দুখু মিয়া থেকে কাজী নজরুল ইসলাম

ফারুক হোসেন সজীব

সাহিত্য

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি জানো- বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছোটবেলায় কেমন ছিলেন?তার ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। নামটি

2026-08-29T15:27:12+00:00
2026-08-29T15:27:12+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
সাহিত্য
দুখু মিয়া থেকে কাজী নজরুল ইসলাম
ফারুক হোসেন সজীব
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি জানো- বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছোটবেলায় কেমন ছিলেন? তার ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। নামটি শুনলে মনে হতে পারে, ছেলেটি বুঝি খুব দুঃখী! আসলে দুখু মিয়ার জীবনজুড়ে যেমন ছিল অভাব আর সংগ্রাম, তেমনি তার মন ছিল কৌতূহল, সাহস, আনন্দ আর স্বপ্নে ভরা। সেই ছোট্ট দুখু মিয়াই একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি- কাজী নজরুল ইসলাম।

মাটির পথের দুখু : ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন নজরুল। গ্রামের মাটির পথ, সবুজ মাঠ, গাছপালা, পাখির ডাক আর সাধারণ মানুষের জীবন ছিল তার শৈশবের পরিচিত জগৎ।

নজরুলের পরিবারে ছিল আর্থিক কষ্ট। ছোট বয়সেই তাকে সংসারের নানা দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। মক্তবে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন। কখনো রুটির দোকানেও কাজ করেছেন। কিন্তু অভাব তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

দুখু মিয়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তার ‘কৌতূহলী মন’। তিনি শুনতে ভালোবাসতেন গান, গল্প ও নানা ধরনের লোককথা। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা গল্প আর গানের ভেতর তিনি যেন খুঁজে পেতেন এক অন্যরকম পৃথিবী।

লেটোর দলে দুখু : একদিন দুখু মিয়ার পরিচয় হলো ‘লেটোর দলের’সঙ্গে। লেটো ছিল বাংলার লোকনাট্যের একটি জনপ্রিয় ধারা। সেখানে গান, কবিতা, অভিনয় ও হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে নানা গল্প পরিবেশন করা হতো। ছোট্ট দুখু মিয়া সেই জগতে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি শুধু দর্শক হয়ে থাকলেন না। লেটোর দলে যোগ দিলেন। গান লিখলেন, সুর দিলেন, অভিনয় করলেন। অল্প বয়সেই তার লেখার হাত ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পাওয়া গেল। ভাবো তো, যে ছেলেটি কখনো মসজিদে আজান দিচ্ছে, কখনো রুটির দোকানে কাজ করছে, আবার সুযোগ পেলেই গান-কবিতা লিখছে- তার মনের ভেতর কত বড় একটি পৃথিবী তৈরি হচ্ছিল!

লেটোর দলের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে নজরুলের সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। লোকজ ভাষা, ছন্দ, গান ও সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে তার যে গভীর পরিচয় তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে এই সময়ের বড় ভূমিকা ছিল।

সৈনিক থেকে সাহিত্যিক : কৈশোর পেরিয়ে নজরুল একসময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাজীবনে তিনি করাচিতে অবস্থান করেন। সেখানেও তার হাতে থেমে থাকেনি কলম। তিনি গল্প ও কবিতা লিখতে শুরু করেন। সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থাতেই তার লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।

একসময় তিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। তখন থেকেই বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে তার সক্রিয় পথচলা শুরু হয়। কিন্তু নজরুল ছিলেন অন্যরকম কবি। তিনি শুধু ফুল, পাখি আর ভালোবাসার কথা লিখে থেমে থাকেননি। চারপাশের অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও মানুষের কষ্ট তাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তাই তার কলম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের অস্ত্র।

যে কবিতায় কেঁপে উঠল বাংলা : নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্যে যেন নতুন এক ঝড় উঠল। তার কণ্ঠে শোনা গেল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান। তিনি লিখলেন সাম্যের কথা, মানুষের মর্যাদার কথা। তার কবিতায় উঠে এলো শ্রমজীবী মানুষের জীবন, দরিদ্রের কষ্ট, নারীর অধিকার এবং ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক। ‘সাম্যবাদী’, ‘দারিদ্র্য’, ‘মানুষ’সহ তার বহু কবিতা আজও মানুষকে ভাবায়।

নজরুল বিশ্বাস করতেন- মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। ধর্মের নামে বিভেদ, ঘৃণা কিংবা বৈষম্য তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। হিন্দু-মুসলমানের মিলন ও সম্প্রীতির কথা তিনি তার কবিতা ও গানে বারবার বলেছেন।

শিশুদের নজরুল : তবে ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যদি ভাবো নজরুল শুধু প্রতিবাদ আর বিদ্রোহের কবি, তা হলে কিন্তু ভুল করবে। শিশুদের জন্যও তিনি লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা ও ছড়া।

লিচুচোর, খুকি ও কাঠবিড়ালি, প্রভাতী, ঝিঙেফুল, চড়ুই পাখি- এসব কবিতায় আছে শিশুমনের দুষ্টুমি, বিস্ময়, আনন্দ আর কল্পনার জগৎ। ‘লিচুচোর’ পড়লে মনে হয়, দুষ্টু ছেলেদের একটি দল বুঝি লিচুগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে! আর ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’তে ছোট্ট একটি প্রাণীকে ঘিরে ফুটে ওঠে শিশুর কৌতূহল ও আনন্দ।

নজরুল বুঝেছিলেন, শিশুদের পৃথিবী বড়দের পৃথিবীর মতো নয়। সেখানে একটি কাঠবিড়ালি হতে পারে পরম বন্ধু, একটি লিচুগাছ হয়ে উঠতে পারে দুরন্ত অভিযানের কেন্দ্র, আর ভোরের আলোয় ফুটে ওঠা ফুলও হতে পারে এক আশ্চর্য গল্পের শুরু। তাই তার শিশুতোষ লেখাগুলো আজও এত আপন লাগে।

শুধু কবি নন : কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন এবং সাংবাদিকতাও করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, সাম্যবাদী, সর্বহারা, দোলনচাঁপা ও চক্রবাক।

তার উপন্যাসের মধ্যে বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর গান? : গানের জগতেও নজরুল ছিলেন অসাধারণ। প্রেম, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, ভক্তি, মানবতা- জীবনের কত রকম অনুভূতি যে তার গানে ধরা পড়েছে! তার লেখা ও সুর করা গানগুলো আজ ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিত।

শেষ জীবনের নীরবতা : জীবনের শেষদিকে গুরুতর অসুস্থতার কারণে নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন থেমে যায়। একসময় যে কবির কলমে ঝড় উঠত, সেই কবি আর আগের মতো লিখতে বা কথা বলতে পারতেন না। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ তাকে সসম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং তাকে ‘জাতীয় কবির মর্যাদা’ দেওয়া হয়।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।

দুখু মিয়ার কাছ থেকে কী শিখবে? : ছোট্ট বন্ধুরা, দুখু মিয়ার জীবন শুধু একজন কবির জীবনকাহিনি নয়। এটি স্বপ্ন দেখার গল্প, সংগ্রাম করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। অভাব তাকে থামাতে পারেনি। নানা কাজ করতে হয়েছে, জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে- তবু তিনি তার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি।

তোমাদের জীবনেও হয়তো কখনো কঠিন সময় আসবে। কোনো কাজে ব্যর্থ হবে, কেউ হয়তো তোমার স্বপ্নকে ছোট করে দেখবে। তখন দুখু মিয়ার কথা মনে রেখো। চুরুলিয়ার সেই ছোট্ট ছেলেটি জানতেন না, একদিন তার লেখা কবিতা কোটি মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। জানতেন না, তার গান বাঙালির হৃদয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবে। শুধু জানতেন- তার ভেতরে কিছু বলার আছে, কিছু করার আছে। সেই সাহসই তাকে দুখু মিয়া থেকে ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ করে তুলেছিল। তাই আজ যখন তোমরা ‘লিচুচোর’ পড়ে হাসবে, ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ পড়ে আনন্দ পাবে কিংবা ‘বিদ্রোহী’র পঙ্‌ক্তিতে বুকের ভেতর সাহস অনুভব করবে, তখন একবার মনে করো সেই ছোট্ট ছেলেটিকে- চুরুলিয়ার মাটির পথে যে দুখু মিয়া স্বপ্ন দেখত।

দুখু মিয়া আজ নেই। কিন্তু তার স্বপ্ন, তার গান, তার কবিতা আর তার সাহস- আজও বেঁচে আছে আমাদের মাঝে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   দুখু মিয়া  কাজী নজরুল ইসলাম 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: