যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে ইতিমধ্যেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করেছে। কিন্তু তাদের কাছে পরবর্তী পরিকল্পনা নেই; কীভাবে দেশ চলবে, সেটা স্পষ্ট করা হয়নি। এই হামলা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তা আঞ্চলিক যুদ্ধের আকার নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই অভিযান কেন চালাচ্ছে; তার উদ্দেশ্য কি কেবল শীর্ষ নেতা হত্যা, নাকি গোটা রাজতন্ত্রের পতন- তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়নি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও মার্কিন ও ইরানি কূটনীতির মধ্যে আলোচনার কিছু যুক্তি ছিল, এমনকি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোমাবর্ষণের আগের রাতে জানিয়েছিলেন যেকোনো চুক্তির সম্ভাবনা আছে কিন্তু এরপরই হামলা হয়। যদিও খামেনি নিহত হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন এই হামলা চালিয়ে তারা থামবে না। কিন্তু কেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে; এটা এখন প্রশ্ন। উত্তর হিসেবে বলা হচ্ছে- ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করা, বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) তুলে দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন ঘটানো। এসব লক্ষ্যই একটি ভুল ধারণা থেকে উদ্ভূত। তা হলো, ইরান এমন একটা দেশ যেখানে শাসন কেবল এক নেতা বা এক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তবে তা সত্য নয়।
ইরানের সাধারণ সেনাবাহিনী প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার সদস্যে গঠিত; বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার সদস্য; আর বাসিজ নামে স্বেচ্ছাসেবী প্যারামিলিটারি সংস্থা প্রায় ৯০ হাজার সক্রিয় সদস্য রাখে, যার সংখ্যা প্রয়োজন হলে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত বাড়ানো যায়। বিভিন্ন হিসেব অনুযায়ী, এক মিলিয়নের মতো লোক ইরানের নিরাপত্তা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এই বাহিনীগুলো এখনও অক্ষত রয়েছে।
যখন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আট মিনিটের একটি ভিডিওতে ইরানের সেনা, পুলিশ, বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী ও বাসিজকে হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সরকার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান করেন। কিন্তু বাস্তবে এ জন্য যে রাষ্ট্রের সব বাহিনী এক দিনে অস্ত্র ত্যাগ করে দেয়- এটা কখনো ঘটে না।
যুদ্ধের লক্ষ্য যদি অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করা হয়, সেটা বাস্তবেও ঘটেনি। ইতিপূর্বে ইরানে একটি ব্যাংক সমস্যা ও মুদ্রার মূল্য হ্রাসের কারণে ২০২৫ সালের শেষের দিকে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। এতে অংশ নিয়েছিল ছাত্র, শ্রমিক, দোকানদারসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে নিবারণের চেষ্টা করলে হাজারেরও বেশি বেসামরিক লোক মারা গিয়েছিল বলে মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই রূপ নেয়নি বরং বোমাবর্ষণে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরভর্তি হয়েছে।
বিমান হামলা মানুষের মধ্যে নতুন করে আন্দোলনের জায়গা তৈরি করে না; বাস্তবে মানুষ ঘরে ঢুকে আশ্রয় খুঁজে নেয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহু ইরানি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে হরমজগান প্রদেশের এক মেয়েদের স্কুলের ছাত্রীরাও ছিল। এতে যতটুকু ক্ষুদ্র আশা তৈরি হয়েছিল, তা স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ নেয়নি।
এবার বড় প্রশ্ন হলো- যদি বর্তমান নেতৃত্ব গুঁড়িয়ে যায়, তখন কে শাসন করবে? এর সঠিক উত্তর নেই। ইরানের বিরোধী দলগুলো যেমন সংস্কারবাদী, সাংবিধানিক প্রগতিশীল, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র নেটওয়ার্ক, নৃতাত্ত্বিক আন্দোলন বা রাজতন্ত্রপন্থি এসব শক্তি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিভক্ত। দীর্ঘ বছর ধরে বর্তমান সরকার এসব গোষ্ঠীকে দমন করেছে, ফলে একক কোনো সংগঠিত বিরোধী শিবির নেই, যারা ক্ষমতা হাতে নিতে সক্ষম। এদের মধ্যে প্রবাসে থাকা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী অন্যতম ব্যক্তি হলো রেজা পাহলভি, সাবেক শাহের ছেলে। অনেক ইরানি প্রবাসী তাকে একটি সময়ে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য নেতৃত্ব মনে করলেও এটা বাস্তবে দেশজুড়ে ও সরকারের ভেতরে তার কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক পার্টি বা মিলিটারি সমর্থন নেই।
বহু মানুষ মনে করেন যে খামেনির মৃত্যু হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাহলভি বা রাজতন্ত্রপন্থিরা ফিরে আসবে; কিন্তু বাস্তবে তা সহজ নয়। বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী, ধর্মীয় নেতাদের নেটওয়ার্ক, আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সেনাশক্তি সবই শুধু বাইরের সমর্থনে এক নেতা বদলে যাবে; এমন ব্যবস্থা নয়।
ইরানের ভেতরে জনসংখ্যা পারস্যদের বড় অংশ হলেও অনেক বড় নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত সম্প্রদায় আছে- আজারবাইজানি, কুর্দি, বালুচ, আরব ও তুর্কি। তারা জাতীয় জীবনে গভীরভাবে জড়িত আর দীর্ঘ বছর নানা ইতিহাসগত ক্ষোভও লালিত করে এসেছে। এসব ভিন্নতার কারণে একটি স্থিতিশীল কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পথ আরও জটিল।
ইরানের ভেঙে যাওয়ার বা দ্রুত পতনের পরিবর্তে একটি শক্তির শূন্যতা বা ক্ষমতার অভাব দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও সামরিক দখলের পর একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ শুধু একটি শাসকের মৃত্যু ঘটায়, তা কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তৈরি করে না। এতে সমাজ ও নাগরিক সংগঠনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। এটি নতুন প্রজন্মের ভেতর ক্ষত ও দীর্ঘ সময়ের নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে।
তথ্যসূত্র : ট্রুট আউট
সময়ের আলো/আআ