মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ফলে এই অঞ্চলে বন্দরগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজের চলাচল। ফলে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ২০০৮ সালের পর খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
২০০৮ সালের খাদ্য সংকটের পর খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ব্যয়বহুল কর্মসূচি থেকে সরে আসে। অন্যদিকে বিদেশে কৃষিখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেই উৎপাদনকে আমদানি করার মাধ্যমে আমদানিনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আগের কর্মসূচিগুলো মূলত খাদ্যশস্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মরুর কঠোর জলবায়ু ও পানির ঘাটতির কারণে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে, সৌদি আরব ২০০৮ সালে দেশীয় গম উৎপাদন কর্মসূচি ধীরে ধীরে বন্ধ করতে শুরু করে এবং এই শস্যের চাহিদা মেটাতে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর কৌশল নেয়।
কিন্তু এখন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক নৌপরিবহণ বিঘ্নিত হওয়া এবং অনেক দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছু পণ্যের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউজের সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-ভুক্ত দেশগুলোর খাদ্যের ৭০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি হয়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব দেশে খাদ্যঘাটতি দেখা দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘জিসিসি দেশগুলো সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করা এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে, যাতে অস্থায়ী বিঘ্ন সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু এসব মজুত সাধারণত কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হবে না। এরপর বাজারে দাম বাড়তে শুরু করবে এবং পণ্য পৌঁছাতে সময়ও বেশি লাগবে।’
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সাময়িক বাধাও যদি সৃষ্টি হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বন্দরগুলো এড়িয়ে ছোট বন্দরে পণ্য পাঠাতে হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ বড় বন্দর— যেমন দুবাইয়ের জেবেল আলী এবং কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সৌদি আরবের উপসাগরীয় উপকূলের প্রধান বন্দরগুলো— এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানে বেশিরভাগ জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েই আসতে হয়।
এই সপ্তাহে ইরানের হামলায় ওই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ লাইনের কয়েকটিতে আঘাত হানে, যার মধ্যে রয়েছে অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর জেবেল আলী পোর্ট। হামলার কারণে কয়েক ঘণ্টা বন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হয়।
তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের কৃষিপণ্য বিশ্লেষক ইশান ভানু বলেন, সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে জেবেল আলী অবরোধের কারণে, যা প্রায় ৫ কোটি মানুষের জন্য পণ্য সরবরাহ করে। দুবাইয়ের এই বন্দরটি শুধু স্থানীয় বাজার নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
হরমুজ প্রণালির বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্য বন্দরগুলোর সক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত। যেমন খোরফাক্কান বন্দর বছরে প্রায় ৫০ লাখ টিইইউ (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার) পরিচালনা করতে পারে এবং ফুজাইরাহ বন্দর ১০ লাখ টিইইউয়েরও কম কনটেইনার হ্যান্ডেল করে। ফলে জেবেল আলী বা আবুধাবির খলিফা পোর্টের সক্ষমতা হারালে ছোট বন্দরগুলোর জন্য সেটা পূরণ করা কঠিন হবে।
ইশান বলেন, ফলে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ইরাক কার্যত স্থলবেষ্টিত হয়ে পড়বে এবং (খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের জন্য) সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে স্থলপথের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে যানজট ও বিলম্বের ঝুঁকি বাড়বে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের কৌশলগত খাদ্য মজুত চার থেকে ছয় মাসের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। তবে সে দেশের সরকার বাসিন্দাদের একটি বিশেষ হটলাইনের মাধ্যমে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
রয়টার্সকে সুপারমার্কেট কর্মীরা জানিয়েছেন, দোকানের তাক এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পণ্যে ভরা রয়েছে। তবে কিছু পণ্য পুনরায় সরবরাহ করতে সময় বেশি লাগছে। পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে দুবাই সাময়িকভাবে ট্রাক চলাচলের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধও শিথিল করেছে।
শনিবার ইরানের হামলা শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোয় অনেক মানুষ আতঙ্কে খাদ্য ও পানীয় মজুত করতে শুরু করেন। এতে সাময়িকভাবে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে— যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত হতে পারে।
কুইলিয়াম বলেন, ধারণাগত ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। এখন মজুত যথেষ্ট থাকলেও মানুষ যদি সুপারমার্কেটে হুড়োহুড়ি করে, তাহলে সেটিও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতে পারে।
একজন স্থানীয় ক্রেতা ফেসবুক গ্রুপে লিখেছেন, শুধু আমারই কি মনে হচ্ছে, নাকি গতকালের তুলনায় আজ বাজারের খরচ তিন গুণ হয়ে গেছে। এমনকি কলার দামও অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
কলার মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ জাহাজ চলাচল ঘুরপথে গেলে যাত্রা দীর্ঘ হয় এবং এতে এসব পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আকাশপথ খোলা হলে এসব পণ্য বিমানে আনা হতে পারে, তবে এতে খরচ আরও বাড়বে।
উপসাগরীয় অর্থনীতির বিশ্লেষক এবং গ্লোবালসোর্স পার্টনার্স–এর বিশ্লেষক জাস্টিন আলেকজান্ডার বলেন, খাদ্য যদি বিমানে বা স্থলপথে আনা হয়, তাহলে তা সমুদ্রপথের তুলনায় অবশ্যই বেশি ব্যয়বহুল হবে।
তিনি বলেন, সম্ভবত সরকারগুলো সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের কিছু অংশ ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করতে পারে। আগের সংকটগুলোতেও তারা এমনটি করেছে।
বিদেশে কৃষিখাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি গত দুই দশকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো আধুনিক শস্য গুদামও নির্মাণ করেছে। এসব গুদামে লাখ লাখ টন কৌশলগত খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।
এই গুদামগুলো গম, চাল ও ভোজ্য তেলের মতো দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা মজুত হিসেবে কাজ করে।
২০১৬ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারত মহাসাগর তীরবর্তী ফুজাইরাহ বন্দরে প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার শস্য সাইলো চালু করে। হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটাতেই এই স্থানে সাইলো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় আমিরাত। কারণ, সেই সময়ে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা কখনো চরম সংঘাতে রূপ নিলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
ইন্ডিয়া–মিডল ইস্ট এগ্রি অ্যালায়েন্স ইকোসিস্টেমের সভাপতি সুধাকর তোমার বলেন, ফুজাইরাহ'র গ্রেইন সাইলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নিরাপত্তা ভালভের মতো কাজ করে। উপসাগরের সমুদ্র বাণিজ্যের পরিবেশ যখন সংকুচিত হয়, তখন এটি বিকল্প রুট তৈরি করে। ঝুঁকি কমানোর সুযোগ দেয়।
মূল পরিকল্পনায় এই জরুরি খাদ্য মজুত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘ দূরত্ব এবং সীমিত সড়ক বা রেল সংযোগের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উদ্যোগটি মূলত আমিরাতের স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে।
পরবর্তীতে অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের খাদ্য মজুত অবকাঠামো গড়ে তোলে। এর মধ্যে রয়েছে কাতারের হামাদ বন্দরে নির্মিত খাদ্য নিরাপত্তা টার্মিনাল, যেখানে ৫১টি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত সাইলো রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যঘাটতি এড়াতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ছয় দেশ নিয়ে গঠিত এই জোট দীর্ঘদিন ধরেই সমন্বয় সংকটে ভুগছে।
কুইলিয়াম বলেন, জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া এই জটিল সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন হবে। ছয়টি দেশের সবার এবং ইরাকের খাদ্য চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করতে এই মুহূর্তে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সময়ের আলো/আআ