ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার শীর্ষ দায়িত্বে ফিরেছেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক দীর্ঘদিনের কমান্ডার মোহসেন রেজাই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সংশয়ী হিসেবে পরিচিত এই অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা এখন ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী নিরাপত্তা পদে দায়িত্ব পেয়েছেন।
৭১ বছর বয়সী রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চেই জোলঘাদরকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন রেজাই। তিনি মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টাও ছিলেন। নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে ইরানের নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাঁর প্রভাব আরও বাড়ল।
ইরানবিষয়ক মার্কিন-ইরানি শিক্ষাবিদ ভ্যালি নাসর সিএনএনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য কোনো চুক্তির আগে আইআরজিসি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর মোজতবা খামেনির নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে রেজাইয়ের নিয়োগে।
কে এই মোহসেন রেজাই?
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পান মোহসেন রেজাই। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছেন।
ভ্যালি নাসরের মতে, রেজাইয়ের আইআরজিসির ওপর তাঁর পূর্বসূরি জোলঘাদরের তুলনায় ‘অনেক বেশি কর্তৃত্ব’ রয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় ইসলামপন্থী গেরিলা সংগঠনগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন রেজাই। পরে আইআরজিসি প্রতিষ্ঠার সনদ তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন। তিনি বাহিনীটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা কমান্ডার। তাঁর নেতৃত্বেই আইআরজিসি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন রেজাই। ভ্যালি নাসরের ‘ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বইয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও রেজাই অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘স্থায়ী সংঘাতের’ পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন।
কঠোর অবস্থানের বাস্তববাদী নেতা
ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত রেজাই পরে সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলে যোগ দেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অধীন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এ ছাড়া চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোবারই জয় পাননি।
ট্রাম্পকে ‘পরাজিত’ বলেছিলেন
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার ঘাটতিতে ভোগা’ ব্যক্তি হিসেবে মন্তব্য করেন রেজাই।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরানের পাল্টা হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
রেজাই বলেন, ‘ইরান তাদের পরিকল্পনা ব্যাহত করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের তৃতীয় যুদ্ধ মাঝপথেই পরাজিত হয়েছে। এর ফলে তাঁর আগের ব্যর্থতার সঙ্গে আরও একটি বড় ব্যর্থতা যুক্ত হয়েছে।’
হরমুজ প্রণালি নিয়ে হুঁশিয়ারি
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ নিয়েও কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন রেজাই। গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে ‘মার্কিন জাহাজ ও বাহিনী গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখে পড়বে।
রেজাইয়ের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর ইরান ও ওমানের সার্বভৌমত্ব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অনাস্থা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে রেজাইয়ের অবস্থানও কঠোর। গত মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেন। আলোচনাকে তিনি ‘স্থায়ী অঙ্গীকার নয়, বরং পার হওয়ার জন্য একটি সেতু’ হিসেবেও বর্ণনা করেন।
জুনে সিএনএনের সাংবাদিক ফ্রেড প্লেইটগেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের ভূখণ্ডে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা বা আগ্রাসনের জন্য তেহরান প্রস্তুত।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ‘বিশ্ব ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারবে’।
সময়ের আলো/কেএইচ