এক দিনের কথা। মরুভূমিতে তখন প্রচণ্ড রোদ। চারদিকে শুধু বালু আর বালু। গরম বাতাসে বালুর ঢেউ উড়ে বেড়াচ্ছে।
কোথাও গাছ নেই, নেই কোনো জলাশয়।
সেই মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটি সাদা সারস। অনেক দূর থেকে উড়ে আসতে আসতে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে পানির খোঁজে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছিল।
হঠাৎ দূরে পানির মতো কিছু একটা দেখতে পেল সারসটি। সে মনে মনে বলল,
‘ওখানে নিশ্চয়ই পানি আছে!’
শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে সেদিকে উড়ে গেল। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখল, ওটা পানি নয়- মরীচিকা!
সারসটি আর উড়তে পারল না। ধীরে ধীরে বালুর ওপর নেমে পড়ল। ক্লান্ত হয়ে ডানা মেলে বসে রইল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল এক দল পিঁপড়ে।
একটি পিঁপড়ে সাহস করে সারসের কাছে এসে বলল, ‘সারস ভাই, আপনার কী হয়েছে?’
সারস কষ্টের গলায় বলল, ‘অনেকক্ষণ ধরে পানি খুঁজছি। কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা পানিও পাচ্ছি না। খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।’
পিঁপড়েটি সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গীদের ডাকল, ‘বন্ধুরা! সারস ভাইয়ের জন্য পানি আনতে হবে।’
একটি পিঁপড়ে বলল, ‘কিন্তু পানি তো অনেক দূরে!’
অন্য একটি পিঁপড়ে বলল, ‘দূরে হলে কী হয়েছে? আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই পারব।’
সব পিঁপড়ে পানির খোঁজে ছুটে চলল। কেউ সামনে পথ দেখাল, কেউ বালুর গর্ত এড়িয়ে চলল, আবার কেউ সবাইকে সাহস দিতে লাগল।
অনেক দূর যাওয়ার পর তারা একটি ছোট্ট মরূদ্যান খুঁজে পেল। সেখানে অল্প পানি জমে ছিল।
পিঁপড়েরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘পানি পাওয়া গেছে!’
কিন্তু পানি নিয়ে যাবে কীভাবে?
হঠাৎ তারা একটি বড় কচুপাতা দেখতে পেল। সবাই মিলে কচুপাতাটি টেনে পানির কাছে নিয়ে গেল। তারপর পাতায় পানি ভরল।
কেউ সামনে থেকে টানল, কেউ পেছন থেকে ঠেলল, আবার কেউ দুপাশ ধরে রাখল, যাতে পানি পড়ে না যায়।
ফিরতি পথ ছিল আরও কঠিন। গরম বালুতে তাদের ছোট ছোট পা বারবার ডুবে যাচ্ছিল। তবু কেউ থামল না।
একটি পিঁপড়ে বলল, ‘সাবধানে! পানি যেন না পড়ে।’
আরেকটি বলল, ‘চলো, বন্ধুরা! সারস ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।’
অনেক কষ্টের পর অবশেষে তারা সারসের কাছে ফিরে এলো।
পিঁপড়েদের দলনেতা বলল, ‘সারস ভাই, আপনার জন্য পানি এনেছি।’
সারস অবাক হয়ে কচুপাতার দিকে তাকাল। এত ছোট্ট পিঁপড়েরা এত দূর থেকে তার জন্য পানি নিয়ে এসেছে! সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
সারস ধীরে ধীরে পানি পান করল। পানি খেয়ে তার শরীরে যেন নতুন শক্তি ফিরে এলো। সে ডানা মেলে দাঁড়াল এবং আনন্দে কয়েকবার ডানা ঝাপটাল।
তারপর বলল, ‘বন্ধুরা, তোমরা আজ আমার অনেক বড় উপকার করলে। তোমাদের এই ভালোবাসা আমি কখনো ভুলব না।’
পিঁপড়েরা হেসে বলল, ‘বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়ানোই তো আসল বন্ধুত্ব।’
কয়েক দিন পর সারসটি আবার সেই মরুভূমিতে ফিরে এলো। এবার তার সঙ্গে ছিল একটি বড় গোলপাতা। পাতাটির ওপর ছিল অনেক মিষ্টি চিনি।
পিঁপড়েরা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘সারস ভাই, এত চিনি কোথা থেকে আনলেন?’
সারস হেসে বলল, ‘তোমরা একদিন আমাকে পানি দিয়েছিলে। তাই আজ তোমাদের জন্য এই মিষ্টি উপহার এনেছি।’
পিঁপড়েরা আনন্দে চারদিকে ছুটতে লাগল।
সারস পাতাটি মাটিতে বিছিয়ে দিল। পিঁপড়েরা দলবেঁধে তার চারপাশে জড়ো হলো। মরুভূমির সেই নির্জন জায়গায় সেদিন ছোট্ট একটি উৎসব বসে গেল।
একটি পিঁপড়ে বলল, ‘সারস ভাই, আপনি অনেক বড়, আর আমরা খুব ছোট। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আমরা সবাই যেন একই পরিবারের।’
সারস মৃদু হেসে বলল, ‘বন্ধুত্বে কে বড় আর কে ছোট, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভালোবাসা, সহযোগিতা আর বিপদের সময় একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই আসল।’
সেদিন থেকে সারস আর পিঁপড়েদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হলো।
শিক্ষা : বিপদের সময় বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোই সত্যিকারের বন্ধুত্ব।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে