেমিক সেই ভয়কে অস্বীকার করেন। তবে বাস্তবতা থেকে পালিয়ে গিয়ে নয়। বরং যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতীকগুলোকে কবিতার ভেতরে এনে তিনি তাদের অর্থ বদলে দেন।
তিনি লেখেন, ‘বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে / কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে / আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে / ভায়োলিন বোঝাই করে / কেবল তোমার দোরগোড়ায়, প্রিয়তমা।’
যে আর্মার্ড-কার মানুষের দিকে এগিয়ে আসে ধ্বংস নিয়ে, কবির কল্পনায় সেটি আসে ভায়োলিন নিয়ে। যে যুদ্ধযন্ত্রের কাজ জীবন কেড়ে নেওয়া, সেটিই হয়ে ওঠে সংগীতের বাহন। ধ্বংসের প্রযুক্তিকে তিনি সৃষ্টির উপকরণে পরিণত করেন। এর মধ্যে এক ধরনের গভীর সভ্যতাগত প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। মানুষ এত উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার করল, কিন্তু সেই প্রযুক্তি দিয়ে কি সে জীবনকে আরও নিরাপদ করেছে, নাকি আরও নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে শিখেছে?
শহীদ কাদরীর এই প্রশ্ন আজ আরও তীব্র।
আমাদের সময়ের যুদ্ধ আর শুধু বন্দুক, ট্যাংক কিংবা কামানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট নজরদারি ও আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি মানুষের ধ্বংসক্ষমতাকে অভাবনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হাজার মাইল দূরে বসে একজন মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যার অভিঘাতে মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটি ঘর, একটি পরিবার, একটি শিশুর পৃথিবী।
শহীদ কাদরী যেন সেই পৃথিবীর বিপরীতে দাঁড়িয়েই বলেছিলেন, ‘বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো / মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে / ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো / চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো / প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে / কেবল তোমার উঠোনে, প্রিয়তমা।’
যুদ্ধবিমান যেখানে বোমা বহন করে, তার কল্পনায় সেখানে ঝরে পড়ে চকোলেট আর লজেন্স। শিশুর উঠোনে মৃত্যু নয়, আনন্দ নেমে আসে। দৃশ্যটি একদিকে শিশুর মতো সরল, অন্যদিকে সভ্যতার প্রতি নির্মম ব্যঙ্গ। যে আকাশ থেকে বোমা পড়ার কথা, সেখান থেকে যদি মিষ্টি পড়ত, পৃথিবী কি একটু বেশি মানবিক হতো না?
আজ গাজা, ইরান, ইউক্রেন, সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের দিকে তাকালে এই কল্পনার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। যুদ্ধের খবর আসে সংখ্যা হয়ে। কত মানুষ নিহত, কত ভবন ধ্বংস, কত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, কত এলাকা দখল। কিন্তু সংখ্যার ভেতর মানুষ হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় তার নাম, তার ঘর, তার মায়ের অপেক্ষা, তার সন্তানের ভয়, তার অসমাপ্ত স্বপ্ন।
শহীদ কাদরীর কবিতা সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটির কাছে ফিরে যেতে চায়।
এই কারণেই তার যুদ্ধবিরোধিতা কেবল অস্ত্রবিরোধিতা নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনের পক্ষে অবস্থান। একটি শিশু যেন খেলতে পারে, একজন প্রেমিক যেন প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে যেতে পারে, একজন মা যেন সন্তানের জন্য দরজা খুলে অপেক্ষা করতে পারেন, একজন বৃদ্ধ যেন নিজের ঘরে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন। সভ্যতার এত আয়োজন, এত প্রযুক্তি, এত ক্ষমতার শেষ সার্থকতা যদি কিছু হয়, তবে তা মানুষের এই সামান্য নিরাপত্তা।
শহীদ কাদরীর প্রেমিকসত্তার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। তার প্রেমিক কোনো পালিয়ে থাকা মানুষ নন। তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অন্য এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে যুদ্ধের বদলে প্রেম জয়ী হবে।
‘একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরি / এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় / সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!’
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার প্রচলিত কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। সমরমন্ত্রী নয়, জনপ্রিয় হবেন প্রেমিক। সামরিক কমান্ডারের বদলে কবি নেতৃত্ব দেবেন রণতরীর। যুদ্ধের রাজনীতির বিপরীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কবিতা ও ভালোবাসার রাজনীতি।
তার কাছে প্রেম তাই নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়। প্রেমের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আছে, যুদ্ধের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক আছে, এমনকি নির্বাচনের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক আছে। কারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত থেকে আলাদা করা যায় না। রাষ্ট্র যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে, তার অভিঘাত প্রথমে এসে পড়ে মানুষের ঘরে।
তাই তার স্বপ্ন আরও বিস্তৃত হয়, ‘সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হবে যাবে / আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক / অনায়াসে বিরোধী দলের অধিনায়ক হ’য়ে যাবেন।’
অস্ত্রধারীর বদলে গায়ক। যুদ্ধের অধিনায়কের বদলে শিল্পী। অর্থাৎ নেতৃত্ব সেই মানুষের হাতে যাক, যে সৃষ্টি করতে জানে, ধ্বংস করতে নয়।
আর তারপর সেই অসাধারণ উচ্চারণ, ‘ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হ’য়ে যাবে, প্রিয়তমা।’
চোরাচালান রাষ্ট্রের সীমান্ত ও নিষেধ অতিক্রম করে। শহীদ কাদরী সেই শব্দটিকেই ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। রাষ্ট্র কাঁটাতার তোলে, প্রেম সেই কাঁটাতার অতিক্রম করে। রাষ্ট্র পাসপোর্ট চায়, প্রেম কোনো পরিচয়পত্র চায় না। রাষ্ট্র মানুষকে শত্রুতে ভাগ করে, প্রেম তাকে আবার মানুষে ফিরিয়ে আনে।
এই পঙ্ক্তি আজকের পৃথিবীতে যেন আরও বেশি সত্য।
জাতীয়তা, ভূখণ্ড, সীমান্ত ও নিরাপত্তার নামে যখন মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন শহীদ কাদরীর প্রেমিক আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর পরিচয় কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় নয়। সে প্রথমে মানুষ। তার পরে অন্য সব পরিচয়।
শহীদ কাদরীর যুদ্ধবিরোধী প্রেম তাই সরল রোমান্টিকতা নয়। এর মধ্যে আছে ব্যঙ্গ, রাজনীতি, মানবতাবাদ এবং এক অসম্ভব পৃথিবীর স্বপ্ন। তিনি জানতেন, তার কল্পিত পৃথিবী বাস্তবে সহজে তৈরি হবে না। তবু তিনি সেই পৃথিবীর কথা বলেছেন। কারণ কবিতার কাজ সবসময় বাস্তবতার অনুকরণ করা নয়। কখনো কখনো কবিতা বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে এমন একটি পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়, যেখানে মানুষ তার বর্তমানের চেয়ে একটু বেশি মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাতেই শহীদ কাদরী আজও আমাদের সমকালীন।
যুদ্ধের পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন একজন প্রেমিক। কারণ তিনি যুদ্ধকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, কেন মানুষের ঘরে আগুন লাগবে? কেন বোমার শব্দে শিশুর ঘুম ভাঙাবে? কেন মানুষকে অন্য একজন মানুষ হত্যার প্রশিক্ষণ নিতে হবে? কেন সীমান্তের ওপারে থাকা মানুষটি হঠাৎ শত্রু হয়ে যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো সামরিক উত্তর নেই; কবিতায় এর উত্তর আছে।
তাই শহীদ কাদরীর কবিতায় রণতরী ফুলের মতো হয়ে ওঠে, যুদ্ধবিমান মিষ্টি ছড়ায়, আর্মার্ড-কারে ভায়োলিন ওঠে, সৈন্যের হাতে গোলাপ আসে। বাস্তবের পৃথিবীতে এগুলো অসম্ভব। কিন্তু কবিতার পৃথিবীতে অসম্ভবই কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ।
শহীদ কাদরীর প্রেমিক আসলে কোনো নির্দিষ্ট নারীকে নয়, তিনি অভিবাদন জানান একটি মানবিক পৃথিবীকে। যে পৃথিবীতে মানুষ ভয় ছাড়া বাঁচবে, প্রেম করবে, গান শুনবে, সন্তান বড় করবে এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরবে।
তার আরেকটি উচ্চারণ সেই স্বপ্নকে আরও গভীর করে, ‘গণরোষের বদলে / গণচুম্বনের ভয়ে / হন্তারকের হাত থেকে প’ড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।’
এখানে, চুম্বন হয়ে ওঠে ছুরির বিপরীত শক্তি। হত্যার উন্মত্ত হাতকে থামিয়ে দেয় কারোর ভালোবাসা। কথাটি যতটা সরল, তার ভেতরের দর্শন ততটাই গভীর। কারণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি শেষ পর্যন্ত কোনো অস্ত্র নয়, অন্য মানুষের জীবনের প্রতি তার মমতা।
শহীদ কাদরী আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তার সেই প্রেমিকসত্তা এখনও হেঁটে বেড়ায় পৃথিবীর যুদ্ধবিধ্বস্ত রাস্তায়। সে ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়ায়, আশ্রয়কেন্দ্রের অন্ধকারে বসে থাকে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সারিতে অপেক্ষা করে, কিংবা পৃথিবীর কোনো এক সীমান্তের ছোট ঘরে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার হাতে কোনো বন্দুক নেই। কোনো পতাকা নেই। আছে কেবল একটি অসম্ভব স্বপ্ন। আজকের পৃথিবীতে সেই স্বপ্নের নাম ‘প্রেম’।
জন্মদিনে তাই শহীদ কাদরীকে শুধু স্মরণ নয়, অভিবাদন। সেই প্রেমিক কবিকে অভিবাদন, যিনি যুদ্ধের পৃথিবীতেও বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন গোলাপের শক্তিতে। যিনি রণতরীর চেয়ে ভায়োলিনকে, বন্দুকের চেয়ে চুম্বনকে, হিংসার চেয়ে ভালোবাসাকে এবং মৃত্যুর বিপরীতে জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
শহীদ কাদরী, আপনার সেই ‘ভয় নেই’ আজও আমাদের ভরসা যোগায়। কারণ পৃথিবী যতই যুদ্ধের দিকে যাক, মানুষকে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হবে প্রেমের কাছেই।