ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৬৮টি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
যদিও জোটগত মোট আসন হলো ৭৭টি কিন্তু শুধু সংখ্যায় নয় ভূমিকায়ও ভিন্নতা দেখাতে চায় দলটি। অতীতের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী রাজনীতির ধারা থেকে সরে এসে গঠনমূলক সমালোচনা, নীতিনির্ধারণে প্রভাব এবং সংসদীয় বিতর্কে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে জামায়াত।
এরই ধারাবাহিকতায় সংসদে সক্রিয় ভূমিকার প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটি। দলীয় এমপিদের, বিশেষ করে প্রথমবার নির্বাচিতদের সংসদীয় কার্যক্রম, বিল-বাজেট, স্থায়ী কমিটির কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দিতে কর্মশালার আয়োজন করে দলটি। এমনকি ভবিষ্যতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন হলে সেখানে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হতে পারে, সে বিষয়েও ধারণা দেওয়া হয় অংশগ্রহণকারীদের।
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, নির্বাচিত এমপিদের বেশিরভাগই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও তারা অতীতের মতো নিষ্ক্রিয় বা ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে না। দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ বিরোধিতা এবং জাতীয় স্বার্থে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
একই সঙ্গে সংসদে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক কারবারি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। কেবল বিরোধিতা নয়, গঠনমূলক সমালোচনা, নীতিতে প্রভাব বৃদ্ধি এবং দেশের উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণোচ্ছল রাখার অগ্রণী আভাস দিচ্ছেন দলটির নেতারা। এ ছাড়া বিরোধী দল হিসেবে তরুণ সংসদ সদস্যরা তাদের বাকপটুতা দিয়ে সংসদীয় বিতর্ক জমিয়ে তুলবে বলেও আশা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যৌক্তিক বিরোধিতার পাশাপাশি কার্যকর সংসদ গঠনে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করবেও প্রত্যাশা করেন তারা।
জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দলটি। জামায়াতের আমিরসহ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ৮০ শতাংশই নতুন, যাদের আগে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। এই বাস্তবতায় নতুন সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে গিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা দিতে ‘সংসদীয় পাঠ’ নামে দুই দিনব্যাপী বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করে দলটি।
মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন আল ফালাহ মিলনায়তনে বুধ ও বৃহস্পতিবার এই ‘ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম’ চলে। সেই কর্মশালায় সংসদে একটি সৃজনশীল ও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালনের লক্ষ্যেই দলীয় এমপিদের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
পাঁচটি পৃথক সেশনে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সংসদীয় প্রটোকল, ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত ভূমিকা এবং বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কর্মশালায় সেশনগুলো পরিচালনা করেন সংসদ সচিবালয়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা, সাবেক আমলা, নির্বাচন কমিশনের সাবেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
কর্মশালায় অংশ নেন জামায়াতের একাধিক সংসদ সদস্য জানান, বিরোধী দল হিসেবে সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা ও আইনি বিতর্কে অংশ নিতে এই কর্মশালা তাদের বেশ আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন) সময়ের আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী থেকে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে নতুন মুখের হার খুব বেশি। আমি নিজেও নতুন। তাই প্রথমবার সংসদে গিয়ে কার কী ভূমিকা এবং কী ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হবে সেসব বিষয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
মূলত এটি ছিল দলের এটা ইন্টারনাল প্রোগ্রাম। তাই সংসদে একটি সৃজনশীল ও গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালনের এমন একটা কর্মশালার প্রয়োজন ছিল।
সংসদে বিরোধী দলে কেমন ভূমিকা পালন করবে জামায়াত এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অতীতের মতো গৃহপালিত বিরোধী দলের মতো হব না। সংসদে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে সেই যাত্রা অব্যাহত রাখব। যেখানে সম্ভব একমত হয়ে কাজ করব, প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে কথা বলব এবং সবসময় সাধারণ মানুষের স্বার্থে ও অধিকার রক্ষায় আমরা সোচ্চার ভূমিকা পালন করব ইনশাআল্লাহ।
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, সংসদে গিয়ে সংসদ সদস্যদের কাজ কী হবে, বিশেষজ্ঞরা সে বিষয়েই কর্মশালায় বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সংসদে গিয়ে দেশের উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখব। জনগণ আমাদের নির্বাচিত করেছেন। তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। জনগণ দুর্নীতিমুক্ত দেশ চায়, আমরা সেই অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে ধারণ করব এবং সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলোকে তুলে ধরব। একই সঙ্গে ন্যায়-ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ব্যাপারে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সংসদ সদস্যদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়াতে যে বিষয়গুলো জানা উচিত, সে বিষয়ে কমপক্ষে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতেই এ ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করা হয়।
যেহেতু আমরা জাতীয় সংসদে ক্রেডিবল রোল প্লে (গ্রহণযোগ্য ভূমিকা পালন) করতে চাই। তাই অতীতের মতো কেবল সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে একটা পজিটিভ ও সৃজনশীল ভূমিকা রাখতেই নির্বাচিত সাংসদদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে ১১ দলীয় জোটের নেতারা দায়িত্বশীল ভূমিকার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণে প্রভাব রাখবে বলেও জানান এই জামায়াত নেতা।
সময়ের আলো/এআর