আড্ডা যাকে কবি বানিয়েছে

আলমগীর রেজা চৌধুরী

সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যের সৈয়দ সাহেব মুজতবা আলী বলেছেন, ‘আড্ডা আমাকে লেখক বানিয়েছে।’ আড্ডায় মানুষ নিজেকে নির্মাণ করতে পারে।একজন কবির কবিতা পাঠ

2026-08-15T01:41:55+00:00
2026-08-15T01:41:55+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
সাহিত্য
কবি শহীদ কাদরী
আড্ডা যাকে কবি বানিয়েছে
আলমগীর রেজা চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলা সাহিত্যের সৈয়দ সাহেব মুজতবা আলী বলেছেন, ‘আড্ডা আমাকে লেখক বানিয়েছে।’ আড্ডায় মানুষ নিজেকে নির্মাণ করতে পারে। একজন কবির কবিতা পাঠ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি তার জীবনপাঠ। জীবন এবং জাগতিকতা দিয়ে তিনি একটি কবিতাই নির্মাণ করেন। আর সেই কবিতাটি মহাকালে ঘুরে বেড়ায়। তো বলছিলাম আড্ডার কথা। লেখক, কবি-সাহিত্যিকদের জন্য আড্ডা একটি অনিবার্য বিষয়। তাও বুঝতে শিখি সৈয়দ সাহেবের রচনা পড়ার পর। বোহেমিয়ান এবং ভবঘুরেপনার অনিবার্য ফল হাতেনাতে গ্রহণ করলাম শহীদ কাদরীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর। তিয়াত্তর সালের শেষদিকে। কলেজে পড়ি।

কাব্যঘোর নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাজধানী ঢাকা নগরীর মফস্বলী আগন্তুক। সম্বল কবিতা এবং কবিতা একমাত্র আরাধ্য। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তরুণ যুবা। মুক্তিযুদ্ধের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কবিতা কী? কেমন করে নির্মাণ করতে হয়? সহস্র প্রতিকূলতায় হাবুডুবু-কাতর ডলফিনের মতো ঢাকাকেই ধরে নিয়েছি কবিতার রাজধানী।

আর তার শাসক শামসুর রাহমান থেকে আবুল হাসান। শহীদ কাদরী তখন লিজেন্ড। বাংলা কবিতার আধুনিকতম কবিতাগুলো ততদিনে তিনি লিখে ফেলেছেন। হাজার বছরের বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর শহীদ কাদরী আধুনিকতম কবিসত্তা। বাঁকপ্রতিমা, শব্দচয়ন, উপমা, উৎপ্রেক্ষার উজ্জ্বলতা নিয়ে তার সদর্প উপস্থিতি আমাদের আলোড়িত করেছে সংগত কারণে। কবি হিসেবে শহীদ কাদরী একশভাগ নাগরিক। 

নগর যন্ত্রণার আর্তি, শ্লেষ এমন তির্যকভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন ল্যাম্পপোস্টের তারে ঝুলে থাকা বাদুড়ের দগ্ধ হৃৎপিণ্ডের ক্রন্দন কেউ শুনতে পায়নি। শহীদ শুনেছেন। বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে করেছেন সহস্র উড়ন্ত বল্লম। ঢাকা শহরে তিনি বেড়ে উঠেছেন। কত শত দিনরাত্রির নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলে নিজেকে পোড়াতে পোড়াতে দেশ-মাটি এবং মানুষের ক্লেদাক্ত জীবন আবিষ্কার করেছেন।

আধুনিক জীবনযাত্রার অস্থিরতা, শান্তিহীনতা-দগ্ধ শহীদ কাদরী উচ্চারণ করেছেন-

বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা

মাঝরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,

কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা

ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে ঠিকই

কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...

এভাবেই শহীদ কাদরী জীবনকে ভাসিয়ে দিয়েছেন একটি অস্থির সময়, নাগরিক বৈকল্য আর সরল দেশপ্রেমের মহিমায়। স্বদেশ কিংবা বিদেশ যেখানেই অবস্থান করুন না কেন; চিন্তা মনন, অনুভবে বাংলাদেশের আধুনিক আত্মার সার্থক রূপকল্পের উপলব্ধিতে থেকেছেন।

লেখা শুরু করেছি সৈয়দ সাহেবকে নিয়ে। তার আড্ডাপ্রীতি কিংবদন্তিতুল্য। তাকে নমস্য। নমস্য কবি শহীদ কাদরীকে। কবি হিসেবে যেমন বাংলা কবিতার উজ্জ্বল পুরুষ। তেমনি আড্ডাবাজ হিসেবেও আকাশছোঁয়া সুনাম-দুর্নাম রয়েছে তার।

তিয়াত্তরের শেষ দিকে কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ। রফিক আজাদ আমার পিতৃবন্ধু, বড় ভাইয়ের কলেজ শিক্ষক। যেহেতু আমি কবিতা লিখি, আমার ওস্তাদ রফিক ভাই। গুলিস্তানের রেক্স রেস্তোরাঁয়। কবিতা নিয়ে আমার ভাবনা কম। শ্রোতা হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকি। কবি আবু কায়সার, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি মহাদেব সাহা, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি শাহাদাত বুলবুল, কবি আবিদ আজাদ, কবি শিহাব সরকার, কবি ইকবাল হাসান, কবি আবুল হাসান, গবেষক আফসান চৌধুরীসহ আরও অনেককে ঘিরে কবি শহীদ কাদরীর সাম্রাজ্য। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রেক্সের কাটলেট আর চায়ের সঙ্গে বাংলা কবিতার সবশেষ উত্থান-পতন নিয়ে তোলপাড় করা শূন্যতায় ওই কিশোরোত্তীর্ণ বয়সে কবি শহীদ কাদরীর কবিতার মতো তার আড্ডারও প্রেমে পড়ে যাই।

জি, বিউটি বোর্ডিং থেকে নবাবপুর মডার্ন ফাউন্ড্রির বারান্দার সিঁড়িতে বসে চা পান আর আড্ডা দিতে দিতে রেক্স হয়ে নিউমার্কেটের মনিকোর ওয়েটার কবি রফিক সিদ্দিকীর হাতে চা দিয়ে আড্ডাপর্ব শেষ হতো যখন, ততক্ষণে মধ্যরাত। হ্যাঁ, বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ কবি শহীদ কাদরী এমনতর আড্ডাবাজ ছিলেন।

এভাবে পথ থেকে পথেই নির্মাণ করেছেন আধুনিক বাংলা কবিতার অবিনাশী ধারা। ব্যক্তিগতভাবে যতটা না আমি শহীদ কাদরীর প্রেমে পড়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি মুগ্ধতা কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি রফিক আজাদ, কবি আবিদ আজাদ, কবি আবুল হাসানের প্রতি বিদ্যমান ছিল। আমি গ্রাম থেকে উঠে আসা মফস্বলীয় তরুণ। নাগরিক যন্ত্রণা আমাকে তখনও ক্লেদাক্ত করেনি, স্পর্শ করেনি বিশ্বাসহীনতার বিস্মিত ঘোর।

শুধু কবিতা-কুমারীর ছায়াপথ তৈরি করে প্রলুব্ধ এই আমি। তা যে কত ভয়ংকর! ছিয়াত্তর সালে দেশত্যাগের পর মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত কিংবদন্তি কবি শহীদ কাদরীর মধ্যে

তা বহমান ছিল। দেশ থেকে দেশান্তর ঘুরে বেড়িয়েও উপলব্ধি করেছেনÑ

‘আমার সংরক্ত চুম্বনের অন্তর্লীন আগুনগুলো

পৌঁছে দাও শ্রাবণে আষাঢ়ে রোরুদ্যমান

বিব্রত বাংলায়,

বজ্রে বজ্রে বেজে উঠুক নতজানু স্বদেশ আমার’

অথবা

‘হে নবীনা, এই মধ্য-ম্যানহাটনে বাতাসের ঝাপটায়

তোমার হঠাৎ খুলে যাওয়া উদ্দাম চুল

আমার বুকের পর আছড়ে পড়ল

চিরকালের বাংলার বৈশাখের ঝঞ্ঝার মতন।’

স্বদেশের প্রতি মমতা, বাংলার ঋতুর চারিত্রিক রূপবৈচিত্র্য উপচে পড়েছে বোধের বারান্দায়।

উল্লিখিত আড্ডাগুলোয় বোহেমিয়ান কবি শহীদ কাদরীর সরব উপস্থিতি ছিল। কত না দিনরাত্রি কবির সঙ্গে ঢাকার রাস্তাঘাটে ওই তরুণ বয়সে ঘনিষ্ঠ বিচরণ ঘটেছে, যা আজকের জন্য সমৃদ্ধ জীবন পাঠ। কবি শহীদ কাদরী সম্ভবত আড্ডা দিতে দিতে ৭৪ বছর পার করেছেন।

আজকে বাংলা কবিতা ফলবান কাব্য সন্তানেরা, যারা কাদরীর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তারা কৃতজ্ঞতায় স্বীকার করবেন শহীদ ভাই আমাদের কবিতার জন্য অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিলেন। একজন কবির দীর্ঘ ৭৪ বছর আয়ুকালে মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থ দিয়েই চিরকালীন পথরেখা তৈরি করেছেন।

যা পাঠযোগ্য, উজ্জ্বল, যথার্থ কবিতা চরিত্র নিয়ে শিল্পের কাছে পেয়েছে নানন্দিক মাত্রা। আমরা তা প্রাণভরে গ্রহণ করেছি।

প্রিয় কবি, বাংলা কবিতার প্রতি আপনার পক্ষপাত সর্বজনবিদিত। তা না হলে অমন দরাজ কণ্ঠে অন্যের কবিতা পাঠ করার নজির আপনার মতো একজন কবির ভালোবাসার সরল প্রকাশ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার আধুনিকতম শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হতে অনেক সময় লেগে যেত। 

আপনার ফলবান হাত কবিতাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমরা ধন্য। আপনাকে আমরা মনে রাখব। একদিন রেক্সের এক চিলতে করিডোরে বৃষ্টিমুখর মধ্যরাতে বলেছিলেন, ‘ছেলে কবিতা লেখো? লেখো। অধরা!’ বিশ্বাস করুন কবি, অধরা কবিতা-কুমারীর জন্য আপনার মতোই অপেক্ষা করছি। শহীদ ভাই, ছিয়াত্তরের পর আর আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। এই জীবনে হলো না।

ভ্রাম্যমাণ ডাকটিকেটের মতো দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ালেন, একবারও কি মনে হয়নি, রেক্সের সামনে সিগারেটের দোকানদার টুক্কা মিয়ার অপসৃয়মাণ মুখ? সিগারেট বাকি দেওয়ার পর তার প্রশান্তি হাসি। এক তরুণ কাব্যপ্রেমিকের আশাদীপ্ত মুখাবয়ব। ভালো থাকুন কবি। শান্তিতে থাকুন। আপনাকে নমস্য। দেখা আমাদের না-ই হোক, আরেক জনম যদি পেতাম, আপনার কবিতায় অবগাহন করে সিক্ত হতে চাইতাম। আপনাকে অভিবাদন।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   কবি শহীদ কাদরী  আড্ডা 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: