কবিতার আসর থেকে ক্ষমতার শীর্ষে

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

কবিতার আসর থেকে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা মানুষের গল্প সাধারণত কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি

2026-03-02T00:34:31+00:00
2026-03-02T00:34:42+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
কবিতার আসর থেকে ক্ষমতার শীর্ষে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম  আপডেট: ০২.০৩.২০২৬ ১২:৩৪ এএম  (ভিজিট : ১৯৫)
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত
কবিতার আসর থেকে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা মানুষের গল্প সাধারণত কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যে পথ অতিক্রম করেছেন, তা প্রমাণ করে কবিতার ভাষার মাধুর্য এবং রাজনীতির কঠোর বাস্তবের মধ্যে এক অদ্ভুত সংযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ছোটবেলার বিদ্রোহী, সাহিত্যপ্রেমী বা প্রার্থীবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে উঠে দাঁড়ায়, তা সদ্য প্রয়াত খামেনির জীবন ও নীতি দিয়ে বোঝা যায়।
ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে আলি খামেনির নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার কথা বলেছিলেন।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে তিনি ইরানে ইসলামি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে গঠিত সরকারে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলি খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে; যদিও তাকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়েছিল।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন সেই আদর্শগত শক্তি, যিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিকব্যবস্থাকে শক্তিশালী রূপে গড়ে তুলেছিলেন। এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষান্ত হয়নি বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা তিনিই গড়ে তুলেছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ যুদ্ধ, সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলি খামেনির অবিশ্বাস আরও গভীর হয় বলে মত বিশ্লেষকদের। আর এই মনোভাবই তার দশকব্যাপী শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। তার এই ধারণা দৃঢ় করেছিল যে ইরানকে সবসময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে।
এই মনোভাব থেকেই তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীকে (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে এই বাহিনী পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। 

খামেনি ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান থাকতেন। আলি খামেনির প্রতিরক্ষামূলক নীতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।

শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভেতরেও তার শাসন মারাত্মক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালে কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ছলনা’ দাবি করে বহু মানুষ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। আলি খামেনি কঠোর হাতে ওই বিক্ষোভ দমন করেন।
এরপর ২০২২ সালে তেহরানে মাসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীর পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে তীব্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক মাস ধরে ওই আন্দোলন চলে। সেবারও কঠোর হাতেই বিক্ষোভ দমন করেছিলেন আলি খামেনি।

তবে ৩৭ বছরের শাসকজীবনে আলি খামেনি খুব সম্ভবত এ বছর জানুয়ারিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন ঘিরে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পুরো দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক দেন।

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার বাবা একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি (বাবা) পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের আজারবাইজানি জাতিসত্তার ছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হলে ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসেন আলি খামেনি।

আলি খামেনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনার পর তিনি ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালটি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেবার অল্পের জন্য তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা পান। তবে তার ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতা, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামি বিপ্লবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। খোমেনি মৃত্যুর আগেই তার উত্তরসূরি হিসেবে বহু বছর আগে থেকে নির্ধারিত আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলি মন্তাজেরিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আলি মন্তাজেরি ১৯৮৮ সালে বন্দিদের গণমৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন।

পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। খামেনিকে নিয়োগ দিতে ওই পর্ষদকে দেশের শীর্ষপদে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্তগুলো শিথিল করতে হয়েছিল। কারণ খামেনির কাছে হুজতুলইসলাম পদবি ছিল না। এটি উচ্চপদস্থ শিয়া আলেমদের একটি পদবি। নিয়ম শিথিল করে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার পর এক ভাষণে খামেনি বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করি, আমি এই পদটির যোগ্য নই; হয়তো আপনি এবং আমি এ বিষয়টি জানি। এটি প্রতীকী নেতৃত্ব হবে, বাস্তব নেতৃত্ব নয়।

দায়িত্ব গ্রহণ করেই আলি খামেনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। খামেনি যখন ক্ষমতায় আসেন, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়। ইরানের সেনা ও সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল ইরাক। এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করা হয়। ফলে এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইরানের ক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খামেনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সে সময় তিনি প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে যেতেন। সেখান থেকেই তিনি আইআরজিসি আনুগত্য অর্জন করেন এবং যুদ্ধের বাস্তবতা সরাসরি উপলব্ধি করেন। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি সামরিক এবং আধা সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন, যেন দেশের বিরুদ্ধে অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করা যায় এবং ধারাবাহিক প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়।


  বিষয়:   আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি  ইরান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: