গভর্নর নিয়োগে তোলপাড়

আদিল সরকার

জাতীয়

সদ্য নিয়োগ পাওয়া গভর্নর নিয়ে যেন থামছেই না আলোচনা-সমালোচনা। মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগ কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও।‘রাজনৈতিক বিবেচনায়

2026-02-27T01:32:44+00:00
2026-02-27T01:32:44+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
গভর্নর নিয়োগে তোলপাড়
আদিল সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৩২ এএম 
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গ্রাফিক : সময়ের আলো
সদ্য নিয়োগ পাওয়া গভর্নর নিয়ে যেন থামছেই না আলোচনা-সমালোচনা। মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগ কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। 

‘রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ’ উল্লেখ করে তার নিয়োগে দেশের আর্থিক খাতে অরাজকতার সূচনা ও লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। একই সঙ্গে বিতর্কিত দলীয় ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে জানান তারা। 

ইতিমধ্যে তাকে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অনেক রাজনৈতিক নেতা ও সচেতন অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন প্রশ্ন তুলছেন। তবে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে নিয়োগের পর কাজে যোগদান করেছেন গভর্নর। 

যোগদানের প্রথম দিনেই ‘কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়েই নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাই’ বলে মন্তব্য করেছেন গভর্নর। একই সঙ্গে নজিরবিহীন উত্তাপের মধ্যে গভর্নর পরিবর্তনের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সরিয়ে ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাহীন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দিয়ে আর্থিক খাতে অরাজকতার সূচনা করা হয়েছে বলে মনে করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। 

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি অর্থনীতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাকমাস্টার ও ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে বহু বছর আইএমএফে কাজ করেছেন। আধুনিক অর্থনীতি নিয়ে তার একাডেমিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি যখন দায়িত্ব নেন তখন চরম অর্থনৈতিক চাপের সময়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া, টাকার বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা এবং আমদানির চাপ সেসময় ছিল চরমে। 

তবে নতুন এই গভর্নর একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। গত ডিসেম্বরেই তার মালিকানাধীন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ৮৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এমন একজন ব্যক্তিকে গভর্নর নিয়োগ করে আর্থিক খাতকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। দেশের আর্থিক খাত যখন সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন এমন অবিবেচক সিদ্ধান্ত একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি জানিয়েছে, বর্তমান শাসক দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন নতুন গভর্নর। ইতিমধ্যে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা স্বার্থের সংঘাত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যে ব্যক্তি নিজেই ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধাভোগী, তাকে পুরো ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রকের আসনে বসানো হলে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর যখন মানুষ কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, তখন যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল কিন্তু নতুন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর নিয়োগ সেই প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দিচ্ছে। 

একইভাবে হতাশার কথা জানিয়েছে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। 

দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংকিং সেক্টরসহ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন। আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দিয়ে আর্থিক খাতে লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করল বিএনপি সরকার। বুধবার রাতে দলটির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।  


বার্তায় তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনতে অনেকটাই সফল হন তিনি। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাত, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে, আমদানি রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বন্ধের উদ্যোগ, বাংলাদেশ ব্যাংককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগসহ বিভিন্ন প্রদক্ষেপ নিয়েছেন, যা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ব্যাংকিং সেক্টরে সরকার দলীয় ব্যবসায়ীদের নগ্ন হস্তক্ষেপ মোটা দাগে বন্ধ করা সম্ভব হতো। এসব সংস্কারের কারণে বিএনপি-আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর লুটপাটের পথ কিছুটা বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ওপর তারা ক্ষিপ্ত ছিলেন।

এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে সরকার সফল গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী কায়দায় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাকে না জানিয়েই নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত অপমানজনক। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক দিনের ঘটনার সঙ্গে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সম্পৃক্ততাও স্পষ্ট হয়েছে। 

এখানেই শেষ নয়, সরকার নজিরবিহীনভাবে একজন বিতর্কিত দলীয় ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ধরনের একজন অনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীর হাতে দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিরাপদ থাকবে, তা বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট, সরকার ব্যাংকিং সেক্টর ও আর্থিক খাতে ফ্যাসিবাদী আমলের মতো নতুন করে লুটপাটের বন্দোবস্ত করতে ইচ্ছুক।

একই সঙ্গে এই নিয়োগের পর নতুন গভর্নরের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে পাঁচ প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। 

বুধবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেন। তার প্রশ্নগুলো হলো— গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে একমত না হলে সেটা বলতে পারছেন? নাকি প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে আসছে? নতুন গভর্নর কি তার সব ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা সত্যিকার অর্থেই ত্যাগ করেছেন? নাকি নিয়োগপত্রের শর্ত শুধু কাগজে থাকবে? ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষত। নতুন গভর্নর কি এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হচ্ছেন? সুদের হার, মুদ্রা সরবরাহ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কি আগের নীতি অব্যাহত থাকছে, নাকি হঠাৎ পরিবর্তন আসছে? যদি পরিবর্তন আসে, তা হলে সেটা কাকে সুবিধা দিচ্ছে? এবং টাকার মান কি বাজারভিত্তিক থাকছে, নাকি অতীতের সরকারের মতো কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?


অন্যদিকে নিয়োগের পরদিনই নিজের কার্যক্রম নিয়ে শক্ত বার্তা দিয়েছেন নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়েই নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাই। এসেছি, কাজ শুরু করি, তারপর কথা বলা যাবে। 

একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা দেবে বলেও জানান তিনি। 

তিনি আরও বলেন, অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী ধারায় ফেরাতে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেওয়া হবে।
পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তথ্যও জানানো হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন গভর্নর। 

এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন জোরদারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। কাজের গতি বাড়াতে ‘ডেলিগেশন অব অথরিটি’ বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে বুধবার ঘটে যাওয়া ‘মবের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবসম্পদ (এইচআর) নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। যেসব কর্মকর্তা ‘মব’ কালচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত এইচআর পলিসি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নজিরবিহীন উত্তাপের মধ্য দিয়ে গভর্নর পরিবর্তনের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

সদ্য বিদায়ি গভর্নরের বিদায় ও নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের জবাবে তিনি বারবার বলেছেন, কিছুই বলার নেই। 

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তবে সাংবাদিকরা গভর্নরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও গভর্নর কোনো কথা বলেননি।

এফআর


  বিষয়:   বাংলাদেশ ব্যাংক  গভর্নর  নিয়োগ  তোলপাড়  বিএনপি  ব্যাংক 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: