বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিতে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি জোরদারের অংশ হিসেবে রণতরীটি সেখানে অবস্থান নিয়েছে।
বর্তমানে এটি ইরান থেকে মাত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে রয়েছে। সোমবার রণতরীটি ক্রিটে পৌঁছায়। গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
একইভাবে এথেন্সে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার ভয়ংকর জবাব দিবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটি ইতিমধ্যে চীন থেকে সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে দেশ দুটি। ছয়টি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে। এ ছাড়া ইরানের সামরিক বাহিনীর আদর্শিক শাখা ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশটির উপসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলে সামরিক মহড়া শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র আশঙ্কার মাঝেই ইরানের সামরিক বাহিনী এই মহড়া শুরু করেছে বলে মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হওয়ার পর ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় আসার নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের শর্ত মেনে চুক্তি করবে। যে শর্ত মানলে ইরানকে তাদের পরমাণু কর্মসূচি বাতিল করে দিতে হবে, মিসাইলের দূরত্ব বা রেঞ্জ কমাতে হবে এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো প্রক্সি বাহিনীকে সহায়তা করতে পারবে না।
ট্রাম্প একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন যদি ইরান তাদের শর্ত মেনে চুক্তি না করে তা হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যে একটি রণতরীসহ যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহর জড়ো করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তার সঙ্গে যোগ দিতে আসছে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড।
বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, রণতরীটি গতকাল সোমবার গ্রিসের এ দ্বীপে এসে পৌঁছায়। তবে এ ব্যাপারে এএফপির কাছে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায় গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া এথেন্সে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও কোনো কিছু বলেনি। সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি রণতরী থাকা বেশ বিরল ব্যাপার। এসব রণতরীতে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান এবং হাজার হাজার সেনা থাকে।
গত বছরের জুনে মার্কিন বিমানবাহিনী যখন ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধজাহাজ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি জানানোর পাশাপাশি দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও আলোচনায় আনতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করছে। তেহরান এমন সামরিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ অস্বীকার করলেও বেসামরিক প্রয়োজনে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের আছে বলে দাবি করেছে।
তবে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, মধ্যস্থতামূলক আলোচনায় কেবল দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা হবে। পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে, ইরানের এই কর্মসূচির লক্ষ্য পারমাণবিক বোমা তৈরি; যদিও তেহরান তা ইরানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ইরান : চীন থেকে সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে যাচ্ছে ইরান। এ বিষয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে দেশ দুটি। ছয়টি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ইরান উপকূলের কাছে বড় নৌবহর মোতায়েন করছে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়জনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে নির্মিত সিএম-৩০২ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে সরবরাহের নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঠিক হয়নি। প্রায় ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার এই সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিচু উচ্চতায় ও উচ্চগতিতে উড়ে জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য হুমকি তৈরি করবে। গত বছরের জুনে ইসরাইল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধের পর আলোচনা দ্রুত অগ্রসর হয়। আলোচনার শেষ পর্যায়ে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তারা চীন সফর করেন। ইসরাইলের থিংক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ইরান যদি সুপারসনিক সক্ষমতা পায়, তা পুরো পরিস্থিতিই বদলে দেবে। এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন।
চুক্তিতে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে বা মূল্য কততা স্পষ্ট নয়। এমন খবর প্রকাশের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তারা অবগত নয়। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও মন্তব্য করেনি। এই ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি হলে তা ২০০৬ সালে আরোপিত জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী হবে। ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হলেও গত সেপ্টেম্বর তা পুনর্বহাল করা হয়।
যুদ্ধের মহড়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড : ইরানের সামরিক বাহিনীর আদর্শিক শাখা ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশটির উপসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলে সামরিক মহড়া শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র আশঙ্কার মাঝেই ইরানের সামরিক বাহিনী এই মহড়া শুরু করেছে বলে মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আইআরজিসির স্থলবাহিনীর ‘কম্বাইন্ড ১৪০৪ (২০২৬)’ মহড়া শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের এই মহড়া ইরানের দক্ষিণ উপকূলকেন্দ্রিক হলেও দেশটির অন্যান্য অংশেও একই ধরনের মহড়া চলছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, চলমান এই মহড়ায় ড্রোন, নৌযান, উভচর যান, স্থল থেকে সমুদ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপের পাশাপাশি কামানও ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইআরজিসির স্থলবাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ কারামি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র, কামান, ড্রোন, বিশেষ বাহিনী, সাঁজোয়া যানসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান ব্যবহার করে খুব ভালো প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান হুমকির ভিত্তিতেই এসব মহড়া পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য জানাননি তিনি।
ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের দুই দফার আলোচনা শেষ হয়েছে। পরবর্তী দফা আলোচনা বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাঝেই ইরানে সামরিক এই মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সময়ের আলো/এআর