যেসব কারণে ইরান যুদ্ধে এখনো জয় পাননি ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এখন নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারছেন না, উল্টো তার

2026-03-13T20:51:02+00:00
2026-03-13T20:51:02+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যেসব কারণে ইরান যুদ্ধে এখনো জয় পাননি ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫১ পিএম 
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সিএনএন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এখন নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারছেন না, উল্টো তার হাত থেকে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ফসকে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এই যুদ্ধ থেকে পিছু হটার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণাম হবে যুদ্ধে টিকে থাকার চেয়েও ভয়াবহ।

যদিও ট্রাম্প এখনো লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো চরম বিপর্যয়ে পড়েননি, যারা পরাজিত হতে যাওয়া যুদ্ধকেও দীর্ঘায়িত করেছিলেন। তবে বিপদের সংকেত এখন চারদিকে স্পষ্ট।

দুই সপ্তাহের যুদ্ধে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারানোর উদাহরণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে যেটি নিয়ে, তা হলো ইরানের 'হরমুজ প্রণালি' বন্ধ করে দেওয়া। তেলের বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বন্ধ করে দিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও সবকিছু কেবল শক্তি প্রয়োগ বা প্রশাসনের কঠোর ভাষা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।

ইরানের সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় নগণ্য হলেও, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সামরিক ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। এটি মূলত ট্রাম্পের এমন একটি যুদ্ধের ফল, যা তিনি কোনো সুদূরপ্রসারী চিন্তা ছাড়াই কেবল 'অনুভূতির' ওপর ভিত্তি করে শুরু করেছিলেন। অথচ মার্কিন কর্মকর্তারা কয়েক দশক ধরেই জানতেন যে, আক্রান্ত হলে ইরান এভাবেই পাল্টা জবাব দেবে।

বুধবার (১১ মার্চ) এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান বলেন, আপনি যদি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারেন, তবে বিজয় লাভ করা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতেই হবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হতে পারে।

হোয়াইট হাউজ বারবার আশ্বস্ত করছে যে, ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাবনা দূর করে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করে এই যুদ্ধ আমেরিকানদের আরও নিরাপদ করেছে। তবে চারদিকের এই থমথমে পরিস্থিতি সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, ইরান পরিস্থিতি খুব দ্রুত এগোচ্ছে এবং এটি বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আমাদের সামরিক বাহিনী অতুলনীয়। এর আগে কখনোই এমন কিছু দেখা যায়নি।

অবশ্য এখনই 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-কে ব্যর্থ বলাটা হবে সময়ের আগে মন্তব্য করা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলাগুলো কার্যকারিতার দিক থেকে সফল। এটি সম্ভবত ইরানের দেশের বাইরে হুমকি সৃষ্টির ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। তাদের ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পুনরায় তৈরির সক্ষমতাকে পিছিয়ে দিয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গতিও কমে এসেছে।

ট্রাম্পের সামনে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জসমূহ

ট্রাম্প সবসময় বাড়াবাড়ি কথা বলতে পছন্দ করেন এবং সংযম তার স্বভাবে নেই। বুধবার তিনি বলেছেন, আমাকে বলতে দিন, আমরা জিতেছি। যদিও খুব দ্রুতই আমরা জিতেছি বলাটা পছন্দ করি না, তবে আমরা জিতেছি। প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আমরাই জয়ী হয়েছি।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনো জয়ী হতে পারেনি। নিচের সাতটি কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে

১. হরমুজ প্রণালি সংকট : বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলের সরবরাহকারী এই নৌপথ ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং গ্যাসোলিনের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ভয়ে মার্কিন নৌবাহিনী এই পথে ঢুকতে দ্বিধা বোধ করছে। এটি খোলার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। রাজনৈতিক সমাধানই এখানে শ্রেয়, কিন্তু ট্রাম্পের 'বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ' করার দাবিতে ইরান রাজি হচ্ছে না।

২. সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকার সমস্যা : যুদ্ধের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর মনে করা হয়েছিল যে শাসনের পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তার ছেলে মোজতাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে ক্ষমতায় বসা ট্রাম্পের সফলতার দাবিকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা একে 'সামরিক সাফল্য কিন্তু কৌশলগত ব্যর্থতা' হিসেবে বর্ণনা করছেন।

৩. ইসরায়েলের যুদ্ধ থামানোর অনীহা : ট্রাম্প রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েল হয়ত 'চিরস্থায়ী যুদ্ধ' চালিয়ে যেতে চাইবে। ইরানের তেল স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যের ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

৪. যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা : প্রশাসনের অভ্যন্তরে যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, যা যুদ্ধের বিজয় প্রচারের পথে বড় বাধা।

৫. পারমাণবিক প্রশ্ন : ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের দাবি করলেও, ইরানের কাছে এখনো উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মতে, ইসফাহান কেন্দ্রে এখনো প্রায় ২০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে। এই মজুত পুরোপুরি ধ্বংস না করা পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ওয়াশিংটন নিশ্চিত হতে পারছে না।

৬. ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থবিরতা : ট্রাম্প ইরানিদের 'মুক্তির' স্বপ্ন দেখিয়ে বিদ্রোহের ডাক দিলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো গণ-অভ্যুত্থান দেখা যায়নি। বরং বিশ্লেষকদের মতে, বোমাবর্ষণ থামলে সরকার আরও কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করতে পারে।

৭. আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি : তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের ব্যয় আমেরিকানদের পকেটে টান দিচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে ইরানের পারমাণবিক বোমার আশঙ্কার চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও তেলের দাম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে কোনো যুদ্ধের সমাপ্তি ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানি বা জাপানের বিরুদ্ধে বিজয়ের মতো পরিষ্কার হয় না। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকা জেতার চেয়ে যুদ্ধ হেরেছেই বেশি। ট্রাম্প এখন তার নিজের পছন্দে শুরু করা একটি যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি।

সূত্র : সিএনএন 

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ইরান  যুদ্ধ  এখনো  জয়  ট্রাম্প  ইসরায়েল 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: