রাত গভীর হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে। দিনের কোলাহল থেমে যায়, মানুষ ঘুমে তলিয়ে যায়। অথচ এই নিস্তব্ধতার মাঝেই খুলে যায় এক অপার্থিব দরজা, তাহাজ্জুদের দরজা। এটি এমন এক সময়, যখন বান্দা ও তার রবের মাঝে দূরত্ব কমে আসে, দোয়া হয়ে ওঠে আরও আন্তরিক, আর সেজদা হয়ে ওঠে আত্মার আরামের আশ্রয়।
তাহাজ্জুদ কোনো সাধারণ ইবাদত নয়, এটি আত্মিক মর্যাদা বৃদ্ধির এক অনন্য সোপান। যে মানুষ গভীর রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে সেজদায় ঝুঁকে পড়ে, আল্লাহ তাকে বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় তোমার রব তোমাকে মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত করবেন’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৭৯)। কিন্তু এই মহান ইবাদত থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিতে যুগে যুগে নানা ব্যস্ততা ও প্রলোভন তৈরি হয়েছে। একসময় মোবাইল ফোনের ব্যাপকতা ছিল না।
সাধারণ ফোনের যুগে সিম কোম্পানিগুলো রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত ফ্রি টকটাইমের প্রলোভন দিত। অসংখ্য তরুণ-তরুণী তখন অর্থহীন আলাপ ও আবেগঘন কথোপকথনে রাত কাটিয়ে দিত। ফজরের আজান শোনা যেত, কিন্তু হৃদয়ে তাহাজ্জুদের সেজদার আহ্বান জাগ্রত হতো না। পরবর্তীকালে যোগ হলো রাতজাগা বিনোদনের নতুন মাধ্যম রেডিওর রাতের অনুষ্ঠান। গভীর রাতের আড্ডা, গল্প আর আবেগী কণ্ঠের আকর্ষণে অনেকেই ভুলে গেল সেই সময়টুকু, যখন আকাশের দরজা খুলে থাকে এবং দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত নেমে আসে। এরপর এলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ। স্মার্টফোন, ফ্রি ডাটা ও অবিরাম স্ক্রলিং মানুষের রাতের সময়টুকু দখল করে নিল। একটি পোস্ট, একটি লাইক, একটি মন্তব্য, তারপর আরেকটি। এভাবেই রাত কেটে যায়, কিন্তু তাহাজ্জুদের জন্য চোখ আর জাগে না। আধুনিক সময়ে নতুন ব্যস্ততা যুক্ত হয়েছে ফ্রিল্যান্সিং ও আন্তর্জাতিক কাজের চাপ। রাতের শেষ প্রহরে যখন আল্লাহ বান্দাদের ক্ষমা ও রহমতের ঘোষণা দেন, তখন অনেকেই ব্যস্ত থাকে দূরদেশের ক্লায়েন্টের কাজ নিয়ে। রিজিকের মালিককে ভুলে আমরা কখনো কখনো রিজিকের মাধ্যমকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বসি।
আরও পড়ুন
রমজান মাসেও দেখা যায় আরেক প্রবণতা, সেহরিকেন্দ্রিক রাতজাগা আড্ডা। ইবাদতের প্রস্তুতির বদলে অনেক সময় তা পরিণত হয় সামাজিক উৎসবে। ফলে তাহাজ্জুদের নিভৃত অশ্রু হারিয়ে যায় কৃত্রিম আলোর ঝলকে। অথচ তাহাজ্জুদ কেবল দুই রাকাত নামাজ নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নতির এক অনন্য সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ নিকটতম আসমানে অবতরণ করে আহ্বান করেন, ‘কেউ কি আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি ক্ষমা করব? কেউ কি আছে রিজিক প্রার্থনাকারী, যাকে আমি দান করব?’ প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই ডাকে সাড়া দেব, নাকি স্ক্রিনের আলোয় ডুবে থেকে আসমানের আলো হারিয়ে ফেলব? এই রমজানেই হতে পারে নতুন শুরুর সময়। রাতকে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনি। মোবাইলের আলো নিভিয়ে হৃদয়ের আলো জ্বালাই। অনলাইন আড্ডা ছেড়ে দাঁড়াই তাহাজ্জুদের সেজদায়। কারণ যে মানুষ গভীর রাতে আল্লাহকে খুঁজে পায়, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানের আলোয় উদ্ভাসিত করেন। হয়তো জীবনের মোড় ঘুরে যেতে পারে তাহাজ্জুদের একটি সেজদা থেকেই।
শিক্ষক, মাদরাসা দারুত তারবিয়াতিল, ইসলামিয়া, নিউমার্কেট, যশোর
এএডি/