আলি লারিজানির মৃত্যু শুধু আরেকজন শীর্ষ নেতার পতন নয়- এটি ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে এক গভীর ফাটলের ইঙ্গিত। দার্শনিক মনন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা কৌশলের এক বিরল সংমিশ্রণ ছিলেন তিনি। খামেনির মৃত্যুর পর কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা নেওয়া এই ব্যক্তির হঠাৎ অনুপস্থিতি এখন প্রশ্ন তুলছে- ইরান কোন পথে যাবে?
কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ নাকি কূটনৈতিক ভারসাম্য? এই প্রেক্ষাপটে লারিজানির মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয় বরং একটি ‘সিস্টেম লস’- যেখানে একসঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক এবং কৌশলগত তিনটি স্তম্ভই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দার্শনিক থেকে নিরাপত্তাপ্রধান : আলি লারিজানি ছিলেন ইরানের রাজনীতিতে এক বিরল চরিত্র, যাকে এককভাবে কোনো ঘরানায় ফেলা কঠিন। তিনি যেমন ইসলামি বিপ্লবী কাঠামোর একজন বিশ্বস্ত অংশ ছিলেন, তেমনি পাশ্চাত্য দর্শনে উচ্চশিক্ষিত একজন চিন্তাবিদও ছিলেন।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পশ্চিমা দর্শন, বিশেষ করে ইমানুয়েল কান্ট নিয়ে গবেষণা করেছিলেন; যা তাকে ইরানের অনেক প্রচলিত নেতার থেকে আলাদা করে তোলে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদের স্পিকার, সংস্কৃতিমন্ত্রী। এমনকি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে, যেখানে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করতেন।
খামেনির মৃত্যুর পর, যখন ইরানে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়, তখন লারিজানিকে অনেকেই কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার মুখ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখছিলেন। তার এই বহুমাত্রিক পরিচয়ই তাকে একদিকে কঠোরপন্থিদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল, অন্যদিকে কূটনৈতিক মহলেও একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য মুখ’ বানিয়েছিল। ফলে তার মৃত্যু ইরানের ভেতরে একটি ভারসাম্য হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে যাচ্ছে : লারিজানির মৃত্যু নিয়ে বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- এখন ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় যাবে। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তার মৃত্যুর ফলে ইরানের দুই প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র- আইআরজিসি (ইসলামি বিপ্লবী গার্ড) এবং বায়ত-এ-রাহবারির (সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়) গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। লারিজানি এই দুই শক্তির মধ্যে এক ধরনের ‘সেতুবন্ধ’ হিসেবে কাজ করতেন।
তিনি সামরিক কাঠামোর সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমন্বয় করতেন এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোও খোলা রাখতেন। তার অনুপস্থিতিতে এখন আইআরজিসি সরাসরি প্রভাব বাড়াতে পারে, যা ইরানের নীতিকে আরও সামরিকমুখী করে তুলতে পারে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে চাইবে। এই দ্বৈত শক্তির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোরতা বাড়বে এবং ভিন্নমত বা কূটনৈতিক বিকল্পগুলো আরও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
কূটনৈতিক সম্ভাবনার দরজা কি বন্ধ হলো : লারিজানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, তিনি একসঙ্গে কঠোরপন্থি এবং বাস্তববাদী ছিলেন। অতীতে তিনি পারমাণবিক আলোচনা এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার এই দ্বৈত চরিত্র ইরানকে এমন এক অবস্থানে রাখত, যেখানে প্রয়োজন হলে কূটনীতি এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধ- দুটোই সম্ভব ছিল। কিন্তু তার মৃত্যু সেই ‘মধ্যবর্তী জায়গা’ সংকুচিত করে ফেলেছে।
এখন ইরানের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা হয়তো আরও একমুখী- বিশেষ করে সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাব্য আলোচনার পথ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে কোনো সমঝোতা তৈরির সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
নেতৃত্ব সংকট ও উত্তরাধিকার প্রশ্ন : খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই ইরানে নেতৃত্বের প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। সেই শূন্যতা আংশিকভাবে পূরণ করেছিলেন লারিজানি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর এখন সেই প্রশ্ন আবার নতুন করে সামনে এসেছে- কে নেতৃত্ব দেবে? ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি একাধিক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন আইআরজিসি, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ। লারিজানি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করতেন। তার অনুপস্থিতিতে এই সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে।
ইসরাইলের নেতৃত্ব ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশল : লারিজানির হত্যাকাণ্ডকে অনেক বিশ্লেষক ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্র্যাটেজি’ বা নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত করার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। ইসরাইল ইতিমধ্যে ইরানের একাধিক শীর্ষ নেতাকে টার্গেট করেছে, যার মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দাপ্রধানরাও রয়েছেন। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো- রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রকে দুর্বল করা, যাতে প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া সমন্বিত না থাকে। লারিজানির মতো একজন ‘কো-অর্ডিনেটর’ বা সমন্বয়কারীকে হারানো এই কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব : লারিজানি শুধু নিরাপত্তাপ্রধানই ছিলেন না, তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তিনি কখনো পুরোপুরি সংস্কারপন্থি ছিলেন না, আবার সম্পূর্ণ কট্টরপন্থিও ছিলেন না। এই অবস্থান তাকে রাজনৈতিকভাবে নমনীয় করে তুলেছিল। তার মৃত্যুতে এখন এই ‘মধ্যমপন্থি কঠোরতা’ হারিয়ে যেতে পারে। ফলে রাজনীতিতে চরমপন্থা বাড়তে পারে এবং ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
সামরিক নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা : লারিজানির অনুপস্থিতিতে ইরানের সামরিক নীতি আরও আক্রমণাত্মক হতে পারে। কারণ তিনি যেখানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক বিকল্পও বিবেচনায় রাখতেন, সেখানে এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সরাসরি ও কঠোর হতে পারে। বিশেষ করে আইআরজিসির প্রভাব বাড়লে, আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব : লারিজানির মৃত্যু শুধু ইরানের ভেতরের বিষয় নয়- এটি পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। হুরমুজ প্রণালি, তেলবাজার, উপসাগরীয় নিরাপত্তা- সবকিছুই এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি ইরান আরও কঠোর অবস্থানে যায়, তা হলে এই সংঘাত দ্রুতই বিস্তৃত হতে পারে।
এক ব্যক্তির মৃত্যু, এক ব্যবস্থার পরিবর্তন : আলি লারিজানির মৃত্যু একটি প্রতীকী মুহূর্ত- যেখানে একজন ব্যক্তির পতনের সঙ্গে সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোও ভেঙে পড়ছে। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি যুদ্ধ এবং কূটনীতির মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।
তার অনুপস্থিতিতে এখন ইরান কোন পথে যাবে- তা নির্ভর করবে কে এই শূন্যতা পূরণ করে এবং কী ধরনের নীতি সামনে আনে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট- এই মৃত্যু শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয় বরং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণকারী একটি মোড়।
সময়ের আলো/আআ