পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন ও ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে ছাত্রদের ওপর যৌন নিপীড়ন (বলাৎকার) করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এদিকে, অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক গা ঢাকা দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অকৃতকার্য করার ভয় দেখানো এবং অকৃতকার্য ছাত্রদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়।
এসব ঘটনায় দুইজন শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও মানবাধিকার কর্মী ডনাইপ্রু নেলীসহ গত ১০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজ স্যার আমাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। আমাদের নিতম্বে হাত দেয়। স্যারের রুমে যেতে বলেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার ও দুর্বল ছাত্রদের টার্গেট করেন। পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। এরই মাঝে ১৫ জনের অধিক ছাত্রকে বলাৎকার করার অভিযোগ উঠেছে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা অভিযোগ করে বলেন, তার ছেলে নবম শ্রেণিতে পাঁচটি বিষয়ে খারাপ ফলাফল করে। এ অবস্থায় প্রধান শিক্ষক তাকে দশম শ্রেণিতে উন্নীত না করার কথা জানান। একইসঙ্গে প্রধান শিক্ষক তাকে পরামর্শ দেন যে, তিন নিজে গাইড দেবেন। সেই অনুযায়ী তার ছেলেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর প্রধান শিক্ষকের কাছে পড়তে পাঠানো হয়। তবে তার ছেলের সঙ্গে অনৈতিক ও খারাপ কাজ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে তার ছেলে আর ওই শিক্ষকের কাছে যেতে চায় না। এ ঘটনায় তিনি ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, বিদ্যালয়ের একাধিক কর্মচারীও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন।
বিদ্যালয়ের এক কর্মচারী অভিযোগ করে বলেন, অফিস সময়ের বাইরে সন্ধ্যায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নিয়ে দরজা-গেট বন্ধ করে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করা হয়। বাধা দিলে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। তার মতো আরও কয়েকজন কর্মচারী একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের অস্থায়ী অফিস সহায়ক শিল্পী রাণী দে বলেন, স্কুল ছুটির পর একাধিক শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডাকা হতো এবং কক্ষের গেট তালাবদ্ধ রাখা হতো। তিনি বিষয়টি অন্য শিক্ষকদের জানালে তাকে ‘ছোট কর্মচারী’ বলে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তিনি অভিভাবকদের অবহিত করলে তাকে নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ যাওয়ার পর তাকে পুনর্বহাল করা হয়।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ রেজাউল বলেন, হেডমাস্টার বিরুদ্ধে ছাত্ররা ডিসি স্যারের বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন এমন খবর পেয়েছি। তবে, কী বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন সে বিষয়ে জানি না।
বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি স্কুলে অনুপস্থিত এবং আমাকেও ওনার অনুপস্থিততে মৌখিক বা লিখিত কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেননি।
জেলা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. জসিম উদ্দিন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত লজ্জার ও নিন্দনীয়। আমার কাছে যদি কোন অভিযোগ আসে তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অবহিত করব।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, বিদ্যালয়ের ভুক্তভোগী ছাত্ররা লিখিত অভিযোগ করেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত চলমান আছে। যদি প্রমাণিত হয় একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রের সঙ্গে এমন আচরণ ও অপরাধের জন্য শুধু স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত নয়, উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত।
এসব বিষয়ে জানতে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের অফিসে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এক সপ্তাহ ধরে তার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।