নতুন একটা গল্প রচিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গল্পের জবান খুলে গেছে। মানুষের মতো কথা বলছে।
প্রশ্ন করলাম, ‘এখন তুমি কোথায় আছ?’
‘ভিনদেশে।
বইপাড়ার বইয়ের দোকানের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছি। কলেজ রোডের বইয়ের খুপরিতেও।’
‘কী বলছ? এতদূর কীভাবে গেলে?’
‘আমার প্রতিটি শব্দের ভেতর থেকে অজস্র ডানা গজিয়েছে। উড়োজাহাজের চেয়েও বেশি ক্ষিপ্র ওদের গতি।’
‘এত দ্রুতগতি পেয়ে লাভ কী হলো? সে-ই তো শুয়ে আছ স্ট্রিটে।’
‘এটাই লাভ। কারণ আমাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য, পড়ার জন্য এখানে আসে সমঝদার পাঠক, ক্রেতা। তাদের আদর-ভালোবাসা পেয়ে ধন্য আমি।’
‘তারা কি তোমাকে বুঝতে পারে?’
‘অবশ্যই পারে। মানুষের যেমন হুঁশ থাকে, এ জন্যই মানুষ। তবে মানুষ অধিকাংশ সময় হুঁশ হারিয়ে বেহুঁশের মতো কাজ করে। আমি করি না। আমারও মানস আছে। সে অনেক বেশি পরিণত। ধারালো আর প্রজ্ঞাবান।’
‘ওরে বাবা! এত কঠিন কথা তো বুঝতে পারছি না। তোমারও ‘মানস’ আছে?’
‘অবশ্যই আছে।’
‘সেটা কী? বুঝিয়ে বলো।’
‘শব্দটি এসেছে ‘মন’ থেকে। চিত্ত, মানসিক জগৎ বা অন্তর্জগৎ বোঝাতে মানস শব্দটি ব্যবহার করা হয়, আর মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, কল্পনা, চেতনা ও প্রজ্ঞার সমষ্টিকে ‘মানস’ বলা হয়।’
‘আমি তো জানি দৃশ্যমান দেহ মানবের প্রকৃত পরিচয়।’
‘এটা তোমার মূর্খতা। মূর্খ তুমি মানুষের প্রকৃত পরিচয় জানো না; প্রকৃত পরিচয় তার দেহে নয়। প্রকৃত পরিচয় তার মন, চেতনা এবং মানসিক সত্তায়। তবে দেহ ছাড়া সে পরিচয়ের মূল্য নেই, কিন্তু দেহ চলে গেলেও মানস দ্বারা রচিত, সৃষ্ট কাজের মূল্য থেকে যায়।’
‘তোমার কথা শুনে ভালো লাগছে। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে তোমার ক্ষেত্রে কী ঘটে, ঘটবে?’
‘বললাম তো, আমারও ‘মানস’ আছে। শব্দ নয়, শব্দের ভেতরের অর্থই আমার মানস। দেহের মতো বইও একদিন জীর্ণ হবে; কিন্তু ‘মানস’ যদি বেঁচে থাকে, পাঠকের ভেতরেই তা থেকে যাবে। গুণী পাঠক অনুভব করতে পারেন সেই গুপ্তধন।’ লম্বা জবাব দিল এই মুহূর্তে রচিত গল্প।
‘তেমন কোনো পাঠকের সন্ধান কী পেয়েছ?’ আবার প্রশ্ন করলাম-
‘অবশ্যই। দেখ আমার গল্পের মধ্যে তার চিহ্ন আছে। সে উড়ে এসেছে কলেজ রোডে আর আমাকে হাতে নিয়ে ছবি তুলেছে। তুমি কি তাকে ধন্যবাদ দেবে না?’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও