আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্যের ছায়ায় আচ্ছন্ন, কিন্তু সেই দিনগুলোতে মানুষের মনে ছিল অকৃত্রিম মমতা। আজ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে, জিডিপি বেড়েছে, শহর উঠেছে আকাশছোঁয়া ভবনে, কিন্তু এর বিনিময়ে হারিয়েছি আমাদের সেই সরল বিশ্বাস আর মমত্ববোধ। এখন চারদিকে শুধু কংক্রিটের জঙ্গল আর যান্ত্রিক জীবন।
আমরা অর্থের পিছে ছুটতে গিয়ে আত্মার প্রশান্তি বিসর্জন দিয়েছি। উন্নয়ন আমাদের পকেটে টাকা এনে দিলেও হৃদয় থেকে কেড়ে নিয়েছে সহমর্মিতা ও একে অপরের প্রতি টান।
দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, অথচ আমরা প্রতিদিন ইসলামি প্রকৃত মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ইসলাম শিখিয়েছে প্রতিবেশীর হক আদায় করতে এবং ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু আজ ধর্ম অনেক ক্ষেত্রে কেবল আচারসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। মসজিদে গিয়ে আমরা নামাজ পড়ছি ঠিকই, কিন্তু মসজিদ থেকে বের হয়েই অন্যের হক নষ্ট করতে দ্বিধা করছি না। আধ্যাত্মিকতার চেয়ে এখন বাহ্যিক প্রদর্শনীই আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে।
নিজে খাব, নিজে বড় হব, দেশের ক্ষতি হোক, তাতে আমার কী সমস্যা? এই নীতিই এখন অধিকাংশের মূলমন্ত্র। সমাজের এমন লাখো মানুষ আছেন যারা অপ্রয়োজনীয় বা বাজে কাজে লাখ লাখ টাকা নির্দ্বিধায় ব্যয় করেন। পরিবারের সদস্যদের হাতখরচ বাবদ মাসে লাখ টাকা খরচ হয় অনায়াসেই। কিন্তু যখনই নিজের অধীনস্থ কর্মচারীর দিকে তাকানোর প্রশ্ন আসে, তখনই আমাদের হিসাব বদলে যায়। নিজের বিলাসিতা বজায় রাখতে আমরা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করি না, কিন্তু অন্যের অধিকার দিতে কষ্ট পাই।
বিত্তশালীরা বছরে বিদেশ ভ্রমণে কোটি টাকা ব্যয় করেন, বিলাসিতার কোনো অন্ত নেই তাদের জীবনে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, নিজেদের ঘরের কাজের বুয়া, দারোয়ান, ড্রাইভার বা নিম্নবেতনের কর্মীদের বছরে দুই হাজার টাকা বেতন বাড়াতে তাদের কলিজা ফেটে যায়।
এই নিষ্ঠুর বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি প্রচণ্ড মানসিক দৈন্য। আমরা যাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে বিলাসিতা করি, তাদের সামান্য সুখে রাখতে এই কৃপণতা জাতি হিসেবে আমাদের ক্ষুদ্রতাকেই প্রকাশ করে।
এই ধরনের চরম স্বার্থপরতা আমাদের পুরো জাতিকে এক ভয়াবহ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটাই এখন আধুনিকতার নাম দিয়ে একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন নির্লজ্জভাবে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায় এবং অন্যের দুঃখকে উপেক্ষা করে। সমাজ যেন এখন এক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো স্বার্থপর হওয়া। আমরা এই ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছি এবং কেউ এর প্রতিবাদ না করায় এটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
কল্পনা করুন সেই গ্রাম্য ছেলেটির কথা, যে ৩০ বছর আগে তার শেষ রুটিটুকুও প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে নিত। সেই অভাবের দিনেও তাদের মনে ছিল বিশালতা। আজ সেই ছেলেটিই হয়তো শহরে বড় ব্যবসা করে, মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করে। কিন্তু তার বাবা যে প্রতিবেশী বুড়োর সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতেন, সেই বুড়োর ঘরে আজ আলো জ্বলছে কি না, খাবার জুটছে কি না সেটি দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি চরম নৈতিক পরাজয়।
এই বিশাল পরিবর্তন বা বিবর্তন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফল নয় বরং এটি আমাদের সুদীর্ঘ লালিত মূল্যবোধের অবক্ষয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে যদি হয় কেবল নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানো আর পাশের মানুষের কষ্ট দেখে চোখ বুজে থাকা, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ।
আমরা পশ্চিমা জীবনধারায় ডুবে গেছি, কিন্তু তাদের ভালো গুণগুলো নিতে পারিনি। পশ্চিমা বিশ্বে মানুষ কর দিতে কার্পণ্য করে না, আইন মেনে চলে এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে। আমরা তাদের ভোগবাদকে গ্রহণ করেছি, কিন্তু তাদের সামাজিক শৃঙ্খলা বা ন্যায়পরায়ণতাকে ডাস্টবিনে ফেলেছি। আমরা শুধু চেয়েছি তাদের মতো আয়েশ করতে, কিন্তু তাদের মতো পরিশ্রমী বা সমাজসচেতন হওয়ার চেষ্টাই করিনি। এই অপূর্ণ অনুকরণ আমাদের এক দিশাহারা জাতিতে পরিণত করেছে।
জাপানের মানুষের ‘ওয়া’ সংস্কৃতি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। ‘ওয়া’ মানে হলো সমষ্টির প্রতি ভালোবাসা এবং সম্প্রীতি। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সবসময় প্রাধান্য দেয়। জাপানিরা বিশ্বাস করে, সমাজ ভালো থাকলে তারা নিজেরাও ভালো থাকবে। এই সমষ্টিগত চেতনার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের দেশপ্রেম কেবল কথায় নয়, তাদের প্রতিটি কাজে প্রকাশিত হয়।
জাপানের দিকে তাকালে দেখা যায়, জাপানিরা কখনোই এমন কিছু করে না যাতে অন্যের সমস্যা হয়। তারা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক জীবনে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখে। আমাদের দেশে যখন ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নদী দখল করা হয় বা নিম্নমানের নির্মাণকাজ করা হয়, জাপানিরা তখন তা কল্পনাও করতে পারে না। তাদের এই দেশপ্রেমের জোরেই তারা টিকে আছে। আমরা যদি কেবল নিজেদের স্বার্থ নিয়ে পড়ে থাকি, তবে বড় বড় দালান তৈরি হলেও জাতি হিসেবে আমরা টেকসই হব না।
নরওয়ে, সুইডেন বা ডেনমার্কের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে দানশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষা অভূতপূর্ব। সেখানে মানুষ হাসিমুখে তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ ট্যাক্স হিসেবে দেয়। কারণ তারা জানে এই ট্যাক্সের টাকা ব্যয় হবে সমাজকল্যাণে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রবীণদের কল্যাণে। তারা বিশ্বাস করে সমাজের উন্নতিতেই নিজের ভালো নিহিত। তাদের এই ‘সকলের জন্য কল্যাণ’ ভাবনা তাদের বিশ্বের সবচেয়ে সুখী জাতিতে পরিণত করেছে। আমাদের সমাজে সেই আস্থার জায়গাটি আজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
ওয়ার্ল্ড গিভিং ইনডেক্সে ইন্দোনেশিয়া টানা কয়েক বছর ধরে শীর্ষে রয়েছে। সেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত দান করে। এটি কেবল ধর্মের কারণে নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির একটি অংশ।
তারা অভাবী মানুষকে সাহায্য করাকে নিজেদের নৈতিক দায়িত্ব মনে করে। ইন্দোনেশিয়ার মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ যদি দানশীলতায় বিশ্বে প্রথম হতে পারে, তবে আমরা কেন এত পিছিয়ে? আমাদের সামর্থ্য বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু দান করার সেই উদার মানসিকতা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
রিপোর্ট অনুযায়ী, দানশীলতায় বাংলাদেশ ৬৯তম অবস্থানে রয়েছে, যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ দানের কাজে যুক্ত। এই তথ্যটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ বা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় আমাদের এই কৃপণতা প্রমাণ করে যে আমরা কেবল জমিয়ে রাখতেই পছন্দ করি। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু পরোপকারের সেই হার বাড়ছে না। এই কৃপণতা ও স্বার্থপরতা আমাদের আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক দেউলিয়াপনারই প্রতিফলন মাত্র।
এই গভীর সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কী? আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে সেই মূলে, যেখানে মানুষ মানুষের জন্য ছিল। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও সহমর্মিতার পাঠ দিতে হবে। কেবল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার দৌড়ে না নামিয়ে সন্তানদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। বিত্তশালীদের বুঝতে হবে যে, তাদের সম্পদের ওপর গরিবের হক রয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা কেবল করপোরেট বুলি নয়, এটি একটি মানবিক তাগিদ। আমাদের স্বার্থপরতা ত্যাগ করে সমষ্টির কথা ভাবতে হবে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃথা যাবে যদি আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব না থাকে। আকাশছোঁয়া ভবনের চেয়ে আকাশছোঁয়া মানবিকতা আজ বেশি জরুরি। আমাদের গ্রাম্য সেই সহজ-সরল ছেলেটির মতো হতে হবে, যে প্রতিবেশীর কষ্টে ব্যথিত হতো। জাপান বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশপ্রেম ও দানশীলতা আমাদের রক্তে মিশিয়ে নিতে হবে। আমরা যদি আজ থেকে সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এক চরম বিচ্ছিন্ন ও স্বার্থপর সমাজে বড় হবে।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সময়ের আলো/এআর