বাংলাদেশের বড় একটি অংশজুড়ে উপকূলীয় জনপদ বিস্তৃত। সাতক্ষীরা, খুলনা এবং বাগেরহাট জেলা নিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে ৫০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। যারা সরাসরি উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ শিকার করে এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড়-ঝঞ্ঝা, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা সংগ্রাম করে টিকে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এ দেশের ওপর দিয়ে যতগুলো ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আঘাত করেছে তার বেশিরভাগ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুন্দরবন থাকায় অনেকাংশে রক্ষা পেয়েছে এ জনপদ। অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনাময় এই জনপদ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করলেও নানা দিক থেকে উপকূলীয় এলাকা পিছিয়ে আছে।
জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এ জনপদের মানুষ। বছরের পর বছর কেটে গেলেও তাদের সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ একটি সময় সংগ্রাম করে টিকে থাকতে না পেরে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের মানুষের অবদান কমে যাচ্ছে অন্যদিকে শহর জীবনে নানা সমস্যা, সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে উপকূলীয় অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে অনেক মেগা প্রকল্প পাস হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
অনেক প্রকল্প এখানকার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য করা হলেও মাঠ পর্যায়ে তা জনগণের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সেগুলোর গতিপথ মসৃণ হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নানা জটিলতায় অনেক জায়গায় কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এ জাতীয় সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি যে নতুন সরকার গঠন করেছে; সে সরকারের কাছে উপকূলবাসীর অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেগুলো পূরণের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে। টেকসই বেড়িবাঁধ থেকে শুরু করে নোনাপানির আগ্রাসন থেকে কৃষিজমি রক্ষা করতে এবং সুপেয় পানির সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিগত কয়েক বছর ধরে এ জনপদের মানুষ সবচেয়ে বেশি স্থানান্তর হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো তারা তাদের জীবন-জীবিকা হারাচ্ছে। একটি সময় তারা নদীতে জাল-দড়ি ফেললেই যে মাছ পেত এখন আর তা পাচ্ছে না। জলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তাদের ভাগ্যের চাকা আর পরিবর্তন হচ্ছে না।
একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী মানুষ নদীতে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে; ফলে পানি দূষিত হয়ে মাছের পাশাপাশি অসংখ্য মাছের পোনা এবং ডিম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে মাছের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া দেখা গেছে, যারা সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সুন্দরবনে আবার বনদস্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈধ উপায়ে অর্থাৎ বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বনে মধু বা গোলপাতা সংগ্রহ করতে গেলেও অনেক বনজীবী বনদস্যুর কবলে পড়ছে।
আমরা দেখেছি, সরকারের পরিবর্তন হলেও এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না। লাখক্ষ লাখ জনসংখ্যার স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দিনের পর দিন তারা অবহেলিত থেকে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অনেক সময় ধরে নোনাপানিতে কাজ করার ফলে অতিরিক্ত লবণাক্ততা তাদের জরায়ুসহ প্রজনন অঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ বা ইনফেকশন তৈরি করছে। এ অবস্থায় তারা ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা নিতে পারে না। তেমন কোনো উন্নতমানের হাসপাতালও এসব জনপদে নির্মাণ করা হয়নি। সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের গর্ভবতী নারীরা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। জরুরি অবস্থায় এসব অঞ্চল থেকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য ভালো রাস্তা বা উন্নত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার অভাব এখনও রয়ে গেছে। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।
এখানে বসবাসরত অধিকাংশ পরিবার অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। ফলে তারা তাদের বাচ্চাদের ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে পারে না। আর এসব অঞ্চলে তেমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
আশা রাখি, বর্তমান সরকার উপকূলের মানুষের এসব সমস্যার সমাধানে দ্রুত যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্ভবনাময় উপকূলকে আবার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। জেলেদের জলনির্ভর জীবনে স্থায়ী সুদিন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থায় নজর দেবে।
উপকূলীয় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
এফআর