যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে বসানো হয়েছে সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রধান মোহসেন রেজাইকে। তার এই নিয়োগকে দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
৭১ বছর বয়সী রেজাই ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) নতুন সচিব হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাকে এ পদে নিয়োগ দেন। একই দিনে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাকে কাউন্সিলে নিজের প্রতিনিধি হিসেবেও নিয়োগ দেন।
রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর আইআরজিসির প্রধান ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময় ইরান-ইরাক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরে তিনি ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে সামরিক ও রাজনৈতিক— দুই ক্ষেত্রেই তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এবারের নিয়োগের পেছনে তার সামরিক অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এসএনএসসি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তের সমন্বয় হয়।
তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবাস আসলানি আল জাজিরাকে বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয় করতে সক্ষম এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল। তার মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতার কারণেও রেজাইকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও রেজাইয়ের অবস্থান বেশ কঠোর। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। গত জুলাইয়ে রেজাই বলেছিলেন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ‘ডর্জনখানেক পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি মূল্যবান’। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ঝুঁকি ও হতাহতের মুখে পড়তে হবে।
এ কারণে রেজাইয়ের নিয়োগকে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক মোহসেন ফারখানি মনে করেন, তার নিয়োগ ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে সামরিক বিবেচনার গুরুত্ব বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এর বিপরীত ব্যাখ্যাও রয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সামরিক পটভূমির একজন নেতাকে নিরাপত্তা কাউন্সিলের শীর্ষে বসানোর ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় গেলে সেটি দেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য করা সহজ হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসআল্লাহ শামসোলভায়েজিনের মতে, সাবেক আইআরজিসি প্রধান হিসেবে রেজাইয়ের সামরিক পরিচয় তাকে কট্টরপন্থীদের কাছেও তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। ফলে তিনি কোনো সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিলে তাকে সহজে দুর্বল বা দেশের স্বার্থে ছাড় দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দেওয়া কঠিন হবে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রেজাই বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সমর্থন করেছিলেন। ফলে রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেজাইয়ের নিয়োগের মাধ্যমে ইরান একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিতে চাইতে পারে— একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা, অন্যদিকে প্রয়োজন হলে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা।
তবে ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু রেজাইয়ের হাতে নয়। প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থা এবং সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তের সমন্বয়েই এসব নীতি নির্ধারিত হবে। তবু যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে সাবেক আইআরজিসি প্রধানকে শীর্ষ নিরাপত্তা পদে বসানোকে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ