খুশবন্ত সিং : ৯৯ বছর পর ‘ছাই’ হয়ে শৈশবের গ্রামে ফিরেছিলেন

মারুফ কামরুল

সাহিত্য

একজন রাজনীতি সচেতন লেখকের বুকে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি ঘটনা নতুন দাগ এঁকে দেয়- খুশবন্ত সিংয়ের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি বা হওয়ার

2026-08-15T00:05:08+00:00
2026-08-15T00:06:36+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
সাহিত্য
ফিরে দেখা
খুশবন্ত সিং : ৯৯ বছর পর ‘ছাই’ হয়ে শৈশবের গ্রামে ফিরেছিলেন
মারুফ কামরুল
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৫ এএম  আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ১২:০৬ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একজন রাজনীতি সচেতন লেখকের বুকে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি ঘটনা নতুন দাগ এঁকে দেয়- খুশবন্ত সিংয়ের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি বা হওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে ভারত উপমহাদেশের একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও নাটকীয় মোড় দেশভাগ তাকে নানানভাবে প্রভাবিত করেছে। সেই প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ নোকতা ট্রেন-টু-পাকিস্তান।

কেবল ধর্মের কারণে মাতৃভূমি ত্যাগ, আশ্রয়ের সন্ধানে এদেশ-ওদেশ ছুটে বেড়ানোর সময়ে চারপাশের অস্থিরতা, সন্তান হারিয়ে বুক খালি হওয়ায় মায়ের আর্তনাদ। হেঁটে, গাড়িতে চড়ে বা ট্রেনে সে চলে যাওয়া যেন সারাজীবনের মতো জন্মভিটা ও অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। মানব ইতিহাসের এ ট্রাজেডি নিয়ে যে সব উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ট্রেন-টু-পাকিস্তান একদম আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

স্মৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ব্যথা, জন্মভিটায় ফিরে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা সব সময় তাড়া করে বেড়িয়েছি খুশবন্ত সিংকে। ফলে চিতাভস্ম হয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার মুহূর্ত যেন অলীক সন্ধ্যার মতন ধরা দিয়েছে হাদালির মাটিতে। ১৯৮৭ সালে লেখকের শেষ হাদালি সফরে জন্মভূমির মুসলিমদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘জীবনের মাগরিবে হাদালিতে ফেরাই আমার জন্য হজ ও উমরাহ।’

কিন্তু ভৌগোলিক-রাজনৈতিক নানান জটিলতায় জীবিত অবস্থায় তার শৈশবের গ্রামে ফেরা হয়নি। অবশেষে ২০১৪ সালে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। সৎকারের পর জমে থাকে কেবল কিছু চিতাভস্ম। আর চিতাভস্মের কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না। তাই জন্মের ৯৯ বছর পর এক চিমটি ছাই হয়েই নিজের জন্মভূমির মাটিতে ফিরে গিয়েছিলেন কিংবদন্তি লেখক ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের খুশাব জেলার হাদালি গ্রামে, যে মাটিতে তিনি প্রথম হাঁটতে শিখেছিলেন, অবশেষে সেই মাটির সাথেই মিশে গেলেন তিনি।

সেই এক মুঠো চিতাভস্ম তার শৈশবের বিদ্যাপীঠ হাদালি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের একটি দেয়ালের কুঠুরিতে স্থাপন করা হয়। তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও পাকিস্তানি লেখক ফকির সৈয়দ আইজাজউদ্দিন ভারত থেকে এই চিতাভস্ম নিয়ে যান পাকিস্তানে। লেখকের চিতাভস্মটুকু সিমেন্টের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ালে একটি মার্বেল ফলক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে খোদাই করে লেখা হয়েছে লেখকেরই সেই চিরচেনা পঙ্‌ক্তি: ‘এখানেই আমার শেকড়। আমি এগুলোকে স্মৃতিকাতরতার অশ্রু দিয়ে সিক্ত করেছি।’

১৯১৫ সালে এই হাদালি গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন খুশবন্ত সিং। শৈশবে যে স্কুলের বারান্দায় তিনি দৌড়াদৌড়ি করতেন, প্রায় শত বছর পর সেখানেই তার চিতাভস্ম সমাহিত করার দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। ফলকটি স্থাপনের সময় উপস্থিত ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা, যাদের অনেকে ১৯৮৭ সালে লেখকের শেষ হাদালি সফরের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ফারুক রানা সেই স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সেদিন হাজারো মানুষ তাকে স্বাগত জানাতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের বলেছিলেন, আপনারা যেভাবে মক্কা ও মদিনায় হজে যান, আমার জীবনের মাগরিব বা শেষবেলায় হাদালিতে ফিরে আসাটাই আমার জন্য হজ ও উমরাহ।’

প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘খুশবন্ত সিং ছিলেন এই স্কুলের সেই কৃতি ছাত্র, যিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন এবং আজীবন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করেছেন।’

খুশবন্ত সিং আধুনিক ভারতের ইতিহাসের সব উত্থান-পতনের সাক্ষী ছিলেন— ভারত বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি অবস্থা এবং অপারেশন ব্লু স্টার। তার বিখ্যাত উপন্যাস ট্রেন টু পাকিস্তান-এ তিনি দেশভাগের সেই ভয়াবহ ও করুণ ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আইজাজউদ্দিন বলেন, ‘দিল্লিতে যখন লেখকের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়, খুশবন্ত সিং হাদালিতে সমাহিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন।’

ফলকটি স্থাপনের পর আইজাজউদ্দিন বলেন, ‘আমি খুশবন্ত সিংয়ের এক অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সীমান্ত পেরিয়ে আমার সাথেই তার প্রিয় হাদালিতে ফিরে এসেছেন।’ লেখকের চিতাভস্ম স্থাপনের সময় আইজাজউদ্দিন শিখদের প্রাতঃকালীন প্রার্থনা ‘জপজি সাহেব’ এবং সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা ‘রেহরাস’ পাঠ করেন, যা খুশবন্ত সিং নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন।’

হাদালির সেই পুরনো বাড়িটি আজ আর নেই, সেখানে কেবল বুনো ঝোপঝাড়ের রাজত্ব। কিন্তু যে চিতাভস্মটুকু স্কুলের দেয়ালে মিশে গেল, তা যেন দেশভাগের সীমানা পেরিয়ে এক চিরন্তন শেকড়ের টানে ফিরে আসা সন্তানের গল্প বলে যায়। খুশবন্ত সিং তার নিজের লেখা এপিটাফে বলেছিলেন, যেন কেউ তার জন্য চোখের জল না ফেলে, কিন্তু হাদালির ধূলিকণায় তার মিশে যাওয়া যেন স্মৃতিকাতরতার এক অশ্রুভেজা অধ্যায় হয়েই রইল।


মূল : জুলকারনাইন তাহির


  বিষয়:   খুশবন্ত সিং 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: