দুপুরবেলায় ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে পরিবারটিতে। মুহূর্তে নিভে গেছে হাসি-আনন্দ। সেখানে এখন কেবল শোকের ছায়া। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত-নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীদের বাড়ি ফেরার আনন্দ পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। হাতে রাঙা মেহেদী আর বিয়ের শাড়িতে শেষ বিদায় হলো নববধূর। খুলনা-কয়রা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজের কাছে নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে বাগেরহাটের মোংলার এক পরিবারের সুখের স্বপ্ন ভেসে গেছে প্রিয়জনদের রক্তে। বর, কনে এবং পরিবারের অন্য সাতজন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের প্রাণহানি ভেঙে দিয়েছে স্বজন-সহজনদের হৃদয়। তাদের চারপাশে এখন কেবল আহাজারি।
দুপুরে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। খুলনার কয়রা থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে বাড়ির কাছের উপজেলা রামপালে এসে পৌঁছান তারা। এরপরই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার মোংলার এই বর-কনে ও তাদের স্বজনরা।
বাগেরহাটের রামপালে নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে নববধূ ও বরকে বহনকারী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ যায় ১৪ জনের; যাদের মধ্যে বর-কনেসহ একই পরিবারেরই সাতজন।
মাইক্রোবাসে নববধূকে নিয়ে বরের পরিবারের লোকজন বাড়ি ফিরছিলেন বলে জানান মোংলার এক বিএনপি নেতা। এ দুর্ঘটনায় মোংলার আরেক বিএনপি নেতা ও তার ছেলের মৃত্যু হয়। নিহত ওই ছেলের বিয়ে করাতে তারা খুলনার কয়রা গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে আছেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ও তার ছেলে বর মো. সাব্বির, সাব্বিরের নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু। অন্যরা বিএনপি নেতার মেয়ে, নাতি, নাতনিসহ সাতজন। নিহত বাকিরা তার আত্মীয়স্বজন। তারা পশ্চিম শেলা বনিয়ার বাসিন্দা।
মোংলা পৌর বিএনপির সদস্য খোরশেদ আলম রাতে সময়ের আলোকে বলেন, আব্দুর রাজ্জাক তার ছেলে সাব্বিরকে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকায় বিয়ে দেন।
এদিন সকালে পরিবারের সাতজনসহ কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে যান। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিকালে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় মাইক্রোবাসটি।
এতে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের সাত সদস্যসহ ১২ জন মারা যান বলে জানান খোরশেদ আলম।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কথা হয় কনে মার্জিয়া আক্তার মিতুর মামা আবু তাহেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুপুরে তার ভাগনি মিতুর বিয়ে হয়।
‘বিকালে মিতুকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা হয় বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি। রামপালের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মিতু, তার বোন লামিয়া ও নানি মারা গেছেন। আর বরসহ মারা গেছেন আটজন।’
মোংলা পৌর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম জানান, মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হয়েছিল। তিনি ছেলে-পুত্রবধূ নিয়ে মোংলায় বাড়িতে আসছিলেন। পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
এতে আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে-পুত্রবধূ, মেয়েসহ আটজন, মাইক্রোবাসের চালক ও কনে পক্ষের লোকসহ মোট ১৪ জন মারা গেছেন।
বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে পুলিশের ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, নৌবাহিনীর বাসটি মোংলা থেকে ছেড়ে এসেছিল। আর মাইক্রোবাসটি খুলনা থেকে মোংলায় যাচ্ছিল। বেলাই ব্রিজের কাছে দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
‘তাতে তিন নারীসহ মাইক্রোবাসের চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। স্থানীয় লোকজন এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।’
রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সুকান্ত পাল জানান, তার হাসপাতালে মোট ছয়জনকে নেওয়া হয়েছিল।
‘তাদের মধ্যে চারজন আগেই মারা গেছেন। দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক মেহনাজ মোশাররফ বলেন, রামপালের দুর্ঘটনায় হতাহত ১১ জনকে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে আটজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিসাধীন বাকি তিনজনের মধ্যে আরও দুজন পরে মারা যান বলে এই চিকিৎসক জানান।
এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের সাত সদস্যের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সময়ের আলো/এনএ