আরব্য রজনি (আরবিতে কিতাব আলফ লায়লা ওয়া-লায়লা) মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় গল্প। এটি লোককথার একটি সংকলন। যা ইসলামের স্বর্ণযুগে আরবিতে সংগৃহীত হয়েছিল। এর মূল নাম ‘এক হাজার এক রাত বা সহস্র এক রজনি। তবে বাংলায় সহস্র-এক রজনি, আরব্য রজনি বা অ্যারাবিয়ান নাইটস কিংবা শুধু আলিফ লায়লা নামেও এটি পরিচিত।
পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে লেখক, অনুবাদক ও গবেষকরা বহু বছর ধরে আরব্য রজনির গল্পগুলো সংগ্রহ করেছেন। মূলত প্রাচীন ও মধ্যযুগের আরব, পারস্য, ভারত, মিসর ও মেসোপটেমিয়ার লোককাহিনি ও সাহিত্য গল্পগুলোর উৎস। এর মাঝে অনেক গল্পই খলিফাদের যুগের। বাকিগুলো পাহলভীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। যার মধ্যে কিছু ভারতীয় উপাদান বিদ্যমান।
আরব্য রজনির সব সংস্করণেই সম্রাট শাহরিয়ারকে তার স্ত্রী শেহেরেজাদ কাহিনিগুলো শোনান। কোনো সংস্করণে কয়েকশ, আবার কিছু সংস্করণে এক হাজার একটি বা তার চেয়ে বেশি কাহিনি সংকলন করা হয়েছে। কাহিনিগুলো গদ্যরীতিতে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে কখনো কখনো পদ্যও ব্যবহার করা হয়েছে গানে এবং ধাঁধায়; অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশে। কতিপয় দীর্ঘ কবিতা থাকলেও বাকিগুলো সবই ছড়া বা চতুষ্পদী শ্লোক।
আরব্য রজনির মূল আরবি সংস্করণে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ, আলিবাবা এবং চল্লিশ চোর আর সিন্দাবাদের সমুদ্রযাত্রার গল্পগুলো ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যের এসব লোককাহিনি আরব্য রজনির মাঝে অন্তর্ভুক্ত করেন আঁতোয়ান গ্যালেন্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় অনুবাদকরা। আরব্য রজনিতে বিভিন্ন ধরনের গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে একই সঙ্গে আছে ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত গল্প, প্রেমকাহিনি, বিয়োগাত্মক কাহিনি, রম্যরচনা, কবিতা এবং প্রহসন।
গল্পগুলোকে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র ও ঐতিহাসিক চরিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। আরব্য রজনির প্রধান চরিত্র আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল রশিদ। এ ছাড়া এতে তার উজির জাফর আল বারমাকি এবং বিখ্যাত কবি আবু নুয়াসের উল্লেখ আছে।
যদিও যে সময়কালের প্রেক্ষাপটে কাহিনি সাজানো, তাদের সময়কাল তারও ২০০ বছর পর। বিভিন্ন গল্পে দেখা যায়, কথক অন্য কথকের মাধ্যমে কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এর বিভিন্ন সংস্করণে কাহিনির ইতি টানা হয়েছে বিভিন্নভাবে। কিন্তু সব সংস্করণেই কাহিনির শেষে রাজা তার স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করেন।
আরব্য রজনির ইতিহাস বেশ জটিল। আধুনিক গবেষকরা গল্পগুলো সংগ্রহের ইতিহাস নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। বেশিরভাগ গবেষক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আরব্য রজনির গল্পগুলো অনেকের দ্বারা সংগৃহীত এবং এর পূর্বেকার গল্পগুলো ভারত ও পারস্য থেকে এসেছে। অষ্টম শতকের দিকে এই গল্পগুলো আরবিতে অনুবাদ করে ‘আলিফ লায়লা’ শিরোনামে সংকলিত করা হয়।
পরবর্তীতে নবম ও দশম শতকের দিকে ইরাকে মূল গল্পগুলোর সঙ্গে আরবদের গল্প সংযুক্ত করা হয়। যার মধ্যে খলিফা হারুন আল রশিদকে নিয়েও কিছু গল্প ছিল। দশম শতকের পরে আরও কিছু আলাদা গল্প এর মাঝে সংযুক্ত হয়। ত্রয়োদশ শতকের পরে সিরিয়া ও মিসরে আরও গল্প যুক্ত হয়। যার বেশিরভাগ ছিল যৌনতা ও জাদু সম্পর্কিত।
গবেষকরা আরব্য রজনির অনেক গল্পের মূল ধারণার উপাদান সংস্কৃত সাহিত্যে খুঁজে পেয়েছেন। আরব্য রজনিতে ভারতীয় লোকসাহিত্য কিছু জীব-জন্তুর গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। যাতে সংস্কৃত উপকথার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এতকিছুর মধ্যেও আরব্য রজনি এখনও পাঠকের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে