এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের জন্য যে প্রথম প্রয়োজন তা নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার উপলব্ধি করেছে। তাই নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। বিশ্বঅর্থনীতির অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া। এ আবেদনটি দেশের অর্থনৈতিক
পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত চিঠি সিডিপির কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোভিড-পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতিমূলক ধাপগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কায় সেই লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক মুদ্রানীতির কঠোরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়নমূলক কাঠামোগত সংস্কারও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
চিঠিতে আরও জানানো হয়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সময়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধাসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের নীতিতে পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ছায়া দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এসব কারণেই বাংলাদেশ বর্তমান পরিস্থিতিতে তিন বছরের জন্য ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা ও সময়ের বৃদ্ধি চেয়েছে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি।
সিডিপির বৈঠকটি আগামী ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের অনুরোধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। এরপর প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হবে, যা দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তুত হতে পারে। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিডিপি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে ফলাফল জানা যাবে।
গত বছর জাতিসংঘ বাংলাদেশের জন্য একটি মূল্যায়ন পরিচালনা করেছিল। তাতে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলেও কোনো স্পষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়নি। বরং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াটিকে দেশের জন্য ‘চ্যালেঞ্জিং’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত স্থগিতের আবেদনটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন।
এ আবেদনটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যবর্তী এক বাস্তবতা নির্দেশ করে। দেশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারগুলো সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হলেও একই সঙ্গে একটি নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপটি হয়তো ভবিষ্যতের জন্য নতুন দিশা দেখাতে পারে, যেখানে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের অর্থনৈতিক গতি বজায় রাখা সম্ভব হবে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক নতুন সরকার কোনো কালক্ষেপণ না করে শুরুতে এলডিসি উত্তরণকে তার সময় বাস্তবতা উপলব্ধিতে এনে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দেশের জন্য একটি কল্যাণকর পদক্ষেপ। সিডিপি এটি মূল্যায়ন করলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। সেখানে প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট হবে। ফলে বন্ধু রাষ্টগুলো নিজেদের পক্ষে রাখতে এখনই নতুন সরকারকে সহযোগিতা করবে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রতি অতীতের মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে-এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/এনএ