তৃষাতুর পথ

আহমাদ কাউসার

সাহিত্য

দূর্বা ঘাসের ডগায় রুপালি শিশির বিন্দুর হাসি কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। রোদের স্নিগ্ধ হাসি এসে পড়েছে বৃক্ষরাজির মগডালে। নাঙ্গল জোয়াল

2026-10-02T13:17:20+00:00
2026-10-02T13:17:20+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
তৃষাতুর পথ
আহমাদ কাউসার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দূর্বা ঘাসের ডগায় রুপালি শিশির বিন্দুর হাসি কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। রোদের স্নিগ্ধ হাসি এসে পড়েছে বৃক্ষরাজির মগডালে। নাঙ্গল জোয়াল কাঁধে নিয়ে বের হচ্ছে গাঁয়ের কৃষকরা। 

কটকটির ভার কাঁধে নিয়ে ভেজা সরুপথ ধরে ছন্দতালে হেঁটে যাচ্ছে গফুর। গাঁয়ে সে কটকটিওয়ালা নামেই পরিচিত। প্রতিদিন একই ভার কাঁধে নিয়ে, একই তালে ঘুরে বেড়ায় গাঁ থেকে গাঁয়ে। বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে উচ্চস্বরে হাঁকে— টিন ভাঙা, লোহা ভাঙা, পুরান বই-খাতা দিয়ে রাখবেন কটকটি। আর এমনই দলবেঁধে হাজির হয় ছোট-বড় সবাই। আজ তার গন্তব্য পাশের গাঁও হিজলতলী। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাঁটছে গফুর। গাঁয়ের প্রথম বাড়িটির কাছে গিয়ে হাঁক ডাকে। কেউ আসে টিন ভাঙা নিয়ে, কেউ আসে লোহা ভাঙা নিয়ে আর কেউ আসে পুরান বই-খাতা নিয়ে। ভিড় করে গফুরের চারপাশে। 

মহানন্দে গফুর প্রাপ্য অনুযায়ী কেটে দেয় কটকটি। এ বাড়িতে বিক্রি শেষে রওনা দেয় আরেক বাড়ির দিকে। ভার কাঁধে গফুর যাচ্ছে পরের বাড়ির দিকে। পুব আকাশের সূর্যটা ধীরে ধীরে তেজোদীপ্ত হচ্ছে। সূর্যের আলো তার মুখে এসে পড়ছে। ভারের দোলের সঙ্গে এক নিখুঁত তাল আছে তার হাঁটায়। গন্তব্যের বাড়িটিতে পৌঁছার আগেই তার সামনে পড়ে খাকি কাপড় পরা, ইয়া বড় গোঁফওয়ালা লম্বা চারজন মিলিটারি। সফেদ লম্বা দাঁড়িওয়ালা এক বাঙালিসহ ওরা পাঁচজন। ওদের কাঁধে রাইফেল। পিলে চমকে যায় গফুরের। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়, কাঁপতে থাকে গফুরের ঠোঁট-মুখ।  দেহের কম্পনের সঙ্গে কাঁধের ভারও কম্পমান। গেঁয়ো পরিবেশে বেড়ে ওঠা গফুর সে কবে একবার পুলিশ দেখেই ভিরমি খেয়েছিল সে কথা তার মনে পড়ে যায়। 

হঠাৎ এমন দীর্ঘদেহী মানুষের কাঁধে রাইফেল দেখে ভয়ে শরীর অবশ হওয়ার উপক্রম। সঙ্গে থাকা বাঙালি লোকটি আক্রমণাত্মক স্বরে বলে— ভার নামা। গফুর দাঁড়ায়। কাঁধ থেকে ভার নামায়। অপরাধীর মতো অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ওদের দিকে। অপলক তার দৃষ্টি। মিলিটারিরা তার ভারে থাকা খাঁড়ি দুটোতে তল্লাশি চালায়।

একটা মিলিটারি বাঙালি লোকটাকে জিগ্যেস করে, কে সে? কী করে? কোথায় যায়? বাঙালি লোকটা তাচ্ছিল্যের ভাবে বলে, স্যার সে কটকটিওয়ালা। গরিব মানুষ। বাড়ি বাড়ি কটকটি বিক্রি করে। মিলিটারি আর কিছুই জিগ্যেস না করে বলে, ঠিক আছে, ছেড়ে দাও। বাঙালি লোকটা গফুরের আগলে রাখা পথ থেকে সরে যায়। বলে, তুই যা। তোর ভয় নেই। গফুর অবচেতনের মতো স্থির হয়ে রইল। বাঙালি লোকটা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল, দাঁড়িয়ে আছস কেন, তুই যেখানে যাচ্ছিলি যা। 

গফুর থতমত খেয়ে ভার কাঁধে নিয়ে আবার হাঁটতে থাকে। এবার তার হাঁটায় নেই সেই চিরচেনা ছন্দ-তাল। কাঁপছে তার শরীর। সে শুনেছে দেশে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু হিজলতলী কিংবা আশপাশের গাঁয়ে সে যুদ্ধ দেখেনি। গফুর একটু পরপর পেছনে মিলিটারির দিকে তাকায় আর হাঁটে। জীবনে কখনো এত লম্বা গোঁফওয়ালা মানুষ দেখেনি সে। গফুর বাড়িটিতে পৌঁছে। কিন্তু আগের মতো আর সেই চেনা হাঁক— টিন, লোহা, পুরান বই-খাতা এসব তার মুখ দিয়ে বেরোয় না। বাড়িটিতে আগের মতো কোলাহল নেই। নেই কারোর সাড়াশব্দ। ভূতুড়ে বাড়ির মতো নীরবতা ঢেকে রেখেছে বাড়িটিকে। গফুর নিঃশব্দে পুরো বাড়িটি ঘুরে, কিন্তু কেউ তাকে দেখেছে বলে মনে হয় না। গফুরও কাউকে দেখেনি। একটু আগে এই বাড়িতে মিলিটারি এসেছিল। যার যার মতো করে আতঙ্ক আর ভয়ে নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে আছে বাড়ির লোকজন। 

গফুরের মন পরের বাড়ি যেতে সায় দিচ্ছে না। অনিচ্ছার বেড়ি ভেঙে সে যায় পরের বাড়িতে। কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছে তার। হাঁক তোলার ইচ্ছে হচ্ছে না। তৃষ্ণার্ত গফুর। তাই ইচ্ছে করলেও উচ্চস্বরে ডাকতে পারছে না। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচল হয়ে আসছে। পানি পেলে ভালো হতো। গফুর সে বাড়ির ঘাটে পিঠালি গাছের ছায়ায় বসে। নাকে, মুখে ও কপালে চিকন ঘাম। শিকারির মুখ থেকে বেঁচে ফেরা হরিণের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামা করছে। শরীরের ঘাম কিছুটা শুকিয়ে এসেছে। উঠে দাঁড়াল গফুর। ভার কাঁধে নিল। তৃষ্ণা, ভয় আর আতঙ্ককে সাথি করে বাড়ির দিকে রওনা হলো গফুর। অন্য পথে। আসার সময় যে পথ ধরে এসেছে, সে পথে ফিরতে তার মন সায় দিচ্ছে না। সে অন্য পথ ধরল। দ্রুত পায়ে হেঁটে চলল বাড়ির দিকে। চোখে ভাসছে সেই দৃশ্য— মিলিটারির, গোঁফ, রাইফেল। 

ক্লান্ত গফুর। দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করলেও থেমে যেতে চায় পা। হাঁটায় আসে না ক্ষিপ্রতা। পা চলতে চাচ্ছে না। তবু যেতে হবে। শিগগিরই ফিরতে হবে। হাঁটছে গফুর।

সূর্যটা মাথার ওপর। ফসলের জমিতে দোল খেতে খেতে দখিনা বাতাস বয়ে যাচ্ছে উত্তর দিকে। বাতাসের তুলনায় রোদের প্রখরতা বেশি। যতদূর চোখ যায় রোদের সোনালি হাসি। প্রকৃতির সঙ্গে রোদের যেন পরম মিতালি। এ অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো অবস্থায় নেই তার।  মনে নেই স্বস্তি। কখন বাড়িতে পৌঁছাবে সে চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। গফুরের মনে পড়ছে তার ছোট মেয়ে ফুলকির কথা। যে রোজ রোজ গফুরকে বলে, তুমি সারা দিন কী করো বাবা? সন্ধ্যা করে বাড়ি ফের কেন? আগে আগে আসতে পারো না। তোমাকে ছাড়া আমার ভালো লাগে না। 

গফুর ভাবছে আজ তাড়াতাড়ি ফিরলে ফুলকি খুশি হবে। হাঁটছে গফুর। ফুলকির চেহারাটা ভাসছে তার চোখের সামনে। সরু মেঠোপথ। ফসলের মাঠে রোদের সোনালি হাসি। গফুর একবার ডানে তাকায়, আরেকবার বামে। একটু দাঁড়ায়। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত কোনো লোকজন দেখতে পায় না। সবসময় যেখানে কৃষানিরা কাজ করত, রাখালরা গরু চরাত, ছাগল চরাত সেখানে নির্জনতা। এসব ভাবনা গফুরের মনে খেলা করতে লাগল। ভূতুড়ে রাজ্য মনে হলো চিরচেনা ফসলের জমিগুলোকে। তৃষ্ণা আরও ঘনীভূত হলো। প্রখর রোদ তৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবু হাঁটছে গফুর। কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে কী যেন একটা উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে চলে গেল। চিকন একটা শব্দ। গফুর থামল। ডান-বামে তাকাল। কিছুই দেখতে পেল না। ভারটা বাম কাঁধ থেকে ডান কাঁধে নিয়ে আবার হাঁটতে লাগল। আবার শোঁ শোঁ শব্দ। গফুর এবার স্পষ্ট দেখতে পেল কলার মোচার মতো কিছু একটা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। 


এত দ্রুতবেগে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই কী যাচ্ছে এটা। আর বুঝলেই বা কী! এসব যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে গফুরের ধারণাই নেই। রাইফেল ছাড়া এ জীবনে আর কিছুই দেখেনি সে। এবার মনে মনে কলার মোচাসদৃশ বস্তুর রহস্য খুঁজতে খুঁজতে হাঁটতে লাগল। একবার ভাবে এটা কি তা হলে গোঁফওয়ালা মিলিটারির ছোড়া গুলি। নাকি অন্য কিছু। দীঘল রৌদ্রময় পথে গফুর ছাড়া আর কোনো লোকজন নেই। গফুরের মনে আরও ভয় এসে জড়ো হলো। ক্লান্ত-তৃষ্ণার্ত গফুরের পথ যেন শেষ হতে চায় না। 

বুকে কঠিন অস্থিরতা চলছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। ছোট একটু বরুণ গাছ। কিছুটা ছায়া আছে। গফুর ভার রেখে বসল। এ গাছের ছায়ায় আগেও সে ক্লান্তি ঝেড়েছে। কোমরে বাঁধা গামছাটা খুলে মুখের ঘাম মুছতে লাগল। ঝিরঝিরে দখিনা বাতাস গফুরের গায়ে লাগে। কিছুটা শ্রান্তি লাগে তার। গাছটায় হেলান দিয়ে বসে গফুর। আবার শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পায় গফুর। কিছুই দেখতে পেল না। গফুর হেলান ছেড়ে গাছ থেকে হাতখানেক দূরে বসল। আবার শোঁ শোঁ শব্দ। উত্তর দিকে তাকায় গফুর। কিছু বোঝার আগেই মর্টারশেলটা তার শরীরে আঘাত করে।

একটা হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জমিতে গিয়ে পড়ে। ছটফট করতে থাকে গফুরের বাকি শরীর। জবাই করা পশুর মতো ক্রমাগত গোঙানি শব্দ করে যাচ্ছিল গফুর। গফুরের দেহে তখনও প্রাণ আছে। কার্পেটসদৃস সবুজ ঘাসে টগবগে লাল রক্তের উল্লাস। নির্জন মেঠোপথে ক্ষতবিক্ষত গফুরের মনে পড়ে ফুলকির কথা। 

তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল গফুর কিন্তু ফেরা হলো না। গফুরের প্রাণভোমরা দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। সবুজ ঘাসের ওপর লাল রক্তের দাগ শুকিয়ে যায়।
বরুণ গাছের নিচে যেন সদ্য আঁকা লাল-সবুজের পতাকা। আর সেই পতাকার পাশেই পড়ে থাকে গফুরের নিথর দেহ।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   তৃষাতুর পথ  সাহিত্য  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: