ভারতের মহারাষ্ট্রের জলগাঁও জেলায় বিয়ে না হওয়ার হতাশা কতটা গভীর সংকট তৈরি করছে সেটা উঠে এসেছে পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলাটিতে ৩৮৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ২৯টি ঘটনায় বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
তবে এসব আত্মহত্যার সবগুলোর পেছনে শুধু বিয়ে না হওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে না। মহারাষ্ট্র পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার অন্য ঘটনাগুলোর পেছনে মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক বিরোধ ও ঋণের মতো নানা কারণ ছিল।
তবু ২৯টি আত্মহত্যায় বিয়ে না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় জলগাঁওয়ে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে স্থানীয় তরুণ, পরিবার, বাসিন্দা ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এর পেছনের আরও বিস্তৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মহারাষ্ট্রের অনেক এলাকায় এখন বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু পাত্রের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নয়, তার স্থায়ী চাকরি, নিয়মিত আয়, নিজস্ব বাড়ি, জমি এবং আর্থিক নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব যোগ্যতার ঘাটতি থাকলে অনেক পুরুষের বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যাচ্ছে।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে কৌস্তুভ পোটদারের কথা তুলে ধরেছে বিবিসি। বি ফার্ম ডিগ্রিধারী কৌস্তুভ নাসিকের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর পরিবার তার জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু করে। কিন্তু নিজস্ব বাড়ি ও সরকারি চাকরি না থাকায় একাধিক সম্বন্ধে তাকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আত্মহত্যা করেন। যদিও তার মৃত্যুর পেছনে বিয়ে না হওয়াই একমাত্র কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
পরিসংখ্যানেও পুরুষ ও নারীর বৈবাহিক অবস্থানে বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০১৯-২১ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারীদের প্রায় ১১ শতাংশ অবিবাহিত। একই বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
গ্রামীণ মহারাষ্ট্রে বিয়ের পরিবর্তিত মানদণ্ড নিয়েও গবেষণা করেছেন ময়ূর কুডুপলে ও জোয়েল কাবালিয়ান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে জমি, শিক্ষা, জাতপাত ও বয়স গুরুত্বপূর্ণ হলেও সময়ের সঙ্গে অগ্রাধিকার বদলেছে। একসময় গ্রামে জমির মালিকানাকে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা হলেও এখন স্থায়ী চাকরি, ভালো আয় এবং শহরে বসবাসের সুযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এর সঙ্গে জাতপাতের বিষয়টিও বড় বাধা হয়ে রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষক দর্শনা পাওয়ারের মতে, কয়েক দশক ধরে কন্যাভ্রূণ হত্যার মতো ঘটনার প্রভাবেও বিবাহযোগ্য বয়সি নারী-পুরুষের সংখ্যায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং নারী-পুরুষের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি।
সব মিলিয়ে জলগাঁওয়ের ২৯টি আত্মহত্যার ঘটনা শুধু পাত্রী না পাওয়ার সংকটকে নির্দেশ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রত্যাশা, জনমিতিক পরিবর্তন এবং বিয়েকে ঘিরে বদলে যাওয়া মানদণ্ড।
সময়ের আলো/জেডি