মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মোড় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বান সত্ত্বেও যুদ্ধ কখন থামবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে ইরান নিজেই, এমন দৃঢ় বার্তা এসেছে তেহরান থেকে। একই সময়ে চীন, রাশিয়াসহ একাধিক দেশ যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ালেও ইরানের নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই মুহূর্তে তারা যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত শুধু সামরিক ময়দানেই নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানই ঠিক করবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তার জবাবে এই ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েনি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। সাম্প্রতিক অপমানজনক পরাজয়ের পর তিনি ভুয়া সামরিক সাফল্যের গল্প তৈরি করার চেষ্টা করছেন।’
তিনি বলেন, এই যুদ্ধের সমাপ্তি আমরাই নির্ধারণ করবো।
নাইনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে আসছে এবং তারা যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। তিনি বলেন, ট্রাম্প মার্কিন জনগণের কাছে সত্য বলতে চান না।
তার অভিযোগ, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে এ তথ্য মার্কিন জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখা হচ্ছে। মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে ট্রাম্পের এমন দাবিও নাকচ করেছেন আইআরজিসি মুখপাত্র।
তিনি বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিনের তুলনায় এখন আরও বেশি সংখ্যায় এবং এক টনের বেশি ওজনের ওয়ারহেডসহ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
নাইনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আক্রমণকারী দেশগুলো এবং তাদের মিত্রদের কাছে অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও রফতানি করতে দেবে না ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
তার মতে, তেল ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রতিপক্ষের যে চেষ্টা চলছে তা ‘সাময়িক এবং ব্যর্থ’ হবে।
অপরদিকে চীন-রাশিয়াসহ অনেক দেশ যুদ্ধবিরতির জন্য ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছে বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এক সাক্ষাৎকারে এ দাবি জানিয়েছেন।
ইরানি বার্তা সংস্থা ইসনা নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে ঘারিবাদি বলেন, ‘চীন-রাশিয়াসহ অনেক দেশ ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমরা তাদের বলেছি যে আমরাও যুদ্ধবিরতি চাই। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম শর্ত হলো ‘আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা চালাবে না এই নিশ্চয়তা আমাদের দিতে হবে।’
ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ। তার পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরাইলও।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আমরা মনে করি আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ, আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং আবার যুদ্ধ এই চক্র চালু রাখতে চায়। আমরা এই চক্র ভেঙে দেব।
খাতাম আল-আনবিয়া সদর দফতরও এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ‘অনুতপ্ত’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
পিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফের কোনো আলোচনায় বসবে বলে তার মনে হচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা ইরানের জন্য খুবই তিক্ত।
এ সময় তিনি আরও বলেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দফায় আলোচনা হয়েছিল। তারপরই ইরানের ওপর এবারের এই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, আগে দুই দফা আলোচনার পরই ইরানের ওপর হামলা হয়েছে।