মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায়। একদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ইসরাইলের হাইফা বন্দরের দিকে রওনা দিয়েছে, অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তৃতীয় দফার পরোক্ষ বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
কূটনৈতিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে; এই আলোচনাই হয়তো যুদ্ধ এড়ানোর শেষ বড় সুযোগ।
নজিরবিহীন সেনা সমাবেশ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সুদা বে ঘাঁটিতে ভিড়ে, সেখান থেকে ইসরাইলের হাইফার দিকে রওনা দেয়। এর আগে আরেকটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। সঙ্গে রয়েছে একাধিক যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ। প্রয়োজনে সীমিত আঘাত হানার বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
জেনেভায় তৃতীয় দফা বৈঠক : বৃহস্পতিবার জেনেভায় তিন ঘণ্টার বৈঠকের পর আলোচনা স্থগিত হয়। মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেন, দুই পক্ষই নতুন ও সৃজনশীল ধারণার প্রতি উন্মুক্ততা দেখিয়েছে। তার ভাষায় আরও অগ্রগতির আশা রয়েছে। এই বৈঠক আগের দুই দফার মতোই পরোক্ষ। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মার্কিন পক্ষে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের উপদেষ্টা আলি শামখানি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, আলোচনার মূল বিষয় যদি হয় ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না তা হলে তাৎক্ষণিক চুক্তি সম্ভব। তার দাবি, আরাগচির হাতে এমন চুক্তি করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে।
মূল বিরোধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ : বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অভিযোগ করে আসছে ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। ইরান তা অস্বীকার করে বলছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে।
কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এ দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
ইরান বলছে, হামলার পর উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যত বন্ধ রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নতুন চুক্তিতে দেশীয় সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ চায়।
আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, তবে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার।
আলোচনায় সম্ভাব্য বিষয় : জানা গেছে, আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক জোট। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প ভাষণে বলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে; যদিও তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
ইরান স্পষ্ট করেছে, তারা তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রজোট নিয়ে আলোচনা করতে রাজি নয়। এই জোটে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুথিরা অন্তর্ভুক্ত। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করেছেন; ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি বাহিনী অন্তর্ভুক্ত না থাকলে কোনো চুক্তিই গ্রহণযোগ্য হবে না।
সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি : প্রশাসনিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে রেভল্যুশনারি গার্ড বা পারমাণবিক স্থাপনায় প্রাথমিক হামলা চালানো হতে পারে। এমনকি আলোচনায় ব্যর্থ হলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের কথাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব সতর্ক করেছে; ইরানে হামলা সহজ বা দ্রুত সমাধান নাও হতে পারে; এতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ চাপ : কঠোর নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি দুর্বল। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে; নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ইরানের বড় লক্ষ্য।
অন্যদিকে ট্রাম্প অতীতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি চাইছে।
এফআর