দেশে দেশে মাতৃভাষা আন্দোলন

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

বাংলাদেশের মতোই বিশ্বের নানা দেশে মাতৃভাষা রক্ষা ও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোতে সাধারণত ছাত্ররা নেতৃত্ব

2026-02-21T11:24:21+00:00
2026-02-21T12:13:02+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
দেশে দেশে মাতৃভাষা আন্দোলন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৪ এএম  আপডেট: ২১.০২.২০২৬ ১২:১৩ পিএম
দেশে দেশে মাতৃভাষা আন্দোলন
বাংলাদেশের মতোই বিশ্বের নানা দেশে মাতৃভাষা রক্ষা ও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোতে সাধারণত ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়েছে, তবে জনসাধারণও পাশে দাঁড়িয়েছে। 

দক্ষিণ আফ্রিকা

দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কিছু মিল রয়েছে। দুটিতেই আন্দোলন শুরু হয় ছাত্রদের নেতৃত্বে। পার্থক্য হলো, বাংলাদেশের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়েছিল, আর দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলনে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছিল।

সোয়েটো অঞ্চল তৎকালীন ট্রান্সভাল প্রদেশের অন্তর্গত, জোহানেসবার্গের কাছে অবস্থিত। ১৯৭৬ সালে দেশটি শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের অধীনে ছিল। এ অঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের সংখ্যাগুরু হলেও তাদের প্রতি সরকার কোনো গুরুত্ব দিত না। স্কুল-কলেজে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম ছিল জুলু এবং ইংরেজি। তাছাড়া ক্ষমতাসীন শ্বেতাঙ্গদের ভাষা ছিল আফ্রিকানস। তারা চেয়েছিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মও এই ভাষা শিখে ক্ষমতায় থাকতে পারে। তাই সরকার কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের আফ্রিকানস ভাষা শেখানোর পরিকল্পনা করে।

১৯৭৪ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, আর ১৯৭৬ সালে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা চালু থাকবে, আর আফ্রিকানস ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে। গণিত ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়গুলো আফ্রিকানস ভাষায় পড়ানো হবে, সাধারণ বিজ্ঞান ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলো ইংরেজিতে।

সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ব্যস্ত রাখা, যাতে তারা নিজেদের মাতৃভাষার বাইরে এগোতে না পারে। তবে কৃষ্ণাঙ্গরা এই নীতিকে বুঝতে বেশি সময় লাগায়নি। তারা দেখেছিল যে, এই ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা কখনও তাদের উপকারে আসবে না।

১৯৭৬ সালের ১৬ জুন আন্দোলন প্রথম প্রকাশ পায়। ‘চেতনার জাগরণ’ নামক ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে ছাত্ররা অরল্যান্ডো ওয়েস্ট সেকেন্ডারি স্কুল থেকে অরল্যান্ডো স্টেডিয়াম পর্যন্ত মিছিল করে। মিছিলে উপস্থিত ছিল ১৫–২০ হাজার ছাত্রছাত্রী। পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ছাত্ররা হাল ছাড়েনি। পুলিশের গুলিতে ২০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৯০৭ জন আহত হয়। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পর সরকার নিজের নীতি থেকে সরে আসে। শিক্ষামাধ্যমের এই ভাষা আন্দোলনের প্রভাব দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের অবসান এবং ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়। প্রতি ১৬ জুনকে ‘জাতীয় যুব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ভারত

ভারতের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্বাধীনতার আগের সময় থেকেই শুরু। ১৯৩৭ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে কংগ্রেস সরকার হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করে। তামিলরা এই নীতির প্রতিবাদ করে। ১৯৩৮ সালের ৩ জানুয়ারি তামিলরা রাজাগোপালচারীর বাসভবনের সামনে প্রতিবাদ সভা করে, যার ফল ১২৭০ জন গ্রেফতার হয়। এরপর ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে আবারও হিন্দি বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা হয়, কিন্তু তীব্র আন্দোলনে তা ব্যর্থ হয়। 

স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে গৃহীত করা হয়। ১৯৬৫ সালে হিন্দি সরকারি ভাষা হিসেবে কার্যকর হওয়ার সময় তামিলরা রাষ্ট্রীয় দিবসকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে। শহরগুলোতে বিক্ষোভ ও দাঙ্গা হয়, পোস্ট অফিস, রেলস্টেশন, টেলিগ্রাফ অফিস ভাঙচুর হয় এবং পুলিশের ওপরও হামলা চালানো হয়। এতে কমপক্ষে ৬৩ জন নিহত হয়, তবে প্রকৃত সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দি ও ইংরেজি দুই ভাষাকেই ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এছাড়া বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরিদের ভাষা সংরক্ষণ আন্দোলনও রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।

আমেরিকা

ইউরোপীয়দের আগমনের আগে আমেরিকায় প্রায় এক হাজার ভাষার প্রচলন ছিল। কলোনিয়াল শাসন আমেরিকান নেটিভ ভাষাগুলোকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করেছে। ১৯৬০-৭০ এর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় নেটিভ আমেরিকান ভাষার সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্দোলন ও আলোচনার পর ১৯৯০ সালের ৩০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে নেটিভ ও আদি ভাষা সংরক্ষণের জন্য আইন প্রণয়ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি কোনো সরকারি ভাষা নয়, যদিও দক্ষিণের কিছু অঙ্গরাজ্যে স্প্যানিশ ভাষার প্রভাব বাড়ছে।

কানাডা 

কুইবেক রাজ্যে ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষীরা স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি জানায়। ১৯৮০ ও ১৯৯৫ সালে ভাষা আন্দোলন হয়, যদিও তীব্রতা ক্রমশ কমে।

বেলজিয়াম, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মেক্সিকো ও চীন

বিভিন্ন অঞ্চলে ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ, আরবি-ফারসি-তুর্কি, স্প্যানিশ-ইংরেজি, ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। এই আন্দোলনের লক্ষ্য সাধারণত মাতৃভাষার সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।


/ইউএমএইচ

Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: