কক্সবাজারের মানব পাচার চক্রের বিষয়টি বহুল আলোচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কিছু পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হলেও এসব চক্রের বহু সদস্য থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কক্সবাজারে মানব পাচারে জড়িত দালালরা টার্গেট করেছে স্থানীয় যুবক, ছাত্র ও রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের। পাশাপাশি সাগরপথে মানব পাচারের পুরোনো ঘাটে দালালরা নানা কৌশলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ায় দালাল চক্রের শিকার শুধু পুরুষই নয়, রেহাই পাচ্ছেন না নারী-শিশুরাও। বিভিন্ন সময়ে অভিযানে চক্রের কিছু সদস্য আটক হলেও গডফাদাররা সবসময় আড়ালে থেকে যায়। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফ অপহরণ ও মানব পাচারের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর দুর্জয় বিশ্বাস বলেন, মানব পাচারের বিরুদ্ধে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত অভিযানে বাহারছড়া উপকূলীয় এলাকায় মানব পাচার কমে আসছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সরেজমিন কথা হয় বাহারছড়ার বাসিন্দা বৃদ্ধা সুরা খাতুনের (৮০) সঙ্গে। তিনি জানান, এখনও ছেলের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তিনি। তার ছেলে মোহাম্মদ আলী সাগরপথে মালয়েশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হয় আনুমানিক ১৪ বছর আগে। নিখোঁজ ছেলে ফিরে আসবেÑ সেই অপেক্ষায় দরজায় বসে থাকেন মা সুরা খাতুন। মোহাম্মদ আলী টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়ার ইউনিয়নের শামলাপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে। তিন ছেলে, স্ত্রী রেখে জীবিকার জন্য দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। অনেকে বলছে, সাগরেই তিনি মারা গেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন লোভনীয় চাকরির প্রলোভনে পাসপোর্ট ছাড়াই সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে শত শত বাংলাদেশি বেকার উঠতি বয়সি যুবককে অবৈধভাবে পাচার করছে মানব পাচারকারীরা। একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের আকিয়াব প্রদেশের অদূরে লাপ্পোড়া নামক উপকূলীয় এলাকায় দালালদের আস্তানা রয়েছে। অনেকেই মারা পড়ছে মিয়ানমারের গহীন জঙ্গলে স্থাপিত পাচারকারীদের টর্চার সেলে টাকা আদায়ের নিমিত্তে মারধর ও নির্যাতনের কারণে।
পাচারকারী কারা : টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের হাজমপাড়া, মারিশবনিয়া, কচ্ছপিয়া, নোয়াখালী পাড়া পাহাড়ে জমায়েত করে পরে সাগরপথে পাচার করা হয়। আব্দুল আলী, কেফায়েত উল্লাহ, ফেরদৌস, আব্দুল্লাহসহ অর্ধশত মানব পাচারকারী রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করলেও পরে জামিনে বের হয়ে পুনরায় মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ে এসব মানব পাচারকারীরা।
জীবিকার আশায় মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন রামুর খুনিয়াপালং এলাকার কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে পড়ে তারা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাদের। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশাহারা হয়ে পড়েন স্বজনরা।
কাজলের বড় ভাই বলেন, ও ফোনে কাঁদছিল। বলত, টাকা না দিলে মারতেছে। আমরা যা পারছি করছি। পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করি। সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। তিনি নিজেই আত্মসাৎ করেছেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। এক পর্যায়ে মারধরের কারণে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল। কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখন মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন। কথা হয় কাজলের মায়ের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, শুধু দালাল গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা নারীর চাহিদা : মালয়েশিয়ায় বসবাসরত পুরুষ রোহিঙ্গারা বিয়ে করতে পারছে না বলে জানিয়েছে উখিয়া ক্যাম্পের কয়েকজন রোহিঙ্গা মাঝি। তা ছাড়া সেখানকার স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করতেও পারছে না তারা। ফলে সেখানে রোহিঙ্গা নারীর সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দালাল চক্রের সদস্যরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে নারীদের প্রলোভন দেখাচ্ছে। আর এই প্রলোভনে পড়ে তারা ফাঁদে পা দিচ্ছে।
মানব পাচারের রুট : মানব পাচারকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার গড়ে উঠেছে কয়েকটি চক্র। এরা এলাকার নিরীহ লোকদের নিজেদের জিম্মায় নিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দালালদের হাতে তুলে দেয়। দালালরা পরে জিম্মিদের দিয়ে দেয় ট্রলার নিয়ন্ত্রণকারী দালালদের কাছে। এসব সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। মানব পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত উখিয়া-টেকনাফের উপকূলীয় এলাকাগুলো। উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের মনখালী, চোয়াংখালী, টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া, মারিশবনিয়া, নোয়াখালী ঘাটসংলগ্ন এলাকাগুলো মানব পাচারকারীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। প্রথমে এখানে যাত্রীদের জড়ো করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে ছোট ডিঙি নৌকা দিয়ে গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারে মাথাপিছু টাকা আদায় করে তুলে দেওয়া হয়।
পাচারের নানা কৌশল : স্থানীয় বাংলাদেশি যুবক এবং রোহিঙ্গা নারীদের টার্গেট করে দালালরা। দালাল চক্রের সদস্যদের মূল টার্গেট থাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ স্থানীয় গ্রামগুলো। পাচারকারী চক্রের সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা নারীদের বেশি টার্গেট করছে। বিশেষ করে এসব নারীদের বিয়ের কথা বলে মালয়েশিয়ায় পাঠানোই মূল টার্গেট তাদের। মূলত রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে মাস তিনেক বোঝানো হয়। তাদের পরিবারে মাসে দুই-তিনবার যাতায়াত করা হয়। দেখানো হয় নানা প্রলোভন।
রাজি হলে দিনক্ষণ ঠিক করে, ছোট ছোট দলে ভাগ করে আলাদাভাবে এনে এক জায়গায় জড়ো করা হয়। এরপর ছোট ছোট নৌকায় করে গভীর সাগরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে নিয়ে তুলে দেওয়া হয় বড় ট্রলারে।
সময়ের আলো/আআ