দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রচলিত ভিভিআইপি সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় বিলাসিতার ধারা ভেঙে একের পর এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় দাফতরিক কাজ পরিচালনা, গাড়িবহর কমিয়ে আনা, সাইরেন ও কঠোর প্রটোকল পরিহার, সচিবালয়ে সময়মতো অফিস করা এমন নানা পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই সাদাসিধে জীবনযাপন ও প্রশাসনিক কড়াকড়িতে প্রতিফলিত হচ্ছে তার পিতা জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নেতৃত্বের ছায়া; যা কেবল ব্যক্তিগত আচরণের পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা দেওয়ারও ইঙ্গিত বহন করছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি সরকারি গাড়ির পরিবর্তে ব্যক্তিগত গাড়ি, নিজস্ব চালক এবং নিজের অর্থে কেনা জ্বালানি ব্যবহার করে দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। জনভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে প্রধানমন্ত্রীর বহরে ১৩-১৪টি গাড়ি থাকত, সেখানে এখন তা চারটিতে সীমিত করা হয়েছে। শপথগ্রহণের পর প্রথম কার্যদিবসে তিনি নিজের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করেননি; তবে রাষ্ট্রীয় বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিদেশি অতিথিদের সফরে প্রয়োজন অনুযায়ী পতাকা ব্যবহার করা হবে।
সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে মন্ত্রিসভার বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে ভিআইপি চলাচলের কারণে সড়কে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি না হয়। প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রচলিত ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি সরকারের সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট গ্রহণ করবেন না বলেও জানানো হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সচিবালয়ে অবস্থান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অফিস করা, সকাল ঠিক ৯টায় উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত সময় মেনে কাজ পরিচালনা এসব এখন তার নিয়মিত চর্চা। পোশাকেও তিনি সরলতা বজায় রাখছেন; সাধারণ সাদা শার্ট ও প্যান্ট পরেই দাফতরিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলাচল করাও তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একদিন সচিবালয় থেকে গুলশানের বাসভবনে ফেরার সময়ও তিনি সিগন্যাল মেনেই চলেছেন। তার ঘনিষ্ঠদের মতে, পোশাক-আশাক ও খাদ্যাভ্যাসেও তিনি সাধারণ জীবনধারাকেই প্রাধান্য দেন।
বিএনপির একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তারেক রহমানের এসব পদক্ষেপে তার পিতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন সাদাসিধে জীবনযাপন, সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতার জন্য পরিচিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে দূরে থাকতেন, সরাসরি মানুষের সমস্যা শুনতেন এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কঠোর ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডেও সেই ধারা প্রতিফলিত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শনিবার অফিস খোলা রাখা, ঈদের আগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ শুরু, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রদানের উদ্যোগ, খাল খননে গুরুত্বারোপ এসব পদক্ষেপ প্রশাসনিক সক্রিয়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। সময়মতো অফিসে উপস্থিত থাকার কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সময়ানুবর্তিতায় বাধ্য হচ্ছেন, যা প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়াবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকার নির্দেশও দিয়েছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে অবস্থান তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা; বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা তিনি দেশের কল্যাণে প্রয়োগ করতে চাইছেন।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো প্রভাব-প্রতিপত্তির ঊর্ধ্বে থেকে মন্ত্রীদের কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উন্মুক্ত স্থানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন তারেক রহমান। শপথের পর প্রচলিত কড়াকড়ি ভিভিআইপি প্রটোকল পরিহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে চলাচলের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করছে বলে বিশ্লেষকদের মত। একদিন শহিদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সচিবালয়ে যাওয়ার পথে তার গাড়িবহর রাজধানীর এক ব্যস্ত মোড়ে সিগন্যালে থেমে থাকে। আগের নিয়মে যেখানে রাস্তা ফাঁকা করে দেওয়া হতো, সেখানে অন্য গাড়ির মতোই অপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর বহর। তখন গাড়ির কাচ নামিয়ে পথচারীদের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান প্রধানমন্ত্রী। এ দৃশ্য দেখে অনেকেই বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ান, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ আবার এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এসব দৃশ্য, যা নিয়ে শুরু হয় ইতিবাচক আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব শুধু আচরণগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা। নেতৃত্ব জনগণের ঊর্ধ্বে নয়, বরং জনগণের অংশ এটিই জনমনে স্পষ্ট করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তারেক রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, রাজনীতি, গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তার ঘোষিত ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ আত্মনির্ভরতা ও বিকেন্দ্রীকরণে জোর দিয়েছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘৩১ দফা’ কর্মসূচির মধ্যেও তিনি নীতিগত ধারাবাহিকতা দেখতে পান।
বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রধান ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, স্বাধীনতার সংকটময় সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন। তারেক রহমানও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় অগ্রসর হচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, জিয়াউর রহমান ব্যক্তিজীবনে আড়ম্বর পরিহার করতেন; সাধারণ পোশাকেই তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং সফরে গেলে সাধারণ খাবার গ্রহণ করতেন। সেই সরল জীবনধারার প্রতিফলন তারেক রহমানের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেওয়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, সেগুলো জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন, সময়ানুবর্তিতাকে গুরুত্ব দিতেন এবং পরিমিত জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেও সেই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের নেতা, আমাদের তরুণ নেতা, দলের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা নতুন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি এবং তার জন্য কাজ করছি। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের মানুষের মধ্যে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছেন, তার কর্মপদ্ধতি সেটিই প্রমাণ করছে যে, তিনি শুরু করেছেন এবং আরও করে যাচ্ছেন। আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লক্ষ্য ছিল সত্যিকারের সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া, আর তারেক রহমান সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছেন। জনগণ তারেক রহমানের মধ্যে জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে প্রচলিত ভিভিআইপি সংস্কৃতি পরিহার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং সাদাসিধে জীবনাচরণের মাধ্যমে তারেক রহমান যে বার্তা দিচ্ছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত আচরণগত পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনেরও প্রচেষ্টা। জনমনে এর ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান বলে তারা মনে করছেন।