ইটের দেওয়ালে রক্তের লাল দাগ, উল্টে পড়ে থাকা পুলিশি ব্যারিকেড, ভাঙা কাঁচ আর রাজপথ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চশমা, ছেঁড়া জামা এবং জুতো। গত সোমবারের লঙ্কাকাণ্ডের পর দিল্লির সংসদ মার্গ এবং কনট প্লেস চত্বর জুড়ে কেবলই রণক্ষেত্রের অবশিষ্টাংশ। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ‘সংসদ চলো’ মিছিল ঘিরে দিল্লি পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের পর তৈরি হওয়া এই ধ্বংসস্তূপই এখন দেশের রাজধানী শহরের প্রধান দৃশ্যপট।
বিতর্কিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তরপত্র জালিয়াতির প্রতিবাদে গত দুই মাস ধরেই উত্তপ্ত ভারতের ছাত্র সমাজ। এর জের ধরে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা পুরো আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। দেশটির প্রধান বিচারপতি একবার সমালোচক ও বেকার তরুণদের ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা বলে কটাক্ষ করেছিলেন। সেই মন্তব্যকে হাতিয়ার করেই গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সোমবার এই প্ল্যাটফর্মেরই ডাকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পার্লামেন্টের দরজায় পৌঁছে যায়।
বিক্ষোভকারীদের হটাতে পুলিশ ব্যাপক টিয়ারগ্যাস প্রয়োগ করে, যাতে আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থী। দিল্লির রাজপথে দাঁড়িয়ে চোখে জ্বলন্ত যন্ত্রণা আর পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে ১৮ বছর বয়সী তরুণ অংশুল দেব ক্ষোভের সঙ্গে জানান, আমাদের অভিভাবকেরা সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তারাই আজ আমাদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো আচরণ করছে। এটি আমাদের দেশ, এবং আমরা এই ঘৃণার রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করব।
আন্দোলন এতদূর গড়ালেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো পর্যন্ত নীরব। সোমবার পার্লামেন্টে তাঁর হাসিমুখ দেখা গেলেও প্রতিবাদীদের কোনো বার্তা তিনি দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, মোদি আন্দোলনকারীদের কাছে মাথা নত না করার কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে চাইছেন।
বিক্ষোভের চরম পর্যায়ে সিজেপির প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকে বসে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল তিনটি— ১. শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ; ২. অনশনরত পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি প্রদান; ৩. প্রশ্ন ফাঁসের জেরে আত্মহত্যাকারী পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তবে বৈঠকের পর সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এই আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে অভিহিত করেন। তার অভিযোগ, আমাদের চার ঘণ্টা বসিয়ে রেখে মন্ত্রী মাত্র ১০ মিনিট কথা বলেছেন। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে এবং তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সোমবার রাতের আঁধারে যন্তর মন্তরের ভেঙে পড়া মঞ্চে দাঁড়িয়ে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর উদ্দেশে বলেন, দিল্লি পুলিশ চরম বর্বরতার সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের লড়াই থামবে না। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমরা একচুলও পিছিয়ে আসব না। এটি আমাদের প্রথম ডাক ছিল, এমন আরও মিছিল আসবে।
সূত্র: আলজাজিরা
সময়ের আলো/কহু