ইতিহাসের বড় বিপ্লবগুলোর পেছনে প্রায়ই দেখা যায় দুটি ধরনের নেতৃত্ব— এক ধরনের অনুপ্রেরণাদায়ক, ক্যারিশম্যাটিক নেতা যারা বিপ্লব শুরু করে এবং অন্য ধরনের কম ক্যারিশম্যাটিক নেতা যারা বিপ্লব পরবর্তী নতুন শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি দ্বিতীয় ধরণের নেতৃত্ব পালন করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, খামেনি কখনো আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতো ব্যাপক জনসমর্থন পাননি। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সুসংহত করতে সক্ষম হন। একই সঙ্গে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও রক্ষণশীল আরব রাজতন্ত্রগুলোর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা খামেনি বহু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় তার ডান হাত ও বাহু কার্যত অচল হয়ে যায় এবং একাধিকবার গণবিক্ষোভ তার শাসনকে নড়বড়ে করেছে। তবু তিনি প্রভাবশালী ইরানি নেতাদের পাশ কাটিয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন।
শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট আলি আকবার হাসেমি রাফসানজানির তুলনায় প্রভাব কম থাকলেও, সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে খামেনি রাফসানজানিকে ছাড়িয়ে যান। তার শাসনের সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, মিলিশিয়া গঠন করেছে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
খামেনি ধর্মীয় ফাউন্ডেশন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ব্যবহার করে অনুগতদের পুরস্কৃত করতেন। ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের প্রতিনিধি বসিয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। সম্ভাব্য সংস্কারপন্থীদের ভেতর থেকে পশ্চিমা প্রভাব বাড়ানো রোধ করতে সতর্ক ছিলেন এবং এ ধরনের নেতাদের সরিয়ে দিয়েছেন।
জীবনের শেষ বছরে খামেনির শাসন ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ তার শাসনের পরীক্ষার ঘটনা। তিনি কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, ইসরায়েলের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন এবং নিজ দেশের হাজার হাজার নাগরিক নিহত হয়েছে। নতুন যুদ্ধের হুমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশেষে ৮৬ বছর বয়সে বিমান হামলায় নিহত হওয়া তার পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আলী খামেনি ১৯৩৯ সালে ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আজারবাইজানি এবং মাতা পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন এবং পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। ছোটবেলায় তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় প্রবেশ করেন এবং বিদ্রোহী মনোভাবের প্রতিভা দেখান। তিনি অল্প বয়সেই শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরোধিতা শুরু করেন এবং ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন।
খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি গভীর বৈরিতা পোষণ করতেন। তিনি মিশরীয় ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতবের রচনা ফারসিতে অনুবাদ করেন এবং ফরাসি সাহিত্যিক ভিকটর হুগোর লা মিজারেবল বইটিরও বড় ভক্ত ছিলেন। তিনি কুম শহরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণকালে খোমেনির সংস্পর্শে আসেন। সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কারণে একাধিকবার কারাবরণ এবং ‘সাভাকের’ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই হত্যার পর টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদও পালন করেন।
খামেনি সর্বোচ্চ নেতার পদে তখনই আসেন, যখন খোমেনির মনোনীত উত্তরসূরি হোসেইন আলি মোনতাজেরিকে ১৯৮৮ সালে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর তিনি আয়াতুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তী সময়ে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ‘সভ্যতার সংলাপ’ এবং রাজনৈতিক-সামাজিক উন্মুক্ততার প্রচেষ্টা করলে খামেনি তা প্রতিহত করেন। সংবাদপত্র বন্ধ, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে দমন-পীড়ন ছিল তার কৌশল।
২০০৫ ও ২০০৯ সালে তিনি রক্ষণশীল মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে সমর্থন করেন। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত বৃহৎ বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ইরান প্রভাব বাড়ায়। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সরকারকে সমর্থন, লেবাননে হিজবুল্লাহকে শক্তিশালী করা এবং ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা তার কৌশলের অংশ ছিল।
২০১৫ সালে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ নামে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনে তিনি ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ দেখান। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে গেলে খামেনির দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। এই দীর্ঘ শাসনামলে তিনি কঠোরতা, কৌশল ও প্রয়োজনে আপসের সমন্বয়ে ক্ষমতা ধরে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলও তার সহিংস পরিণতি ঠেকাতে পারেনি।
/ইউএমএইচ