স্বদেশ থেকে এক আত্মীয়ের টেলিফোন মারফত জানতে পারি যে, প্রয়াত হয়েছেন আমার প্রিয় মানুষ, শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন। তার অসুস্থতা সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম, বয়সের নিরিখে সিনিয়র এ মানুষের মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে তার সঙ্গে দশকের পর দশকব্যাপী আমার মিথস্ক্রিয়ার বয়সও যে অর্ধশতাব্দীরও বেশি, এ বাবদে সচেতন হয়েছি— গত চার বা পাঁচ দিনে, মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকে ক্রমাগত স্মৃতিতাড়িত হয়ে।
শৈশবে একবার আমাদের এলাকায় এসেছিলেন, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ঘটনাটি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের আগে ঘটেছিল, নাকি ভাসানী-হুজুরকে কেন্দ্র করে বিরাট জমায়েতটি আয়োজিত হয়েছিল যুদ্ধের পরের বছর, সঠিক করে সাল-তারিখ দেওয়াটা আমার জন্য মুশকিল। তবে চোখ মুদে আমি এ মুহূর্তে দেখছি,
কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার ঢল নেমেছে, ভাসানী-হুজুরকে নিয়ে ট্রেনটি তখনও এসে পৌঁছেনি, বিরাট আকারের একটি মিছিল ছুটছে লংলা রেলস্টেশনের দিকে, দ্রুত হাঁটতে গিয়ে নুড়িপাথরে হোঁচট খেয়ে থেমেছি আমি, আর আমার পাশ দিয়ে হাতে লেখা পোস্টারের বোন্দা বগলদাবা করে, স্লোগান দিতে দিতে এগোচ্ছেন আখতার ভাই, তার কণ্ঠস্বর ফুঁড়ে আওয়াজ উঠছে— কৃষক নেতা হাতেম আলীর, সমস্বরে আমরা তাতে শামিল হচ্ছি— ‘মুক্তি চাই, মুক্তি চাই’ বলে।
এ ঘটনার বছরখানেক পর আমার এক আত্মীয় হাবিব ভাইকে (স্বাক্ষরতা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আ ন স হাবিবুর রহমান) নিয়ে আখতার ভাই এসেছিলেন, আমাদের এলাকার স্কুলে, ‘পদ্মকলি’ নামে খেলাঘরের আসর সংগঠন করতে। বিকালের দিকে আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন, জেনেছিলাম যে তিনি কবিতা লেখেন, ছড়া ও কবিতার ব্যবধান সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না, তবে আমি নিজের নিভৃতে পদ্য লেখায় হাত মশকো করছিলাম এবং স্বাভাবিক কারণে একজন কবিকে খুব কাছ থেকে দেখে আকর্ষণও বোধ করেছিলাম।
এ ঘটনাগুলো লিখতে গিয়ে আমি এ মুহূর্তে সচেতন হচ্ছি, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির মতো আমার স্মৃতিও নানা জায়গায় জরাজীর্ণ হতে হতে, মুছে-টুছে এতটা বিবর্ণ হয়েছে যে, এর ওপর ভরসা করে দূর-অতীতের ঘটনার বিবরণ দেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আখতার ভাইকে নিয়ে বেশ কিছু তরতাজা স্মৃতিও আমাকে এ মুহূর্তে বিষাদগ্রস্ত করছে, যার একটি হচ্ছে, আমার প্রিয় বন্ধু কবি রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লার মৃত্যু-সংক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রয়োজনে আমি ঢাকাতে এসেছি। সারা দিনমান বিমানের টিকেট কেনা জাতীয় লজিস্টিকস ঘেঁটে সন্ধ্যার দিকে শাহবাগের সিনোরিটা নামক রেস্তোরাঁয় আসি, চেনাজানা বন্ধুবান্ধবদের তালাশে। তুষারের (কবি তুষার দাশ) কাছ থেকে জানতে পারি— প্রয়াত হয়েছে আমার প্রিয়বন্ধু রুদ্র।
পরদিন কিংবা তার পরদিন প্রেস ক্লাবে আয়োজিত হয়েছিল শোকসভা, ওখানে গিয়ে হাজির হই। জানাশোনা অনেকের সঙ্গে বছরকয়েক পর ফের দেখা হয়। জানতে পারি যে, বারডেমের হিমাগারে তখনও রুদ্রের মরদেহ সংরক্ষিত আছে। প্রেস ক্লাব থেকে বারডেমে যাওয়াটা কঠিন কিছু না, তবে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, সন্ধ্যার সময় ওখানে গেলে রক্ষীরা আমাকে মরদেহ দেখতে দেবে কি না। ততক্ষণে শোকচারণা করে পডিয়াম থেকে নেমে এসেছে কামাল (কবি কামাল চৌধুরী), কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আখতার ভাই, শুনে তিনিই উদ্যোগ নেন, বলেন, যাওয়া যাক। বেবিট্যাক্সি করে আমরা তথা আখতার ভাই, কামাল ও আমি গিয়ে পৌঁছি বারডেমে। রক্ষীরা আপত্তি তোলেনি। ঢালা খুলে মরদেহের মুখ দেখার বন্দোবস্ত করে দেয়। নির্নিমেষে আমরা তাকিয়ে থাকি— রুদ্রের নিষ্প্রাণ মুখমণ্ডলের দিকে। মরদেহ স্পর্শ করতে উৎসাহিত করেন আখতার ভাই। মনে হয় তিন যুগ আগের ঘটনা, কিন্তু এখনও চোখ মুদলে আমি দেখতে পাই— হিমাগারে লোহার সিন্দুক মতো কফিনে শুয়ে আছে রুদ্র এবং আমার করতলে লেগে আছে তার ললাটের হিমেল স্পর্শ।
পরবাসের কারণে বছরসাতেকের বিরতি দিয়ে ফের আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটে বাংলা একাডেমির চত্বরে। বইমেলা উপলক্ষে আমি সে জমানার কর্মস্থল লাওস থেকে স্বদেশে আসি, বারতিনেক। প্রতিবারই দেখা হয় আখতার ভাইয়ের সঙ্গে। ততদিনে রেজার (কবি আলমগীর রেজা চৌধুরী) সক্রিয় উদ্যোগে, লাওসে আমার ঘুরে বেড়ানোর বিষয়-আশয় নিয়ে রচিত অনেক এপিসোড মুদ্রিত হয়েছে, একাধিক পত্রিকা ও জার্নালে। কয়েকটি লেখা আখতার ভাই পড়েও ছিলেন, কিন্তু যেসব বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে আমি লেখাগুলো তৈরি করেছিলাম, তা যে তার মনঃপূত হয়নি, তিনি তা অকপটে জানিয়েছিলেন।
লাওসের ‘রেড প্রিন্স’ বা ‘কমিউনিস্ট প্রিন্স’ নামে খ্যাত রাজকুমার সোফানোভঙ্গকে নিয়ে লিখতে তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, লাওসে বাজার অর্থনীতির নেগেটিভ ইমপেক্ট সম্পর্কেও জানতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। আমি লিখেও ছিলাম— ‘লুয়ায়প্রাবাং এর লোহিত রাজকুমার’ কিংবা ‘উদমসাইয়ের বাজার অর্থনীতির বান্দর নৃত্য’ প্রভৃতি শিরোনামে তৈরি এপিসোডগুলো আমি পাঠিয়েও ছিলাম, সে আমলের কোনো পত্রপত্রিকায়। লেখাগুলো কোথাও ছেপেছিল কি? আমি নিশ্চিত নই, ছাপলেও তা আখতার ভাইয়ের চোখে পড়েনি— তা জেনেছিলাম আরও বছর পনেরো পরে, প্রথমা প্রকাশনের প্রেক্ষাপটে ফের তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটলে পরে।
প্রথমা প্রকাশনের দফতরে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে একাধিকবার। প্রথমবারের সাক্ষাতে আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন এবং আমি পেশায় ‘প্রকৌশলী’ কি না জানতে চাওয়াতে আন্দাজ করেছি— কমজোর হয়েছে আখতার ভাইয়ের স্মৃতিশক্তি। কিছু মনে করিনি, তবে এক সুযোগে তাকে তার ডাকনাম ‘মঞ্জুভাই’ সম্বোধন করে, আমি যে ভাষাসৈনিক ও বামধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ সৈয়দ আকমল হোসেনের ভাগনে সে পরিচয় দেওয়াতে, চমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাকে আলিঙ্গনও করেছেন। অনেকক্ষণ ধরে, কুলাউড়া শহরের রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসের সময়, তার প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ‘আকমল কাকার’ সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার স্মৃতিচারণ করেছেন।
তারপর থেকে মাঝেমধ্যে আমাকে টেলিফোনও করতেন আখতার ভাই। যতটা মনে পড়ে, প্রকাশনের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি; আমার একটি পাণ্ডুলিপি পুরোটা পড়ে ফেলেছেন, বলাতে আমি রিয়েক্ট করার ভাষা খুঁজে না পেয়ে নিশ্চুপ হয়ে যাই, তো আখতার ভাই একটি এপিসোড থেকে হিউমার-ঋদ্ধ কয়েকটি বাক্য পাঠ করে, এ ধরনের কিছু অনুচ্ছেদ যে তার প্রিয়, এ রকম দাবি করে আমাকে বিব্রত করেছেন; তবে আমার বালক বয়সের রোডমডেল একজন সিনিয়র লেখকের কাছ থেকে মন্তব্য শুনে, বলতে দ্বিধা নেই— আমি যার পর নাই খুশি হয়েছি।
বই পড়তে ও সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন আখতার ভাই, সংগীত শ্রবণেও তার আগ্রহ ছিল প্রচুর। সে আমলে আমি ঢাকা মহানগরীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার উসিলায় স্বদেশে আসতাম প্রায়। পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে খুঁজে পেতে বই ও সিডি জোগাড় করে নিয়ে আসতাম তার জন্য, ছোট্ট এ অনুল্লেখযোগ্য উপহার পেয়ে খুশি হতেন, ফরমাশও করতেন। তো তার ফরমাশ মাফিক কিছু বইপত্র ও সিডি সংগ্রহও করেছিলাম, ভেবেছিলাম ফের যদি ঢাকাতে যাওয়ার মওকা মিলে, তাকে এক নজর দেখতে যাব। তার প্রয়াণে আমার মনোবাসনাটি অপূর্ণই থেকে গেল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে