ইরানের সংকটেও কেন যুদ্ধের ময়দানে নামছে না ইয়েমেনের হুথিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।

2026-03-05T16:26:25+00:00
2026-03-05T16:26:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন
ইরানের সংকটেও কেন যুদ্ধের ময়দানে নামছে না ইয়েমেনের হুথিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬, ৪:২৬ পিএম  আপডেট: ০৫.০৩.২০২৬ ৪:২৬ পিএম
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভে একজন ব্যক্তি ইরানের পতাকা নিয়ে হাঁটছেন। ছবি : মিডল ইস্ট আই
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা থাকলেও আপাতত হুথিরা পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি হুথিরা মনে করে যে তাদের প্রধান সমর্থক ইরান গুরুতর সামরিক বা রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে কিংবা ইরানি সরকার অস্তিত্বের হুমকির মুখে রয়েছে, তাহলে তারা সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে।

আদেনভিত্তিক দৈনিক আদেন আল-গাদ পত্রিকার সম্পাদক ফাতেহি বিন লাজরেক বলেন, হুথি নেতৃত্ব এখনো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে। তিনি বলেন, হুথিরা দেখছে ইরানের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। যদি তারা মনে করে যে ইরানি শাসনব্যবস্থা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তখন তারা পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। 

হুথি নেতার প্রতিক্রিয়া 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর হুথি আন্দোলনের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি প্রথম যে ভাষণ দেন, তাতে তার স্বাভাবিক তীব্র বক্তব্যের পরিবর্তে তুলনামূলক সংযত সুর লক্ষ্য করা যায়। তিনি ইরানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানালেও সরাসরি সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেননি।

পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার খবর প্রকাশিত হলে তিনি আরেকটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান। তবে সেখানেও তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো অঙ্গীকার করেননি। 

‘প্রতিরোধ অক্ষ’

হুথি বিদ্রোহীরা নিজেদেরকে প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ”-এর অংশ হিসেবে পরিচয় দেয়। এই জোটে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের একাধিক মিলিশিয়া গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য।

একসময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারও এই জোটের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে ২০২৪ সালের শেষদিকে বিদ্রোহীদের হাতে আসাদ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথি আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তেহরান তাদের ড্রোন প্রযুক্তি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে গত এক দশকে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ 

ইয়েমেনের বিভিন্ন সরকার বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং সামরিক পরামর্শ দিয়ে দেশটিতে সংঘাত উসকে দিচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সীমান্তবর্তী হামলায় হুথিদের সহায়তার অভিযোগ রয়েছে তেহরানের বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা মনে করে যে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে তাদের অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সামরিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

ফাতেহি বিন লাজরেক বলেন, হুথিরা জানে যে ইরানি সরকার পতিত হলে তাদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি হবে। তখন তারা তাদের শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হারাবে।

ভেতরে মতবিরোধ

হুথি বিদ্রোহীদের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর হুথিরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছিল। পরে তারা বিভিন্ন সমুদ্রপথে হামলা বাড়ায় এবং ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে শুরু করে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সতর্ক।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দুটি হুথি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, সংগঠনটি আবার লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালাবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই হুথি কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তথ্য অস্বীকার করেন।  

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য হুথি নেতৃত্বের ভেতরে বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।

ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ আল-বাইদানি বলেন, আন্দোলনের কঠোরপন্থী অংশ ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে আরেকটি অংশ পরিস্থিতি শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করে অপেক্ষা করার পক্ষে। 

ইয়েমেনি সংঘাত বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বলেন, হুথি সমর্থকদের একটি অংশ বর্তমান প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নয়। কট্টরপন্থীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাইছে, তবে সেটি মূলত নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে। 

হিসাব করে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা বর্তমানে “হিসাব-নিকাশভিত্তিক কৌশল” অনুসরণ করছে। এর অর্থ হলো তারা এমন পদক্ষেপ নিতে চায় যা একদিকে তাদের শক্তি প্রদর্শন করবে, কিন্তু অন্যদিকে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বা সামরিক হামলার ঝুঁকি কমাবে। 

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, হুথিরা চাইছে না যেন তাদের পদক্ষেপকে শুধু ইরানের স্বার্থে যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়।

তার মতে, হুথিরা তাদের সম্ভাব্য পদক্ষেপকে ইয়েমেনের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবে। 


আগের হামলার ক্ষত এখনো কাটেনি

গত বছর হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একাধিক হামলার ফলে তাদের অবকাঠামো ও সামরিক কাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।

২০২৫ সালের আগস্টে একটি ইসরায়েলি হামলায় হুথি প্রশাসনের প্রধানমন্ত্রী এবং কয়েকজন মন্ত্রী নিহত হন। এছাড়া হোদেইদাহ বন্দর, তেল সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সিমেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার পর হুথি বাহিনী এখনো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে নতুন করে বড় আকারের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতা 

তবে হুথি আন্দোলন গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তারা যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না।

ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, যদি হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরাসরি সামরিক হামলা হয়, অথবা ইরান বা হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব থেকে সংঘাত বাড়ানোর আহ্বান আসে, তাহলে হুথিরা দ্রুত যুদ্ধের ময়দানে নামতে পারে।

তিনি আরও বলেন, হুথিরা প্রায়ই যুদ্ধকে ব্যবহার করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংহতি জোরদার করতে, আদর্শিক ঐক্য ধরে রাখতে এবং কঠিন রাজনৈতিক সমঝোতা বিলম্ব করতে। 

ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হুথিদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত থাকলেও পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানও বদলে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


/ইউএমএইচ


  বিষয়:   ইরান  ইসরায়েল  হামলা  হুথি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: