বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম আজ শুরু হচ্ছে। এবারের সংসদে নতুনত্ব বেশি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ২৯৬ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২২৭ জন প্রথমবারের মতো দায়িত্ব নিচ্ছেন।
কিছু আসনের নির্বাচন স্থগিত বা আইনি জটিলতায় আটকে আছে, আর নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের অনেক প্রধানও প্রথমবার সংসদে যাচ্ছেন। তাই নতুন সংসদ সদস্যরা সংসদের কার্যপ্রণালী, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও কমিটির কাজ সম্পর্কে অনেকটাই অভিজ্ঞ নন। সাধারণ মানুষও সংসদের কাজ ও পদবিন্যাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ রাখে।
এই বাস্তবতায় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও পরিভাষা জানা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন আইন প্রণয়ন, বিতর্ক পরিচালনা বা কোরাম সংকটের প্রক্রিয়া।
১. কোরাম
সংসদের কোনো বৈঠক বৈধভাবে পরিচালনার জন্য ন্যূনতম সংখ্যক সদস্য উপস্থিত থাকা জরুরি। এটিকেই কোরাম বলা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কোরাম পূর্ণ হওয়ার জন্য ৬০ জন সদস্য উপস্থিত থাকতে হয়।
যদি এই সংখ্যক সদস্য উপস্থিত না থাকেন, সভা স্থগিত করা হয়। কোরাম সংকট বা “কোরাম ক্রাইসিস” তখন ঘটে, যখন সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে সংসদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম পাঁচ অধিবেশনে কোরাম সংকটে মোট ১৯ ঘণ্টা ২৬ মিনিট সময় নষ্ট হয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা হিসেবে হিসাব করা হয়েছিল।
২. ওয়াক আউট
সংসদে কোনো বিষয় বা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সদস্যরা সভা কক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে তাকে ওয়াক আউট বলা হয়। এটি সাধারণত বিরোধী দল ব্যবহার করে।
ওয়াক আউটের মাধ্যমে তারা সরকারের কোনো নীতি বা সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেমন দেখা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ বিল বা বাজেট আলোচনায় ওয়াক আউট করেছে।
৩. এক্সপাঞ্জ
সংসদে যত আলোচনার রেকর্ড থাকে, সেখানে যদি কেউ অশালীন, আপত্তিকর, অসাংবিধানিক বা অসংসদীয় মন্তব্য করেন, তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়াকে এক্সপাঞ্জ বলা হয়।
স্পিকার যদি মনে করেন মন্তব্য সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে, তবে কার্যবিবরণী থেকে তা বাদ দিতে নির্দেশ দেন। এক্সপাঞ্জ হওয়া বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডভুক্ত হয় না, তাই গণমাধ্যমে সরাসরি উদ্ধৃত করা যায় না।
৪. বিল
সংসদে নতুন আইন প্রণয়নের বা পুরনো আইন সংশোধনের প্রস্তাবকে বিল বলা হয়। বিল দুই প্রকার হয়ে থাকে, সরকারি বিল মন্ত্রীরা উত্থাপন করেন এবং বেসরকারি বিল অন্যান্য সংসদ সদস্যরা উত্থাপন করেন।
বেসরকারি বিল সাধারণত সপ্তাহে একদিন আলোচনা হয় এবং বাংলাদেশের সংসদে এটি খুব সীমিত ক্ষেত্রে পাস হয়। এর প্রক্রিয়া হলো প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিল খসড়া প্রস্তুত করে, এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন হয় এবং সংসদে উত্থাপন ও পরে আলোচনা করা হয়।
ভোটের মাধ্যমে পাস হলে বিল আইন হিসেবে কার্যকর হয়।
৫. পয়েন্ট অব অর্ডার
সংসদে কোনো কার্যপ্রণালী লঙ্ঘিত হলে সদস্য “পয়েন্ট অব অর্ডার” উত্থাপন করতে পারেন। এটি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্পিকার বিষয়টি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেন। বিতর্ক প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ফ্লোর এবং ফ্লোর ক্রসিং
ফ্লোর হলো সংসদের মূল বিতর্কের স্থান। সদস্যরা এখানে বক্তৃতা দেন বা মতামত প্রকাশ করেন। একইভাবে কোনো সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দিলে সেতি ফ্লোর ক্রসিং।
বাংলাদেশে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দিতে পারেন না। এর ফলে ফ্লোর ক্রসিং করলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে।
৭. ট্রেজারি বেঞ্চ
সরকার দলের সদস্যদের বসার আসন। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা এখানে বসেন। স্পিকার আসনের ডানদিকে সামনের সারির আসনগুলো ট্রেজারি বেঞ্চ।
সংসদে কার্যক্রম বোঝার জন্য এই শব্দগুলো জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত নতুন সংসদ সদস্য ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য, যাতে তারা বুঝতে পারেন কোনো বিল কিভাবে আইন হয়, বিতর্ক কীভাবে হয় এবং অধিবেশন চলাকালীন বিভিন্ন প্রক্রিয়া কিভাবে পরিচালিত হয়।
/ইউএমএইচ