বিপ্রতীপ : রাজনীতির বাইরে নয়, মানুষের ভেতরের গল্প

রোকন ওসমান

সাহিত্য

রাজনীতি সাধারণত সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে। ক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মতাদর্শের সংঘাত কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ এসবই রাজনীতির পরিচিত ভাষা। কিন্তু সেই

2026-08-22T20:03:18+00:00
2026-08-22T20:03:49+00:00
 
  শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
সাহিত্য
বিপ্রতীপ : রাজনীতির বাইরে নয়, মানুষের ভেতরের গল্প
রোকন ওসমান
প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০৩ পিএম  আপডেট: ২২.০৮.২০২৬ ৮:০৩ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি : সংগৃহীত
রাজনীতি সাধারণত সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে। ক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মতাদর্শের সংঘাত কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ এসবই রাজনীতির পরিচিত ভাষা। কিন্তু সেই রাজনীতি যখন একটি পরিবারের ভেতরে ঢুকে পড়ে, দুই বন্ধুর সম্পর্ক বদলে দেয় কিংবা একজন সাধারণ মানুষকে এমন কোনো সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায়, যার সঙ্গে প্রকাশ্য রাজনীতির সরাসরি সম্পর্ক নেই, তখন রাজনীতিকে আর কেবল রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। সেটি হয়ে ওঠে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। এই জায়গাটিই সামনে আনতে চায় সোনিয়া তাসনিমের নতুন উপন্যাস ‘বিপ্রতীপ’।

২০২৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অবসর প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হতে যাওয়া বইটি একটি সামাজিক উপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় বিষয় রাজনীতি হলেও, উপন্যাসটির গুরুত্ব রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহে নয়; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে মানুষের সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস ও জীবনযাপনের ভেতরে প্রভাব ফেলে, সেই জায়গায়।

রাজনৈতিক কলামে একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করা যায় তথ্য, ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে। সেখানে লেখকের কাজ হলো ঘটনাকে বোঝানো। কথাসাহিত্যে কাজটি ভিন্ন। সেখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শুধু ব্যাখ্যা করলে হয় না; সেটিকে চরিত্রের ভেতর দিয়ে অনুভব করাতে হয়। একজন মানুষ কেন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, কেন কোনো সম্পর্ক থেকে দূরে সরে গেলেন, কেন নিজের বিশ্বাসের সাথে নিজের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলো- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় মানুষের মনস্তত্ত্বের ভেতরে।

‘বিপ্রতীপ’-এর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক ঘটনাকে বর্ণনা করা নয়, বরং রাজনীতির অভিঘাতকে মানুষের জীবনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।

এই দিক থেকে উপন্যাসটির পটভূমি হিসেবে লেখকের পূর্ববর্তী কাজগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সোনিয়া তাসনিম দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাস, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে লিখছেন। মুক্তিযুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতি কিংবা বিশ্বশক্তির পরিবর্তনশীল ভারসাম্য- এসব বিষয় নিয়ে তার প্রবন্ধ ও কলাম বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ‘বিপ্রতীপ’ সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা আর কলামের মতো বিশ্লেষণের বিষয় হয়েই থাকছে না। এবার সেটি গল্পের উপাদান। ফলে প্রশ্নটি হলো- তথ্য কতটা আছে, তার চেয়ে বেশি সেই তথ্যের ভেতরে থাকা মানুষগুলো কতটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এখানেই কথাসাহিত্যের সাথে গবেষণা ও কলামের পার্থক্য।

সোনিয়া তাসনিমের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যেও এই বিষয়বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘মায়ের গয়নার বাক্স’, ‘অসমাপ্ত’, ‘আগন্তুক’, ‘ফোর্থ ফ্লোর’, ‘বিস্তীর্ণ জলছবি’, ‘কেনিয়া ভয়ংকর’, ‘বীক্ষণ’, ‘Z-ভেনম’ ও ‘কেরালার গহীনে’-এর মতো বইগুলোতে রহস্য, ভ্রমণ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে বারবার। ফলে ‘বিপ্রতীপ’এর মতো একটি সামাজিক - রাজনৈতিক উপন্যাস তার লেখালেখির সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো বাঁক নয়; বরং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার ধারারই আরেকটি রূপ।

তার নজরুল গবেষণার ক্ষেত্রটিও এখানে আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। ‘আমিই নজরুল’, নজরুল চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন ও চিন্তা নিয়ে তার গবেষণার বিষয়গুলোর মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা রয়েছে। গবেষণার বিষয় আর উপন্যাসের বিষয় এক নয়, কিন্তু মানুষের সমাজ, চিন্তা ও সময়কে বোঝার যে আগ্রহ গবেষণায় প্রয়োজন, তার সাথে কথাসাহিত্যেরও একটি সম্পর্ক আছে।

তবে ‘বিপ্রতীপ’এর মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত লেখকের আগের কাজ বা পুরস্কারের তালিকা দিয়ে করা যাবে না। বইটি প্রকাশের পর পাঠক দেখতে চাইবেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্কটি লেখক কতটা গভীরভাবে ধরতে পেরেছেন। কারণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব অনেক সময় রাজনীতির ভাষায় প্রকাশিত হয় না। একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব ফুটে উঠতে পারে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সংকটে, কোনো তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায়, দুই বন্ধুর মতাদর্শগত দূরত্বে কিংবা কোনো মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিক সংকটে। রাষ্ট্রের বড় ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট জীবনের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়।


‘বিপ্রতীপ’ সেই ছোট জীবনের ভেতর দিয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দেখার চেষ্টা হলে, বইটির পাঠও কেবল রাজনৈতিক উপন্যাসের পাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন এটি হয়ে উঠতে পারে সমকালকে বোঝার আরেকটি সাহিত্যিক প্রচেষ্টা। সোনিয়া তাসনিমের সাহিত্যচর্চার একটি বক্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক ‘সাহিত্য আমার কাছে কেবল শব্দের শিল্প নয়; এটি সময়কে লিপিবদ্ধ করার এক নৈতিক দায়বদ্ধতা।’

‘বিপ্রতীপ’ সেই দায়বদ্ধতাকে কীভাবে গল্পে রূপ দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কলামে যে সময়কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, গবেষণায় যে সময়কে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, এবার সেই সময় যদি চরিত্রের জীবন, সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে তাহলেই উপন্যাসটি তার নিজস্ব সাহিত্যিক জায়গা তৈরি করতে পারবে।

সুতরাং ‘বিপ্রতীপ’-এর আগ্রহের জায়গা শুধু এর লেখক কে, সেটি নয়; বরং একটি রাজনৈতিক সময়কে মানুষের গল্পে রূপ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়, সেটিই।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   বিপ্রতীপ  রাজনীতি  উপন্যাস  গ্রন্থমেলা 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: