গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধ বন্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে যে শান্তি পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই সিদ্ধান্তে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর অবস্থানের কারণে গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে ব্যাপক হামলার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনায় গাজায় ধাপে ধাপে যুদ্ধ বন্ধ, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার প্রশাসন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি গাজার নিরাপত্তায় একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবও রয়েছে।
কিন্তু এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি নিয়েই আপত্তি জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তার বক্তব্য, হামাসকে ‘সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র’ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। এতে শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
যুদ্ধবিরতি কি ভেঙে পড়ার পথে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার জন্য শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণার পরও ইসরায়েল গাজায় প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে গাজার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকার ওপর ইসরায়েল সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর নতুন ঘোষণা গাজায় আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াদ আল-কারার মতে, ইসরায়েল আবার হত্যাকাণ্ড, বোমা হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান শুরু করতে পারে— এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিশেষ করে ইসরায়েলের তৈরি ‘ইয়েলো লাইন’ বা কার্যত সামরিক বাফার জোনের আশপাশে থাকা ফিলিস্তিনিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই অঞ্চল গাজার মানুষের চলাচল ও বসবাসের জায়গা আরও সংকুচিত করেছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসও নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে আলোচনার পথের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট অভ্যুত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েল আলোচনা ও শান্তি প্রক্রিয়াকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
হামাস কী বলছে?
নেতানিয়াহুর অবস্থানের পর হামাসও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অধীনে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তারা এখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে হামাস মধ্যস্থতাকারী ও চুক্তির নিশ্চয়তাদানকারী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন সব পক্ষকে চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য করে এবং কোনো পক্ষের লঙ্ঘনের কারণে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে না দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো— যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী ইসরায়েলকে কতটা চাপ দিতে পারবে।
যদি চাপ কার্যকর না হয়, তাহলে আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং গাজায় আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নেতানিয়াহুর মূল শর্ত হলো— হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে হবে। এরপরই ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্ন আসবে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহজুব জুয়েইরির মতে, এটি বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন একটি শর্ত। কারণ গাজায় কী পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে, কোথায় রয়েছে কিংবা সেগুলো কীভাবে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হবে, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো অস্ত্রের তালিকা নেই। একই সঙ্গে এমন কোনো নিরপেক্ষ পক্ষও নেই, যাকে সব পক্ষ বিশ্বাস করবে।
তার মতে, এই শর্ত বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব জেনেও সেটিকে পূর্বশর্ত হিসেবে সামনে আনা হলে আলোচনা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
জুয়েইরির আরও দাবি, ইসরায়েল এমন একটি গাজা চায় যেখানে হামাসের শাসন থাকবে না, ফিলিস্তিনিদের হাতে অস্ত্র থাকবে না এবং যুদ্ধের আগের মতো স্বাভাবিক জীবনও ফিরবে না।
অর্থাৎ, গাজাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য এমন অবস্থায় রাখার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়বে।
বাস্তুচ্যুতি নিয়ে মিসরের উদ্বেগ
গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতি।
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, গাজায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হলে যাতে মানুষ সেখানে বসবাস করতে না পারে, সেই পরিস্থিতিতে তাদের চলে যাওয়াকে ‘স্বেচ্ছায় বাস্তুচ্যুতি’ বলা যায় না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, গাজার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া মিসর, আরব ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য ‘রেড লাইন’।
মিসরের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ তৈরি হলে গাজার মানুষ বাধ্য হয়ে অঞ্চলটি ছেড়ে যেতে পারেন।
নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তে কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত বাড়বে?
নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক। গাজা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ইসরায়েলের জন্য কূটনৈতিকভাবে বড় সিদ্ধান্ত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু হয়তো জানেন যে তার অবস্থান ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তবুও তিনি নিজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
মাহজুব জুয়েইরির মতে, নেতানিয়াহুর অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংঘাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সম্পর্কও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে।
ইসরায়েলি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আদেল শেদেদের মতে, নেতানিয়াহু এমন একটি সুযোগ খুঁজছিলেন, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চাপের মুখেও বড় ধরনের ‘না’ বলতে পারবেন।
এর মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছেও নতি স্বীকার করেন না।
বিশেষ করে ইসরায়েলের ডানপন্থী ভোটারদের কাছে এই অবস্থান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
গাজা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর কৌশল
আরেক বিশ্লেষক সুলেমান বিশারাত মনে করেন, নেতানিয়াহু শুধু গাজা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন।
তার মতে, গাজা হলো এমন একটি ইস্যু, যার সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি—সবকিছুই জড়িত।
তাই গাজা নিয়ে অবস্থান শক্ত করে নেতানিয়াহু একই সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামনে কী হতে পারে?
নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের পর গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে মূলত তিনটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করে আবারও আলোচনার পথ খুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বর্তমান সমঝোতা আরও দুর্বল হয়ে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে।
তৃতীয়ত, আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ ও সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আলোচনার প্রক্রিয়া যদি ভেঙে পড়ে এবং ইসরায়েল আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর ‘না’ শুধু একটি শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য বাস্তুচ্যুতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
এই কারণে তার সিদ্ধান্তকে গাজা যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে গাজায় একটি স্থায়ী শান্তির বদলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতই নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ