কোনো কোনো লেখক শুধু গল্প বলেন না, গল্পের ভেতর লুকিয়ে থাকা অন্ধকারটাকেও পাঠকের সামনে টেনে নিয়ে আসেন। সেই অন্ধকারের দিকে চোখ রাখা সহজ কাজ নয়। সেখানে থাকে মানুষের ভয়, বিশ্বাস, লোভ, অসহায়ত্ব, ক্ষমতার নির্মমতা, আর নিজের অজান্তে নিজেরই বানানো শৃঙ্খল।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন সেই বিরল লেখকদের একজন, যিনি মানুষের এই অন্ধকারকে ভয় পাননি। বরং সাহিত্যের আলো হাতে নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন সেই অন্ধকারের গভীরে। তার কলমে গ্রামবাংলার মাটি, মানুষের জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার, সামাজিক অনাচার আর ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো এমনভাবে মিশে গেছে যে, তার সাহিত্য পড়তে গিয়ে শুধু একটা গল্পের পরিণতি জানা হয় না, নিজের সমাজের মুখটাও হঠাৎ আয়নার মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
তাই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে শুধু ‘লালসালু’র লেখক বলে চিনে নেওয়াটা তার সাহিত্যিক সত্তার প্রতি এক রকম অবিচারই। তিনি এমন একজন কথাশিল্পী, যিনি মানুষের বিশ্বাসকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু বিশ্বাসের আড়ালে যখন প্রতারণা, শোষণ আর ক্ষমতার ব্যবসা গড়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে নির্মম প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।
১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে জন্ম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর। এমন এক সময়ে, যখন ভারতবর্ষের সমাজ আর রাজনীতি প্রবল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বাবা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, আর সেই চাকরিসূত্রেই শৈশব ও কৈশোরে তাকে ঘুরতে হয়েছে বাংলার নানা অঞ্চলে, নানা শহরে। মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, ঢাকা, কৃষ্ণনগর, হুগলী, চুঁচুড়া, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, এসব জায়গার মানুষের জীবন, ভাষা, সংস্কৃতি আর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল তার ছোটবেলাতেই।
ফলে তার সাহিত্যিক চোখ কোনো একটা নির্দিষ্ট ভূগোলে আটকে থাকেনি। খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার মানুষকে, তাদের বিশ্বাস, তাদের ভয়, আর সবচেয়ে বড় কথা, বেঁচে থাকার লড়াইটাকে।
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য আর শিল্পের প্রতি টান ছিল তার। ছবি আঁকার পাশাপাশি বই পড়া আর লেখালেখির নেশাটা ক্রমশ গভীর হয়েছে। ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।
কলেজজীবনেই প্রকাশ পায় তার প্রথম গল্প ‘সীমাহীন এক নিমেষে’। সেই সময় থেকেই তার ভেতরে গড়ে উঠছিল এমন এক সাহিত্যিক সত্তা, যা প্রচলিত রোমান্টিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নের দিকে তাকাতে চাইছিল। পরে ‘নয়নচারা’, ‘লালসালু’, ‘চাঁদের অমাবস্যা’, ‘কাঁদো নদী কাঁদো’, ‘দুই তীর’, ‘বহিপীর’, ‘সুড়ঙ্গ’, এসব রচনায় সেই অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে আজও যে উপন্যাসটা সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়ায়, তার নাম ‘লালসালু’। ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার নির্মাণ, কুসংস্কারের সামাজিক বিস্তার, আর ধর্মের নামে মানুষের ওপর আধিপত্য কায়েম করার যে নির্মম ছবি তিনি এই উপন্যাসে এঁকেছেন, তা আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।
‘লালসালু’ প্রকাশ পায় ১৯৪৮ সালে। দেশভাগের পরপরই প্রকাশিত এই উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ যে সমাজকে দেখেছিলেন, সেটা গ্রামীণ মুসলিম সমাজের একটা নির্দিষ্ট বাস্তবতা। কিন্তু তার প্রশ্নটা কোনো একটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল না। তার আঘাত ছিল ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি বানানোর বিরুদ্ধে।
লালসালুর মজিদ তাই শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটা প্রবণতার প্রতীক। সে জানে মানুষের ভয় কোথায়, দুর্বলতা কোথায়, অন্ধবিশ্বাস কোথায়। জানে, মানুষের কাছে ধর্ম শুধু বিশ্বাস নয়, নিরাপত্তার আশ্রয়ও বটে। সেই আশ্রয়ের জায়গাটাকেই সে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি বানিয়ে নেয়।
উপন্যাসে একটা পরিত্যক্ত কবরকে ঘিরে তৈরি হয় পবিত্রতার আবহ, আর সেই আবহের ওপর দাঁড়িয়েই মজিদ ধীরে ধীরে গড়ে তোলে নিজের কর্তৃত্ব। মানুষের বিশ্বাস তার কাছে আত্মিক সত্য নয়, সামাজিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার। এখানেই ‘লালসালু’র সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা। ধর্মকে অস্বীকার করা হয়নি এখানে, কিন্তু ধর্মের নামে যে ব্যবসা চলে, তার মুখোশটা খুলে দেওয়া হয়েছে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহসটা ঠিক এখানে। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তিনি উপহাস করেননি, কিন্তু প্রশ্ন তুলেছেন, সেই বিশ্বাসের ওপর কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? মানুষ কি নিজের বিবেক দিয়ে বিশ্বাস করছে, নাকি ভয় দেখিয়ে তাকে বিশ্বাস করানো হচ্ছে? ধর্ম কি তাকে মুক্ত করছে, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হয়ে উঠছে? একজন মানুষ কি সত্যিকার অর্থে ধার্মিক, নাকি ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে সে নিজের সামাজিক ক্ষমতা বাড়িয়ে নিচ্ছে? ‘লালসালুর প্রতিটি স্তরে এই প্রশ্নগুলো ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়।
মজিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ধর্মীয় জ্ঞান নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তার নির্মম বোঝাপড়া। সে জানে, অজানা জিনিসের ভয় মানুষের ভেতর কতটা গভীরে গেঁথে থাকে। জানে, অলৌকিকতার প্রতি মানুষের টান কতটা প্রবল। জানে, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ভেতর বাস করা মানুষের কাছে একজন ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী কত সহজে আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। আর সেই আশ্রয় যখন প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, বিশ্বাস তখন ধীরে ধীরে দখল করে নেয় স্বাধীন চিন্তার জায়গাটা।
এখানেই ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য কেবল ধর্মীয় কুসংস্কারের সমালোচনা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতার মনস্তত্ত্বের এক গভীর পাঠ। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেখানে ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যেখানে শুধু বলা হয়েছে বলেই কোনো কথাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়, সেখানে প্রতারণার পথ প্রশস্ত হয়। ধর্মীয় পরিচয় যখন বিবেকের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। এই বিপদটা ওয়ালীউল্লাহ বহু দশক আগেই দেখতে পেয়েছিলেন।
লালসালুর মজিদকে তাই শুধু একজন ধর্মব্যবসায়ী হিসেবে দেখলে তার চরিত্রের গভীরতাটা ধরা পড়ে না। সে একই সঙ্গে প্রতারক, ভীতু আর ক্ষমতালোভী। তার নিজের ভেতরেও আছে অনিশ্চয়তা, সে জানে যে ক্ষমতা সে গড়ে তুলেছে তা সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তাই তার সবচেয়ে বড় ভয় সেই সত্য প্রকাশ হয়ে যাওয়া। এই ভয়ই তাকে আরও কঠোর, আরও নির্মম করে তোলে। মানুষের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ যত বাড়ে, নিজের ভেতরের ভয়ও তত গভীর হতে থাকে।
ওয়ালীউল্লাহ এখানে মানুষের মনোজগতের একটা চমৎকার দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। যে অন্যকে ভয় দেখায়, সে নিজেও অনেক সময় নিজের তৈরি করা ভয়েরই বন্দি হয়ে থাকে।
মজিদের পাশে আমেনার উপস্থিতিটাও গুরুত্বপূর্ণ। তার চরিত্র দিয়ে ওয়ালীউল্লাহ দেখিয়েছেন, একজন নারী কীভাবে একটা পুরুষতান্ত্রিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাঠামোর ভেতর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে। আমেনা শুধু মজিদের স্ত্রী নয়, সে সেই সমাজেরই এক প্রতিনিধি, যেখানে নারীর জীবন, বিশ্বাস আর সিদ্ধান্তও পুরুষের কর্তৃত্বেই নিয়ন্ত্রিত। ফলে ‘লালসালু’ শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নয়, ক্ষমতার নানা স্তরে মানুষের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধেও একটা গভীর উপন্যাস।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যিক শক্তি ঠিক এখানে, তিনি কোনো বক্তৃতা দিয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করেননি। চরিত্র তৈরি করেছেন, পরিস্থিতি গড়ে তুলেছেন, মানুষের আচরণের ভেতর দিয়ে সত্যকে বের করে এনেছেন। তার সাহিত্য পাঠকের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না, বরং এমন একটা জায়গায় পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে তাকে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই কারণেই তার সাহিত্য সময়ের পরিবর্তনে পুরোনো হয় না।
তার সাহিত্যজগতে ধর্মীয় গোঁড়ামি যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের অস্তিত্বের গভীর সংকটও। ‘চাঁদের অমাবস্যা’ কিংবা ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ পড়লে বোঝা যায়, ওয়ালীউল্লাহ শুধু সামাজিক বাস্তবতার লেখক ছিলেন না। মানুষের অন্তর্গত ভয়, অপরাধবোধ, একাকিত্ব, অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, নৈতিক দ্বন্দ্ব, এসবও তাকে গভীরভাবে টানত। বাইরের পৃথিবীর পাশাপাশি মানুষের ভেতরের পৃথিবীটাও তিনি অনুসন্ধান করেছেন। এ কারণেই তার সাহিত্য একই সঙ্গে সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক।
তার সময়ের বাংলা সাহিত্যে এমন অনুসন্ধান ছিল ব্যতিক্রম। প্রচলিত গল্প বলার ধরনটাই তিনি ভেঙেছেন, ভাষাকে সংযত করেছেন, চরিত্রের মনোজগতকে গল্পের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করেছেন। তার বাক্য কখনো খুব সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণতার নিচে জমে থাকে গভীর অস্বস্তি। কোনো দৃশ্য হয়তো খুব ছোট, কোনো ঘটনা খুব সামান্য, কিন্তু তার রেশ পাঠকের মনে অনেকদিন থেকে যায়। এই সংযমই তার গদ্যের অন্যতম সৌন্দর্য।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবনও ছিল নানা দেশ, নানা সংস্কৃতি, নানা অভিজ্ঞতায় ভরপুর। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করার পর পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও তথ্য বিভাগের নানা দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দিল্লি, সিডনি, জাকার্তা, লন্ডন, বন, প্যারিস- তৎকালীন পৃথিবীর আধুনিক সব শহরে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ প্রবাসজীবন তার সাহিত্যিক দৃষ্টিটাকে আরও বিস্তৃত করে দিয়েছে। শুধু বাংলার মানুষকে নয়, দেখেছেন উপনিবেশ উত্তর বিশ্বের পরিবর্তন, সাম্রাজ্যবাদ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আর মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকেও।
জীবনের চলতি পথে সিডনিতে পরিচয় হয় ফরাসি তরুণী অ্যান-মারি লুই রোজিতা মার্সেল তিবোর সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে তাদের বিয়ে হয়। অ্যান-মারি পরে পরিচিত হন আজজা নাসরিন নামে, আর হয়ে ওঠেন ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। ‘লালসালু’র ফরাসি অনুবাদের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তার নাম। এক অর্থে, ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য বাংলা ভাষার সীমা পেরিয়ে ইউরোপের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর একটা দরজা খুলে দিয়েছিল তার এই প্রবাসজীবনই।
কিন্তু বিদেশের চাকচিক্যময় কূটনৈতিক জীবন তাকে নিজের মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তার সাহিত্যিক চোখ বারবার ফিরে গেছে সেই বাংলায়, যেখানে মানুষের জীবন লড়াই করে দারিদ্র্য, ভয়, বিশ্বাস আর সামাজিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে। দূরদেশে বসেও তিনি লিখে গেছেন নিজের শিকড়ের মানুষের কথা। এ যেন ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে স্মৃতির ভেতর ফিরে যাওয়া এক লেখকের দীর্ঘ যাত্রা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ফ্রান্সে বসেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি বাংলাদেশের পক্ষে। বন্ধু বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে ইউরোপের বুদ্ধিজীবী মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজে যুক্ত থাকেন। নিজের আর্থিক সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সহায়তা সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন। তার স্ত্রীও অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণায়। যে মানুষটা সারাজীবন লিখেছেন মানুষের স্বাধীনতা আর মর্যাদার প্রশ্ন নিয়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংকটময় মুহূর্তে তার এই অবস্থান আসলে তার সাহিত্যিক বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রকাশ।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্য ওঠার আগেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ। ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর ফ্রান্সের মিউদনে মারা যান সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে রেখে যান এমন এক সাহিত্যভুবন, যার বিস্তার তার জীবনের দৈর্ঘ্যের চেয়ে ঢের বড়। তার মৃত্যু একটা যুগের জন্য ক্ষতি ছিল ঠিকই, কিন্তু তার সাহিত্য যেন মৃত্যুকেও অস্বীকার করে বেঁচে রইল।
আজ যখন ধর্মের নামে বিভাজন বাড়ছে, কুসংস্কারকে প্রশ্ন করাটাই অনেকের কাছে অপরাধ হয়ে উঠছে, মানুষের সরল বিশ্বাসকে ব্যবহার করে গড়ে উঠছে ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতার কাঠামো, তখন ‘লালসালু’ নতুন করে ফিরে আসে আমাদের সামনে।
মজিদ যেন সময়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আবার প্রশ্ন করে, মানুষের বিশ্বাসের ওপর কার অধিকার? কী পবিত্র, কী অপবিত্র, তা ঠিক করে দেবে কে? মানুষের ভয়কে নিজের ক্ষমতায় বদলে নেবে কে? আর মানুষ নিজে কবে ফিরে দাঁড়াবে নিজের বিবেকের কাছে?
এই প্রশ্নগুলোর কারণেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো লেখক নন, তিনি দাঁড়িয়েছেন ধর্মের নামে মানুষের ওপর আধিপত্যের বিরুদ্ধে। বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নন তিনি, বিশ্বাসকে ব্যবসায় বদলে ফেলার বিরুদ্ধে। মানুষের আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করেননি, বরং সেই আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করে যারা মানুষকে অন্ধ করে রাখে, তাদের মুখোশটাই খুলে দিয়েছেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য তাই কোনো নির্দিষ্ট সময়ের দলিল নয়। এটা মানুষের স্বাধীন বিবেকের পক্ষে এক দীর্ঘ সাক্ষ্য। তার চরিত্রগুলো মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার সবসময় বাইরে থাকে না, অনেক সময় সে বাস করে মানুষের ভেতরেই। আর সেই অন্ধকার তাড়াতে দরকার এমন একটা আলো, যা শুধু চোখে পড়ে না, বিবেকেও আগুন ধরিয়ে দেয়।
সেই আগুনই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য। লালসালুর মাজারের লাল কাপড়ের আড়ালে তিনি যে অন্ধকার দেখিয়েছিলেন, সেটা কোনো একটা গ্রামের অন্ধকার নয়, কোনো একটা সময়েরও নয়, সেটা মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে ব্যবহার করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চিরন্তন অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে ওয়ালীউল্লাহর কলম হয়ে উঠেছিল এক অগ্নিশিখা।
আজকের পাঠকের জন্য তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় এটাই, কোনো বিশ্বাসকে ভয় না পেয়ে প্রশ্ন করতে শেখা, কোনো কর্তৃত্বকে অন্ধভাবে মেনে না নেওয়া, আর মানুষের বিবেককে সব রকম কৃত্রিম ক্ষমতার ওপরে রাখা। কারণ যে সমাজে প্রশ্ন করার আলো নিভে যায়, সেখানে অন্ধকার খুব সহজেই পবিত্রতার পোশাক পরে ফিরে আসে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সেই অন্ধকারের পোশাকটাই খুলে দেখিয়েছিলেন। তাই তিনি শুধু লালসালুর লেখক নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের সেই অগ্নিশিখা, যিনি বিশ্বাসের ভেতর থেকে অন্ধবিশ্বাসকে, ধর্মের ভেতর থেকে ধর্মব্যবসাকে, আর মানুষের জীবনের ভেতর থেকে মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন। তার কলম থেমে গেছে বহু বছর আগে, কিন্তু প্রশ্নগুলো থামেনি, বরং সময় যত এগিয়েছে, সেগুলো তত গভীর হয়েছে।
এই কারণেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আজও ফিরে আসেন আমাদের কাছে। কোনো পাঠ্যপুস্তকের বাধ্যতামূলক অধ্যায় হয়ে নয়, বরং নিজের সমাজকে নতুন করে দেখার এক আয়না হয়ে। তার সাহিত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অন্ধকার যত পুরোনোই হোক না কেন, তাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য একটা সত্য উচ্চারণই কখনো কখনো যথেষ্ট। আর সেই সত্য উচ্চারণের নামই বোধহয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।
সময়ের আলো/কেআই