একসময় গ্রামবাংলায় একান্নবর্তী পরিবার ছিল সামাজিক কাঠামোর স্বাভাবিক রূপ। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন বিরল। পরিবার ছোট হচ্ছে, আলাদাভাবে বসবাস বাড়ছে। তবে প্রায় আট দশক ধরে টিকে আছে একটি একান্নবর্তী পরিবার।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামের এই পরিবারটির বর্তমান সদস্যসংখ্যা ৫০ জন। এক হাঁড়িতে রান্না, এক উঠানে সবার বসবাস। এই ঐতিহ্যই তাদের বন্ধনের মূল শক্তি। স্থানীয়দের জানান, বিনন্দপুর তো বটেই, আশপাশের এলাকাতেও এমন পরিবার আর নেই।
পরিবারটির একান্নে থাকার প্রচলন শুরু করেন চা-শ্রমিক ভীম রুদ্রপাল। তার জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়। ব্রিটিশ আমলে জীবিকার সন্ধানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসে স্থানীয় ধামাই চা-বাগানে কাজ নেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে, বিনন্দপুরে সস্তায় কিছু জমি কিনে সেখানে বসতি স্থাপন করেন। এরপর আর নিজভূমে ফেরা হয়নি।
ভীম রুদ্রপাল, তার দুই ছেলে মুরারি রুদ্রপাল ও কেশব রুদ্রপাল। কেউই এখন জীবিত নন। তবে তাদের রেখে যাওয়া একান্নে থাকার ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন উত্তরসূরিরা। মুরারি ও কেশবের মোট ৯ ছেলে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, আর ছেলেরা স্ত্রী-সন্তান-নাতি-নাতনিদের নিয়ে একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন।
ছোট ছোট টিলায় ঘেরা বাড়িটির প্রবেশপথে বড় পুকুর, পাশে সবুজ উদ্যান। ফল, ফুল ও শাকসবজির গাছের সমারোহ। ভেতরে প্রশস্ত উঠান, টিনশেডের চারটি লম্বা বসতঘর এবং মাটির দেয়ালঘেরা শণের ছাউনির প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো রান্নাঘর। যেখানে এখনো একসঙ্গে রান্না হয়।
পরিবারের অভিভাবক মুরারির মেজ ছেলে ৬০ বছর বয়সি পলাশ রুদ্রপাল বলেন, বাপ-কাকার আমল থেকেই সবাই একসঙ্গে আছি। এক ডেকচিতে ভাত-তরকারি রান্না হয়। সংসারের আয়-ব্যয় আমি দেখি, অন্যরাও সহযোগিতা করে। ছোট-বড় মিলিয়ে আমরা এখন ৫০ জন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, গ্রাম্য প্রাণী চিকিৎসক ও একজন প্রবাসী।
একসময় জমি কম থাকলেও বর্তমানে তাদের প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। টিলা জমিতে বনজ ও ফলদ বাগান, গবাদিপশু, পাঁচটি মাছের খামার এবং ধান-সবজির আবাদ। সব মিলিয়ে পরিবারটি স্বাবলম্বী।
বছরে আউশ ও আমন মিলিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান উৎপাদন হয়। যা দিয়ে সারা বছরের খাদ্যের জোগান হয়ে যায়। মাছ, শাকসবজি ও মশলাপাতি কিনতে হয় না। ফল ও সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয়ও হয়।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য সোহাগী রুদ্রপাল বলেন, ছেলে, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালোই আছি। সবাই যেন মিলেমিশে থাকে, ভগবানের কাছে এইটা প্রার্থনা করি।
পুত্রবধূ নীলিমা রুদ্রপাল জানান, তিন জা পালাক্রমে প্রতিদিন তিন বেলা রান্না করেন। নিজেদের মধ্যে কোনো ঝগড়া নেই।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, একান্নবর্তী পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার চর্চা হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও পরিবারটিকে এলাকার গর্ব বলে উল্লেখ করেন।
সময়ের আলো/আআ