আমি লেওন শহরের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ক্যাথিড্রাল বেসিলিকা দে আসুনসিওনের ভেতর দিককার আঙিনায় দাঁড়িয়ে ইন্তেজারিতে জেরবার হই। পুরোনো জমানায় কিছুকাল লেওন ছিল নিকারাগুয়ার গ্র্যান্ড ক্যাপিটাল। হালফিল ভিন্ন শহর মানাগুয়ায় হালফ্যাশনের রাজধানী গড়ে উঠলেও লেওন কিন্তু হারায়নি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মর্যাদা। এ শহরে সারা বছরজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় একাধিক কবি সম্মেলন, চিত্র প্রদর্শনী ও জ্যাজ মিউজিকের জমকালো ফেস্টিভ্যাল।
আজ থেকে সাড়ে চারশ বছর আগে, স্পেন থেকে জাহাজ ভাসিয়ে আসা ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা এ নগরীকে দলিল-দস্তাবেজে জাঁক করে উল্লেখ করতেন, ‘সান্তিয়াগো দে লস কাবায়েরোস দে লেওন’ বলে। বর্তমানে কেবল লেওন নামে পরিচিত নগরীটির ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রিও চিকিতা বলে ছোট একটি নদী। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মাত্র এগারো মাইল দূরে, পুরোনো জমানার স্থাপত্যকলায় ভরপুর নগরটি থেকে খালি চোখে দেখা যায় একাধিক আগুন পাহাড়। রাত-বিরাতে লোডশেডিং হলে, কোনো কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা উত্তপ্ত জিহ্বা নীলিমায় ছুড়ে দেয় স্ফুলিঙ্গের সোনালি ছটা।
আমি সপ্তাহতিনেক হলো লেওনের ‘কাসা দে লস পোয়েটাস বা দকবিদের সরণি’ নামে খ্যাত একটি গেস্ট হাউসে বসবাস করছি। আমার ঘুরে বেড়ানোর রেস্ত ফুরিয়ে আসছে, তাই ভাবছিলাম, চুটপাট ফিরে যাব যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু দিনদুয়েক আগে ক্যাসিনোর তাসবাজিতে রয়েল ফ্লাশ পেয়ে যাওয়ার মতো হাতে এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু ডলার। নিকারাগুয়াতে বেড়াতে আসার মাসকয়েক আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের মরফতে কানসালট্যান্সি করতাম আফগানিস্তানে। হিসাব বিভ্রাটের জন্য ওখানে আমার কিছু টাকা বখায়া ছিল, বিষয়টা আমি ভালো করে জানতাম না। সপ্তাহখানেক আগে, অডিটের সময় ধরা পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় তা আমার অ্যাকাউন্টে জমা দেয়।
এ অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির অর্থ হচ্ছে, আমি লেওন নগরীতে ব্যাংককার্ড ইস্তেমাল করে টাকা-পয়সা একসেস করতে পারব, ঘটনাটি সেলিব্রেশনের দাবি রাখে। সুতরাং তোফা মুডে আছি। এখনই পাততাড়ি গুটিয়ে নিকারাগুয়া ছেড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। ভাবছি এ অর্থসম্পদকে হিল্লা ধরে, লেওন নগরীর কাছাকাছি একটি গোলাকার আগ্নেয়গিরি মমোতমবোতে হাইক করতে যাব।
চুনকাম করা বেসিলিকার বিশাল অট্টালিকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে, আমি শত বছরের পুরোনো ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে পরিচিত এ ইমারতটিকে নিরিখ করি। সেন্ট্রেল আমেরিকার সবচেয়ে বিরাট এ ধর্মীয় স্থাপনার বর্তমান ভবনটি তৈরি হয়, গুয়াতেমালার স্থপতি ডিয়েগো হোসে পোরেসের তত্ত্বাবধানে ১৭৬২ সালে। জননী মরিওমের বিপুল মর্যাদায় মহিয়ান এ ক্যাথিড্রালটির যে আঙিনায় আমি এ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি, তা থেকে সামান্য দূরে আছে নিকারাগুয়ার স্বনামধন্য ব্যক্তিদের অনেক পাথরে বাঁধানো সমাধি। আমি ওখানে পয়গম্বর ঈসার (আ.) বিরাট এক মূর্তির তলায় মি. ব্র্যান্ডন মারফিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।
মি. মারফির সঙ্গে দিনতিনেক আগে আমার পরিচয় হয়, কায়া দে লস পোয়েটাস নামক যে গেস্ট হাউসে আমি বসবাস করছি ওখানে। গেস্ট হাউসে শনিবারের সান্ধ্য অনুষ্ঠান ‘মোমেন্তো ফেলিজ’ বা ‘হ্যাপি মোমেন্টে’ তিনি এসে হাজির হয়েছিলেন বিস্তর হাঁকডাক করে। ভদ্রলোক কয়েক দিন আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্টের বাল্টিমোরে ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। তার আগে তিনি কাজ করেছেন ফোর্ড প্রশাসনে। তার স্ত্রী কোনো কারণে সুইসাইড করলে, মি. মারফি চাকরি থেকে প্রিম্যাচিওরলি রিটায়ার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্টপেস জিন্দেগি তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠছে, তাই লেওনে এসেছেন রিলাক্সভাবে কিছুটা সময় কাটাতে।
মোমেন্তো ফেলিজে গেস্টদের খাবার-দাবার নিয়ে আসার রেওয়াজ আছে। কোনো কোনো মেহমান আবার হ্যাপি মোমেন্টের পার্টিতে এসে কিচেনে খাবার বা পানীয় তৈরি করে নেন। তো আমি কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ব্ল্যান্ডারে ইয়োগার্ট ও কাটা-আম দিয়ে তৈরি করছিলাম, ভদকার যৎসামান্য ফোঁড়ন দেওয়া ম্যাঙ্গো লাচ্ছি। মি. মারফি রেড ও হোয়াইট মিলিয়ে ঝলমলে র্যাপিং পেপারে মোড়া গোটা চারেক ওয়াইনের বোতল এনে রাখেন কাউন্টারে। শুধু এক্সপেনসিভ ওয়াইনই না, তিনি ব্রিফকেসের মতো একটি ব্যাগে করে নিয়ে এসেছেন ক্রিস্টালের বেশ কয়েকটি ওয়াইন গ্লাসও।
ঠিক তখনই কিচেনে এসে ঢুকে সিনোরিতা আদ্রিয়ানা। সে খুব অন্তরঙ্গভাবে জানতে চায়— আমি কী ধরনের পানীয় তৈরি করছি। আদ্রিয়ানা সিল্কের সিথ্রু মিনি স্কার্টের সঙ্গে চামড়ার থাইহাই বুট পরে আছে। একটি রেড ওয়াইনের বোতল খুলতে খুলতে তার উছলে ওঠা শরীরে যেন মি. মারফির দুচোখ লক হয়ে যায়। তিনি তাকে এক গ্লাস কিয়ানতি ক্লাসিকো অফার করলে, সিনোরিতা আদ্রিয়ানা পাত্রের ছলকানো তরলের বর্ণবিভা পরখ করে দেখতে দেখতে চোখেমুখে ইনোসেন্ট ভাব ফুটিয়ে তুলে জানতে চায়, ‘মি. মারফি, হোয়াট ইজ স্পেশাল আবাউট কিয়ানতি?’
জবাব দিতে গিয়ে রুপালি চুলের মারফি মহোদয় পয়লা সিনোরিতার গর্জিয়াস পা দুটি লেদারের হাইবুট ও স্বল্প ঝুলের স্কার্টের সঙ্গে কী রকম চার্মিংভাবে মানিয়েছে, সে সম্পর্কে ব্যাপক তারিফ করেন। তারপর নিজেও এক গ্লাস কিয়ানতি ঢেলে ইতালি থেকে আমদানি করা ওয়াইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন। ইতালির টুসকানি এলাকায় এ ধরনের সম্ভ্রান্ত শরাব তৈরি হচ্ছে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে। কিয়ানতি তৈরি করতে প্রয়োজন পড়ে, সাংগিওভেস নামে বিশেষ এক ধরনের দ্রাক্ষার। ক্লাসিকো কেটাগরির কিয়ানতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পাক্কা দুই বছর অন্ধকার তল-কুঠুরিতে তা ঔকউডের ব্যারোলে জারিত হয়, তখন তার ডিপ রুবি রেড কালারে মিশ্রিত হয় ফ্লোরাল নোটস।
আদ্রিয়ানা মি. মারফির দেওয়া তথ্যে ভারাক্রান্ত হয়ে, চোখমুখ আরও ইনোসেন্ট করে হেসে তাকে ‘গ্রাসিয়াস সিনিওর’ বলে ধন্যবাদ দিয়ে পানীয়তে ঠোঁট ছোঁয়াতে চায়। তার গ্রিবা বেঁকে যেতেই অস্থির হয়ে মারফি সাহেব এসপানিওলে বলেন, ‘কারিনো’ বা ‘ডার্লিং, ইউ আর লুকিং সো স্পেশাল, কামঅন— আমি তোমার গ্লাসে এখনই ঝুলিয়ে দিচ্ছি একটি চার্ম।’ মি. মারফি সিলভারের টুকরো ও রঙিন কাচে তৈরি চার্ম তার গ্লাসের ডাটিতে ঝুলিয়ে দিলে, আদ্রিয়ানা চুমুক দিয়ে ‘ভেরি হারমোনিয়াস ফ্লেভার’ বলে পানীয়ের তারিফে উচ্ছল হয়। সে অতঃপর সামাজিক চুমোর জন্য বাড়িয়ে দেয় তার মুখমণ্ডল। মি. মারফি ‘আমর আ প্রিমেরা ভিসতা,’ বা ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ বলে তার গণ্ডদেশে ঠোঁট ছোঁয়ান।
সপ্তাহদুয়েক আগে, কাসা দে লস পোয়েটাসের হ্যাপি মোমেন্টের অন্য একটি পার্টিতে আদ্রিয়ানার সঙ্গে আমার পয়লা দেখা হয়। তারপর আমরা একত্রে চার্চে যাই, লেওনের একটি ট্রেন্ডি ক্যাফেতে বসে সারি নৈশভোজ, তারপর আমন্ত্রিত হই তার অ্যাপার্টমেন্টে। লেওন শহরের কাছে আছে মমোতমবো বলে প্রাকৃতিক দৃশ্যের পরিমাপে জাদুময় একটি আগ্নেয়গিরি। ওখানে আমার সঙ্গে হাইক করতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে সে উৎসাহিত হয়ে জবাব দেয়, ‘দিস ইজ অ্যা কুল আউডিয়া, আই অ্যাম গোয়িং টু গিভ ইট অ্যা সিরিয়াস থট।’
আমি পরিকল্পনা করেছিলাম যে— আজকের হ্যাপি মোমেন্টে আদ্রিয়ানার সঙ্গে মমোতমবোতে যাওয়ার লজিস্টিকস নিয়ে কথা বলব। কখন রওনা হওয়া যায় তার ডেট, এবং যানবাহন ও গাইড জোগাড় ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নেব। কিন্তু মি. মারফি যেভাবে তার মনোযোগকে কবজা করে আছেন, তাতে আমি বাতচিত করার তেমন একটা সুযোগ পাই না। সুতরাং তার ওপর স্পষ্টত বিরাগভাজন হই।
আজ এ মুহূর্তে আমি বেসিলিকার সামনে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ানার অপেক্ষা করছি। সে আমাকে এখানে আসতে বলেছে। বেসিলিকার তলায় আছে মধ্যযুগে খোঁড়া টানেল, তা এ ক্যাথিড্রালকে সংগোপনে যুক্ত করেছে নগরীর অন্যান্য গির্জা ও মনস্টারীর সঙ্গে। আদ্রিয়ানা বলেছিল, তার জানাশোনা ধর্মযাজককে ধরে টানেলের সংলগ্ন একটি কুঠুরিতে নামার বন্দোবস্ত করতে পারবে। তখন মোমবাতি জ্বালানোর অজুহাতে আমরা দেখতে পাব, শত বছরের পুরোনো একটি বিবর্ণ ফ্রেস্কো। আমি জানি যে— রাতে প্রচুর পান করলে বা সামান্য পরিমাণে কোকেন শুঁকলে সকালবেলা আদ্রিয়ানার হার্টের সমস্যাটা তীব্র ব্যথায় জানান দিয়ে ওঠে। তখন সে পেইন কিলারের ঘোরে স্রেফ পড়ে থাকে কাউচে। পেইন কমলেও অনেকক্ষণ কথা বলার বা বাইরে বেরুনোর প্রেরণা পায় না। আজকেও তার শরীর খারাপ হলো কী? ভাবতে ভাবতে কুসুমের কোরক কুরে খাওয়া কীটের মতো আমার মধ্যে সক্রিয় হয় টেনশন।
বেসিলিকার কবরগাহের দিকে ঋজু ভঙ্গিতে হাঁটতে গিয়ে সড়কের দিকে তাকান মি. মারফি। ধবধবে সাদা গল্ফ শার্ট ও ক্যানভাসের কেডসে তাকে অ্যাথলিটদের মতো সুস্থ ও সবল দেখায়। তিনি হাতে কী একটা ধরে আছেন, বেশ দূরে দাঁড়িয়ে আছি— তাই তার হাতে ধরা বস্তুটি কী তা ঠিক বুঝতে পারি না। মি. মারফি অস্থির চোখে বেসিলিকার দেয়ালে লাগানো জননী মরিয়মের মূর্তি ও জানালার রঙিন কাচের শার্সিতে কী যেন খুঁজেন। তার ভাবগতিককে চাকরি খোঁজা মানুষের মতো চঞ্চল দেখায়।
আমি আদ্রিয়ানাকে টেক্সট করি, কিন্তু কোনো জবাব পাই না। প্যাডেলের চাপে চলমান চাকার মতো অনিশ্চয়তার টেনশনজনিত স্ট্রেস আমার মধ্যে চূর্ণিত হতে থাকে। আমি বেসিলিকার চারপাশে পায়চারি করি। চলে আসি পেছন দিকের আঙিনায়। এখানে ধর্মীয় স্থাপনাটির দেয়াল রং জ্বলে কালচে হয়ে এসেছে। আমি কয়েকজন মানুষকে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখি। একজন তরুণী মোবাইলে কথা বলছে। একজন ক্লান্ত পুরুষ বেসিলিকার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন সিমেন্টে বাঁধানো পেভমেন্টে। স্লিভলেস টপ পরা দুজন নারী দ্রুত হেঁটে যায় ভিন্ন দিকে। সবাই নিজের ধান্দা নিয়ে এমন মশগুল হয়ে আছে যে— কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। আমি নেমে আসি সড়কে। ঠিক সড়কের পাশে হলুদ, নীল ও কমলা রঙে পেইন্ট করা কয়েকটি ঘরবাড়ি।
অনেক দিন হতে চলল আমি হোটেল, ব্যাকপ্যাকার লজ কিংবা গেস্ট হাউসে বসবাস করছি। এ ঘরগুলোর বর্ণাঢ্যতা আমার মাঝে ছোট্ট একটি বেগুনি রঙের বাংলোতে বাস করার বাসনা জাগ্রত করে। আমি মোড় ফিরে চলে আসি বেসিলিকার কমপাউন্ডের প্রান্তিকে।
গাড়িঘোড়ার চলাচলহীন সড়কের ঠিক মধ্যিখানে, কাঠের ফ্রেমের ভেতর রং মেশানো করাত কলের গুঁড়া দিয়ে একজন শিল্পী তৈরি করছেন বড়সড়ো একটি চিত্র। নিকারাগুয়ায় সীমানা সান্তা বা হলি উইক বলে পরিচিত খ্রিস্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতি-রিচ্যুয়েলে শোরগোল পবিত্র সপ্তাহটি এসে যাচ্ছে। তাই চিত্রী আগেভাগে সড়কের একটি নির্জন পরিসর দখল করে স্ট্রিট-আর্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে যিশু খ্রিস্টের ভাবসমৃদ্ধ চিত্রটি নিরিখ করে দেখি।
তখনই খেয়াল করি যে— তিনটি ছোট ছোট বাচ্চা আমাকে অবাক হয়ে দেখছে! আমি এক-পা দু-পা করে সড়ক ধরে সামনে এগোতে থাকি। বাচ্চা তিনটি আমাকে অনুসরণ করতে করতে এসপানিওলে বলে, ‘কে এক্সট্রনেও টুরিস্টা... বা কী রকম আজব এক বিদেশি।’ এসে পড়ি দিনদরিদ্র এক বাড়ির সামনে। বাচ্চা তিনটি তার আঙিনায় দাঁড়িয়ে পড়ে। আমি তাদের দিকে তাকাতেই একজন ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ভিনো দে পাইস কিয়েন সাবে,’ বা ‘কোন দেশ থেকে এসেছে— তা কে জানে।’
আমি হাঁটতে হাঁটতে এবার ফিরে আসি বেসিলিকার মূল আঙিনায়। মি. ব্র্যান্ডন মারফিকে আবার দেখতে পাই। তিনি যিশু খ্রিস্টের মূর্তি বসানো ক্রুশ কাঠের ভারী আইকন হাতে হেঁটে যাচ্ছেন কবরগাহের বাঁধানো সমাধিগুলোর ভেতর দিয়ে। তাকে দেখতে পেয়ে— হ্যাপি মোমেন্টের পার্টিতে তার আচরণ আবার ফিরে আসে আমার করোটিতে। আমি মমোতমবোতে হাইকিংয়ে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে মাটির তলা থেকে ‘পিয়েদরা ডে ভলকান’ বা ‘আগ্নেয়গিরির পাথর’ খুঁজে বের করার পরিকল্পনা আদ্রিয়ানাকে গুছিয়ে বলছিলাম। সে দারুণ আহ্লাদী ভঙ্গিতে গ্রিবা বাঁকিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘যদি তুমি জেসপার বা এমেথিস্ট এ ধরনের কোনো মহার্ঘ্য পাথর পাও, তা হলে আমার একটি কন্ডিশন আছে, তুমি শর্তটি রাখবে কী?’ আমি জবাব দিই, ‘অল রাইট সুইটহার্ট, লেটস হিয়ার হোয়াট ইজ ইয়োর কন্ডিশন?’ সে চোখমুখ সিরিয়াস করে বলে, ‘হোয়াট আই ওয়ান্ট ইজ স্ট্রেইট অ্যান্ড সিম্পল, সবচেয়ে সুন্দর পাথরটি তুমি আগ্নেয়গিরির নিচের লেকে আমার সামনে ছুড়ে ফেলবে।’
‘দিস ইজ স্ট্রেঞ্জ, হোয়াই ইউ ওয়ান্ট মি টু ডু দিস?’ বলে আমি রিয়েকশন দেখালে সে আমার শার্ট খামচে ধরে কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আই ওয়ান্ট ইউ টু ফিল দ্য পেইন, কোনো কিছু যা তুমি ভালোবাসো তা হাতে পেয়ে স্বেচ্ছায় জিনিসটি বিসর্জন দেবে ঠিক আমার সামনে, আই ওয়ান্ট টু সি ইউ ফিল দ্য পেইন রাইট ইন ফ্রন্ট অব মি।’
আদ্রিয়ানার বিচিত্র আচরণের কথা ভাবতে ভাবতে আজকে বেসিলিকা দে আসুনসিওনে আমাকে অপেক্ষা করতে বলে তার এখানে না আসার বিষয়টি নিয়ে ভাবি। আমার অবচেতনের কড়িকাঠে একটি উদ্বেগের ঘুণপোকা যেন করে তৈরি করছে ছিদ্র। কেন জানি মনে হয়, পেছন থেকে কে যেন আমাকে অবজার্ভ করছে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই, চোখ পড়ে কবরগাহে, মি. মারফির ছায়াকে পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করি। তবে কি তিনি ঘণ্টাঘরের আড়াল থেকে আমাকে নজর করছেন?
সময়ের আলো/এসএকে